নিবেদন করছি। আমি আপনারই মতো ভারতীয়। সন ২৯-এ যখন জর্মনি যাই তখন হিটলার জর্মনিতে কল্কি, কিন্তু পেয়েছেন বটে বসবার জন্য ইট পাননি। ১৯৩৮-এ যখন শেষবারের মতো জনি ছাড়ি তখন স্বয়ং চেম্বরলিন জর্মনিতে উড়োউড়ি করছেন হিটলারের মন পাবার জন্য। কাজেই হিটলার সম্বন্ধে আমার দু চারটে তথ্য জানার কথা আপনি নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আপনি হয়তো আরও বললেন, ফরাসি গ্রন্থকার তোমার চেয়েও ঢের বেশি জানে।
কবুল। কিন্তু হিটলার বাবদে ফরাসি গ্রন্থকারের চেয়ে আপনার-আমার মতো ভারতীয়দের নিরপেক্ষ থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কারণ ফ্রান্স আমাদের জানের দুশমন নয়, জর্মনি আমাদের দিলের দোস্তও নয়। ফ্রান্স-জর্মনি দুই-ই আমাদের কাছে বরাবর– এবং এ সম্বন্ধে এন্টনি ফিরিঙ্গি যে মোক্ষম তর্জাখানা ঝেড়েছেন সেটি অশ্লীল বটে, কিন্তু এমন তাগসই আপ্তবাক্য আর কেউ কখনও শোনাতে পারেননি।
থাক সে কথা।
কেতাবখানার নাম লে সেক্রে দ্য লা গের (Les Secrets de la Guerre) অর্থাৎ যুদ্ধের খবর। গোপন গ্রন্থকারের নাম রেমো কার্তিয়ে। সায়েব বিস্তর কাঠখড় পুড়িয়ে নরনবের্গ মোকদ্দমার দলিল-দস্তাবেজ ঘেঁটে এ কেতাবখানা তৈরি করেছেন। বইখানার ষাটের সংস্করণ আমার হাতে পড়েছে। ছাপা ১৯৪৬ সনে। তাই বিবেচনা করি আরও অনেক সংস্করণ ইতোমধ্যে হয়ে গিয়েছে। গ্রন্থকার আরও বিস্তরে বিস্তর কেতাব পয়দা করেছেন। তার মধ্যে নাম করা চার্চিল, রজোভেল্ট এবং পিটার দি গ্রেটের জীবনী।
তা হলে কোন সাহসে এ গুণীর সঙ্গে কাজিয়া করি? তবে সায়েবদের প্রবাদেই রয়েছে Fools rushing where angels fear to tread অর্থাৎ বামুন যেথা ঢুকতে নারে, চাড়াল সেথা লক্ষ মারে। ষাট হাজারি বাজারে গুণীজন ঢুকতে ভয় পেতে পারেন, আমার কী পরোয়া!
মসিয়ো কার্তিয়ের সঙ্গে আমার প্রথম এবং প্রধান ঝগড়া যে তিনি কোনও জায়গায় রুশের কথা তোলেননি। মসিয়ো গোটা লড়াইটার দোষ একমাত্র হিটলারের কাঁধেই চাপাতে চান। রুশ শেষ মুহূর্তে যদি জর্মনির সঙ্গে সন্ধি না করত তবে যে হিটলার কস্মিনকালেও পোলাভ আক্রমণ করবার হিম্মৎ যোগাড় করতে পারতেন না সে কথাটা কার্তিয়ে সায়েব কর্তন করে গিয়েছেন। হয়তো উত্তরে মসিয়ো বলবেন, রুশ এ যুদ্ধের জন্য কতটা দায়ী সে কথাটা যেসব দলিলদস্তাবেজে স্বপ্রমাণ হয়, সেগুলো নুরনবের্গে পেশ করা হয়নি।
কথাটা ঠিক। গোড়ায় গলদ এখানটায়ই যেহেতুক রুশ (এবং মিত্র পক্ষ) ফরিয়াদি তাই রুশের বিরুদ্ধে যেসব দলিল-দস্তাবেজ অকাট্য সাক্ষ্য দেবে সেগুলো চেপে রাখা হয়েছে। তাই যদি হয় তবে হিটলার তথা জনপক্ষের পুরা তসবির ফুটবে কী প্রকারে?
