এ সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে হিটলার-বৈরী মসিয়ো কার্তিয়ে বারবার বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এবং হিটলারের সামনে মাথা নিচু করেছেন। যুদ্ধ চালনায় অনভিজ্ঞ, মিলিটারি একাডেমির সঙ্গে সম্পর্কহীন এই অর্বাচীন কী অলৌকিক ক্ষমতাবলে এইসব বিরাট অভিযানের পরিকল্পনা সর্বাঙ্গসুন্দর করে গড়ে তুলতে সক্ষম হল? কী করে বুঝতে পারল যে, ট্যাঙ্ক এবং এরোপ্লেন দিয়ে এমন এক অভূতপূর্ব গতিবেগ প্রবর্তন করা যায়, যার সামনে ফ্রান্স-ইংলন্ডের পূর্বাৰ্জিত সর্ব অভিজ্ঞতা নিষ্ফল, সর্ব কলাকৌশল বিতংসে কেবা বাঁধে কেশরীরে?
শেষ পর্যন্ত হিটলার পরাজিত হলেন। কেন পরাজিত হলেন তার অনুসন্ধান মসিয়ো কার্তিয়ে করেছেন। তাতে আর কিছু প্রমাণ হোক আর না হোক, অন্তত এ তত্ত্বটি সপ্রমাণ হয়নি যে স্তালিন অথবা আইজেনহাওয়ার হিটলারের চেয়ে বেশি সমরবিদ্যা জানতেন।
তাই মসিয়ো কার্তিয়ে সসম্ভমে বলেন, এই ভয়ঙ্কর লোকটির সবকিছু হয়তো ইতিহাসের স্মৃতিপট থেকে মুছে যাবে; কিন্তু তিনি যেসব যুদ্ধাভিযানের পরিকল্পনা রেখে গেলেন সেগুলো যুদ্ধ-বিদ্যালয়ের ছাত্রেরা সেইরকম মনোযোগই দিয়ে পড়বে যে মনোযোগ দিয়ে ছাত্রেরা ফ্রেডেরিক দি গ্রেটের অভিযান অধ্যয়ন করে। এ বিষয়ে কারও মনে কোনও দ্বিধা নেই।
[দৈনিক বসুমতী]
.
ফ্রাঙ্কেনস্টাইন
যে ভূতকে মারার জন্য তামাম দুনিয়ার তাবৎ শর্ষে জড়ো করে পিষে ছাতু করে ফেলতে হল, সেই ভূতকে জ্যান্ত করবার জন্য নাকি নবীন ভগীরথ নতুন তপস্যায় মগ্ন হয়েছেন।
হিটলার দানব মারা গিয়েছে চার বৎসরও হয়নি– পরশুদিন এক জর্মন কাগজে পড়লুম, জেনারেল হাল্ডারকে বড়কর্তা বানিয়ে নতুন জার্মান চমু গড়ে তোলবার জন্য মার্কিন এবং জর্মন উজির-নাজিরের দল উঠেপড়ে লেগে গিয়েছেন। সংবাদটা চট করে কেউ বিশ্বাস করবেন না বলে খবরের কাগজখানা সযত্নে তুলে রেখেছি। কাগজখানা অন্য আরেকটি কাজে লাগবে। যাঁরা দিশি প্রবাদ-বাক্যের ওপর নির্ভর করে এ দুনিয়ায় চলাফেরা করেন, তাঁদের সামনে সপ্রমাণ করে দেব, মাথা না থাকলেও মাথা-ধরা হতে পারে– জর্মন রাষ্ট্র নামে আজ কোনও পৃথক সত্তা নেই বটে, কিন্তু জার্মান বাহিনী তৎসত্ত্বেও গড়ে উঠতে পারে।
এই খবরের কাগজখানার রসবোধও আছে। সম্পাদক লিখেছেন, গ্যোবেলস্ সায়েব মরার পূর্বে দু খানা বোম্বাই-সাইজ টাইম বম্ রেখে গিয়েছিলেন; তার পয়লাখানার ভিতরে ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, হে জর্মনগণ, মার্কিন-ইংরেজ যে বলছে স্বাধীনতা আর সাম্য মৈত্রীর জন্য তারা লড়ছে, সেকথা আরব্যোপন্যাসের মতো অবিশ্বাস্য– তারা লড়াই জিতলে তোমরা যে স্বাধীনতা পাবে সে দুরাশা কোরো না।
