এ ব্যাপারটার ইঙ্গিত ন্যুরনবের্গের দলিল-দস্তাবেজ থেকে পাওয়া গিয়েছে। মঁসিয়ে কার্তিয়ে সেটা চেপে যাননি।
এই হল পটভূমি।
[দৈনিক বসুমতী]
.
হিটলার মাহাত্ম্য
মসিয়ো কার্তিয়ের কেতাব লে সেক্রে দ্য লা-গের (Le Secrets de la Guerre)-এর সঙ্গে আপনাদের খানিকটে পরিচয় গেল যবনিকান্তরালে হয়ে গিয়েছে। সময় থাকলে তার কেতাবখানা অনুবাদ করে আপনাদের শুনিয়ে দিতুম– উপস্থিত তার থেকে মূল তথ্যগুলো নেওয়া যাক।
একটা বিষয়ে মসিয়োর প্রশংসা না করে থাকা যায় না। ইভা ব্রাউনের সঙ্গে হিটলারের কী সম্পর্ক ছিল তা নিয়ে তিনি কেলেঙ্কারি কেচ্ছা তো রচনা করেনইনি, বরং ব্যাপারটা অনেকখানি সহানুভূতি দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করেছেন। মসিয়োর মতে হিটলার যদিও আহার-পানাদি ব্যাপারে সংযমী ছিলেন, তবু একথা বললে ভুল হবে যে, হিটলার স্ত্রীজাতিকে ঘৃণার চোখে দেখতেন অথবা স্ত্রী-সংসর্গ তিনি আদপেই পছন্দ করতেন না। হিটলারের চরিত্র সম্বন্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন গ্যোরিঙ, কাইটেল, ঘোড়, র্যাডার, জ্যোনিস, জেনারেল ব্লমবেৰ্ঘ, এন ব্রাউখটিশ, ফন বন্টস্টেট, হালডের, মিলঘ, পাউলুস, ফন ফাঙ্কেনহ, ইত্যাদি বড় বড় জঁদরেলরা। এঁদের সবাই যে হিটলারের ইয়ার-বক্সির দলে ছিলেন তা-ও নয়। এঁদের মত নিলে দেখা যায়, হিটলারের নারীলিপ্সা আর পাঁচজনের মতোই ছিল; কিন্তু দেশের কাজ নিয়ে অহরহ তার মন এমনি মগ্ন থাকত যে, তার যৌনক্ষুধা কখনও তার সম্পূর্ণ বিকাশ পায়নি।
এখানে মসিয়ো ঠিক তত্ত্বটা ধরতে পেরেছেন। হিটলার জর্মন জাতি, তার ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যৎ সফলতাকে এত ভক্তি শ্রদ্ধা করতেন যে, অন্য কোনও জিনিস তাঁর মনের ভিতর ঠাই পেত না। আর পাঁচজন সঙ্গীসাথীর জন্য হিটলার অনেক সুখ-সুবিধা করে দিয়েছিলেন; কিন্তু নিজের জন্য তিনি কিছুই করেননি। এমনকি বেরেস্টেঘগার্ডেনে তিনি যে প্রাসাদ নির্মাণ করিয়েছিলেন তাতে তাঁর নিজের জন্য কামরা আসবাবপত্র ছিল কমই। তিনি তাঁর সহকর্মীদের জন্য সেখানে উত্তম বন্দোবস্ত করে রাখতেন; এমনকি যারা কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকার দরুন স্ত্রী-পরিবারের কাছে যাবার সুবিধে পেতেন না তাদের পরিবারকে বেরেস্টেঘগার্ডেনে আনিয়ে রাখবার ব্যবস্থা করে দিতেন। হিটলারের সহচরেরা বলেন কিন্তু বেরেস্টেঘগার্ডেনের জীবনযাত্রার সঙ্গে ইভা ব্রাউনের প্রায় কোনও যোগাযোগই ছিল না। তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকতেই ভালোবাসতেন ও অতি দৈবাৎ কেউ তাঁকে দেখতে পেত।