কিন্তু এ গোড়ার গলদের গোড়ায়ও আরেকটা গলদ রয়েছে। সেটাও নরনবের্গ এবং কাজে কাজেই মসিয়ো চেপে গেছেন। হিটলারের সঙ্গে রুশের মিতালি হওয়ার পূর্বে এই হিটলার এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গকে লাই দিয়ে আসমানে চড়াল কে?
ইংরেজ। ১৯৩০-৩২-এ জর্মনির প্রধানমন্ত্রী নিঙ যখন ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে করে জিনিভা-লন্ডনে মাকু চালাচ্ছিলেন, তখন ইংরেজ হাত গুটিয়ে বসে ছিল। ব্রুনিঙ কান্নাকাটি করে ইংরেজকে বহুবার বলেছিলেন, জর্মনির এ দুর্দিনে যদি তোমরা দু মুঠো ময়দা দিয়ে সাহায্য না কর, তবে আমাদের সোস্যালিস্ট সরকার টিকতে পারবে না। ফলে হিটলার আর তার কট্টর ন্যাশনালিস্ট দলের হাতে গোটা দেশটা চলে যাবে। আর তারা যে শান্তি চায় না, চায় যুদ্ধ, সেকথা তারা লুকিয়ে রাখেনি, তোমরাও বিলক্ষণ জানো। বিশ্বশান্তি যদি চাও, তবে উপস্থিত জর্মনকে বাঁচানোই তোমাদের প্রধান কর্তব্য।
ইংরেজ তখন কানে তুলো দিয়ে বসে ছিল। তার কারণ, ইংরেজ তখন মনে মনে অন্য প্যাঁচ কষছে। ইংরেজের সে প্যাঁচের পিছনে যুক্তি ছিল এই– নিঙের সমাজতন্ত্রী দলকে দানাপানি দিয়ে তাগড়া করে কোনও লাভ নেই। ইংরেজ-রুশে যদি কোনওদিন লড়াই লাগে তবে সমাজতন্ত্রী জর্মনি পত্রপাঠ রুশের সঙ্গে যোগ দেবে। অথচ ইংরেজের প্রধান উদ্দেশ্য রুশকে বিনাশ করা। তাই ইংরেজের উচিত নিঙ আর সমাজতন্ত্রী দলকে গদি থেকে সরিয়ে এমন এক খাণ্ডারকে বসানো, যে ব্যক্তি রুশের নাম শুনলেই মারমুখো হয়ে ওঠে। মাইন কাম্পফে হিটলার অন্তত সাতান্ন বার বলেছে, মোকা পেলে সে রুশকে তুলোধুনো করে ছাড়বে। অতএব হাইল হিটলার আর ফ্র্যনিঙকো কান পকড়কে নিকাল দো।
এই যুক্তির জোরেই ইংরেজ জর্মনিতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে দিল না। হিটলার শক্তি পেলেন। জর্মনি কট্টর ন্যাশনালিস্ট এবং রুশদ্রোহী হয়ে উঠল। ইংরেজ ড্যাম গ্ল্যাড।
তার পর ইংরেজ হিটলারকে দানাপানি দিতে আরম্ভ করল। হিটলার যখন রাইনল্যান্ডে সৈন্য পাঠালেন তখন হুকুম দিয়েছিলেন যে যদি ইংরেজ বা ফরাসি তখন সৈন্য নিয়ে আক্রমণ করে, তবে পিছু হটে বার্লিনে ফিরে আসবে– কারণ জর্মন বাহিনী তখনও যথেষ্ট তাগড়া হবার সুযোগ পায়নি। হিটলারের জেনারেলরা একবাক্যে বলেছিলেন, ইংরেজ-ফরাসি যুদ্ধ ঘোষণা করবেই করবে। হিটলার বলেছিলেন, করবে না কারণ তিনি বিলক্ষণ জানতেন ইংরেজের দুষ্ট মতলব জর্মনি যা চায় তাকে তাই দেওয়া যাতে করে গাট্টাগোট্টা হয়ে একদিন রুশের মোকাবিলা করতে পারে।