এ বমটা ফাটল মার্কিন-ইংরেজ জর্মনি দখল করার সঙ্গে সঙ্গে। স্বাধীনতা মাথায় থাকুন– অনাহারে রোগে-শোকে কত জার্মান যে এ যাবৎ মহাপ্রভুদের সুশাসনে মারা গিয়েছে, তার আদম-সুমারি এখনও আরম্ভ হয়নি। গ্যোবেলস্ সায়েবের দুই নম্বরের বোমাতে ভবিষ্যদ্বাণী ছিল কিন্তু জৰ্মনিকে বাদ দিয়ে মার্কিন-ইংরেজের চলবে না, সেকথাও বলে দিচ্ছি। রুশকে ঠেকাতে পারে ইহজগতে একমাত্র জর্মন জাতই।
জর্মন সম্পাদক বলেছেন, এইবারে দুই নম্বরের বোমাখানা ফেটেছে। যে জর্মনবাহিনীর ঠেলায় মার্কিন-ইংরেজ-রুশ মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছে, সেই জর্মনবাহিনীকে ফের জ্যান্ত করবার জন্য গণ্ডায় গণ্ডায় ভাগীরথী পশ্চিম জর্মনিতে নাবানো হচ্ছে অর্থাৎ আমেরিকা থেকে বিস্তর খানাদানা আসছে, কলকব্জা বানাবার জন্য টাকা-পয়সা আসছে, রূঢ় কয়লার খনির আগুন যজ্ঞিবাড়ির মতো ফের অষ্টপ্রহর জ্বলতে আরম্ভ করেছে, বন্দুক-কামান বানাবার কারখানাগুলো ধ্বংস করা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এক কথায় বলতে গেলে মার্শাল নামক যে গৌরীসেন দুনিয়ার আর সর্বত্র কাঁচা টাকা ঢালছেন, তিনি সব বিখ্যাত মার্শাল প্ল্যান জার্মানিতেও চালাতে নারাজ নন, সেকথাও বলে দিয়ে গিয়েছেন।
অর্থাৎ ভূতটা যাতে রাতারাতি দাবড়াতে আরম্ভ করতে পারে, তার জন্য রক্ত সংক্রমণেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। মার্কিন নাগরিকের বড় দুঃখে জমানো টাকা– সবাই জানেন, মার্কিন টাকাকে রক্তের চেয়েও মূল্যবান মনে করে ভাগীরথী বেয়ে পশ্চিম জর্মনিতে পৌঁছচ্ছে, পুষ্পকরথ চড়ে বার্লিনে ঝরে পড়ে সেখানকার মার্কিনদোস্ত জার্মানদের কানে বেটোফেনের সঙ্গীতের চেয়েও মিষ্টি ঠুংঠাং করে বাজছে।
অবিশ্বাস্য, সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়। কিন্তু পৃথিবীর তাবৎ জিনিসই যখন তুলনামূলক (একথাটাও রিলেটিভিটি নাম দিয়ে এক জার্মানই প্রচার করে গিয়েছেন তখন এর চেয়েও অবিশ্বাস্য আরেকখানা খবর যদি পরিবেশন করি, তবে হয়তো পাঠক উপরের খবরখানা বিশ্বাস করে ফেলবেন।
শাখটের নাম অনেকেই শুনেছেন। ইংরেজই তার হুনর-ভানুমতী দেখে তাকে wizard নাম দিয়েছে। টাকাকড়ি, ব্যাঙ্কিং বাবদে হেন ফন্দিফিকির নাকি নেই, যা তার কাছে অজানা শুধু তাই নয়, এই স্বল্পপরিসর জীবনেই নাকি তিনি জার্মানের ধন-দৌলৎ দুবার বাঁচিয়ে দিয়েছেন। একবার ১৯২১-এ ইনফ্লেশন নামক নতুন জিনিস আবিষ্কার করে, এবং দ্বিতীয়বার দেউলে জার্মানিকে হিটলারের আমলে তালেবর করে দিয়ে।
সেই শাখটের বিরুদ্ধে এখনও নানা মোকদ্দমা চলছে। অপরাধ? তিনি নাকি গ্যোরিঙ, রিবেন্ট্রপের মতো হিটলারের নন্দী-ভঙ্গীর দলে ছিলেন। তা সে যাই হোক তিনি কিন্তু এ যাবৎ খালাসই হয়ে আসছেন, গোটা দুই মোকদ্দমা এখনও মুলতুবি আছে।