ইভা ব্রাউন সুন্দরী ছিলেন এবং হিটলারকে প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিলেন। মসিয়ো এ সম্বন্ধে আলোচনা করার প্রয়োজন বোধ করেননি; এবং না করে আমার মতে ভালোই করেছেন। ইভা ব্রাউনের জীবনকাহিনী আমি অন্যত্র পড়েছি এবং তাঁর প্রেমের কাহিনী পড়ে অত্যন্ত বেদনা অনুভব করেছি। হিটলারকে তিনি তেমন করে পাননি, আর পাঁচটি মাটির গড়া তরুণী তাদের বল্লভকে যেরকমধারা পায়। এই না-পাওয়ার দুঃখ ইভা ব্রাউনকে শেষদিন পর্যন্ত কাতর করে রেখেছিল। অসাধারণ মানুষকে ভালোবাসতে পারার দুঃসহ সৌভাগ্য ইভা ব্রাউন বুঝতে পেরেও কোনওদিন মেনে নিতে পারেননি।
মসিয়ো কিন্তু আরেকটি খাঁটি তত্ত্বকথা আবিষ্কার করেছেন।
হিটলার যখন রাইনল্যান্ডে সৈন্য পাঠান তখন তার জেনারেলরা তারস্বরে প্রতিবাদ করেছিলেন, তিনি যখন পরপর অস্ট্রিয়া এবং চেকোশ্লোভাকিয়া দখল করেন তখনও তারা আপত্তি করে বলেছিলেন ইংরেজ-ফরাসি তা হলে জর্মনির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে, হিটলার বলেছিলেন, করবে না। তাই যখন হিটলার পোলান্ড আক্রমণ করবার জন্য জেনারেলদের প্রস্তুত হতে আদেশ দিলেন তখন তারা আর অতটা তীব্র কণ্ঠে প্রতিবাদ করেননি, ইংরেজ-ফরাসি যুদ্ধ ঘোষণা করল বটে; কিন্তু হিটলারের ব্লিসক্রিগ বা বিদ্যুৎগতিতে যুদ্ধ এমনি অল্প সময়ের মধ্যে এতটা সফল তা দিল যে, জেনারেলরা হতভম্ব হয়ে হিটলারের কাছে নাকে খৎ দিলেন।
এবং শুধু তাই নয়। নুরনবের্গের দলিলপত্র থেকে মসিয়ো সপ্রমাণ করেছেন যে, পোলান্ড অভিযানের সমস্ত প্ল্যান করেছিলেন স্বয়ং হিটলার। হিটলার আপন জেনারেলদের সঙ্গে যুদ্ধ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন সত্য; কিন্তু গোটা যুদ্ধটা কীভাবে চালাতে হবে, কখন চালাতে হবে, কতটা ডিভিশন লাগাতে হবে, সেনাদলের কোন ভাগ কোন গতিতে কোন দিকে অগ্রসর হবে, এ সমস্ত ব্যাপার হিটলার একা বসে রাতের পর রাত খেটে খেটে তৈরি করতেন।
অথচ আশ্চর্য, হিটলার কোনওদিন কোনও মিলিটারি স্কুলে যুদ্ধবিদ্যা শেখেননি। কাউকে গুরু বলে তিনি তো স্বীকার করেনইনি, এমনকি ঝুনো জাঁদরেলদের উপদেশও তিনি অবজ্ঞা করে যেতেন।
হিটলার গুরু বেছে নিয়েছিলেন রণবিদ্যার পূর্বাচার্যগণদের ভিতর থেকে। কাইটেল বলেন, হিটলার রণবিদ্যা শিখেছেন শিফেন, মটকে এবং ক্লাইজেবিৎসের কাছ থেকে। পৃথিবীর যত বড় বড় যুদ্ধাভিযান হয়ে গিয়েছে, হিটলার সবকটা অধ্যয়ন করেছিলেন বহু বিন্দ্ৰি যামিনী যাপন করে। বিশেষ করে ফ্রেডরিক দি গ্রেটের প্রত্যেকটি অভিযানের সঙ্গে তিনি সুপরিচিত ছিলেন।
ফ্রান্সকে হারিয়েছেন একা হিটলার বেলজিয়াম, হল্যান্ড, নরওয়ে, গ্রিস জয় করেছেন একা হিটলার। মস্কো, স্তালিনগ্রাদ পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিলেন একা হিটলার।
