কিন্তু মিশরিরা আমাদের মতো সহিষ্ণু নহে। ১৯১৯ সাল হইতে ব্যাপক আন্দোলনের ফলে তাহারা সম্পূর্ণ পরাধীনতা হইতে ১৯৩৯ সালে অভ্যন্তরীণ বহু সুযোগ সুবিধা লাভ করিতে সমর্থ হইয়াছিল।
সম্পূর্ণ স্বাধীনতা মিশর কখনও পায় নাই ও আমাদের বিশ্বাস ভারতবর্ষ স্বরাজ না পাওয়া পর্যন্ত ইংরেজ অধ্যুষিত কোনও অঞ্চলই সম্পূর্ণ স্বরাজ পাইবে না।
মিশরের সম্পূর্ণ স্বরাজ পাওয়ার পথে অন্তরায় মিশরস্থিত ইংরেজবাহিনী। সুদ্ধ মিশরি বাহিনী একটি আছে বটে ও একদিন তাহাদের শোভাযাত্রা দেখিবার সুযোগও আমার হইয়াছিল। বন্দুক-কামান দেখিয়া এক নাগরিককে জিজ্ঞাসা করিলাম, এগুলি কি নেপোলিয়ন এদেশে ফেলিয়া গিয়াছিলেন? উত্তরে নাগরিক করুণ কণ্ঠে বলিল, সে সৌভাগ্য কোথায়? এগুলি ১৯১৮-এর যুদ্ধের বরবাদ জঞ্জাল। ইংরেজের কাছ হইতে হীরার মূল্যে কেনা। এগুলি কখনও কোনও কাজে লাগিবে না। কিন্তু বন্দুক-কামান ছাড়া সৈন্যবাহিনী নিতান্ত হয় না বলিয়াই ক্রয় করা হইয়াছে।
১৯১৯ হইতে ১৯৩৯ পর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ মিশরস্থ ব্রিটিশ বাহিনীর উপর নির্ভর করিয়া মিশরের রাজনৈতিক আন্দোলন পর্যবেক্ষণ করিয়াছে। ওয়াফদ দল যখনই ক্ষমতা গ্রহণ করিয়া পূর্ণ স্বরাজের পথে দেশকে অগ্রগামী করিতে চেষ্টা করিয়াছে তখনই রাজার উপর চাপ পড়িয়াছে ওয়াদকে বিতাড়িত করিবার। সে চাপ উপেক্ষা করিবার ক্ষমতা নাই কারণ তাহার সেনাসামন্ত কোথায়? অত্যধিক দুগ্রীব হইলে সিংহাসনচ্যুত হইতে কতক্ষণ? সাম্রাজ্যবাদের দুর্বিষহ তাড়নার ফলে রাজা পুনঃপুনঃ দেশের জনমত পদদলিত করিয়া ওয়াফদ দলকে বিতাড়িত করিয়া কখনও ইসমাইল স্বিদকীপাশাকে চোটা মুসোলিনি তখনও হিটলার সর্বাধিকারী হন নাই–রূপে দেশ শাসন করিতে দিয়াছেন; যখনো ইয়াহইয়া পাশার মতো নপুংসককে প্রধানমন্ত্রী করিয়া দেখিয়াছেন, দিনের পর দিন মন্ত্রণা সভায় তিনি ওয়াফদ কর্তৃক কিরূপ লাঞ্ছিত হইয়াছেন। সেন্ট্রাল অ্যাসেম্বলির উভয়কর্ণকর্তিত নির্লজ্জতা শুধু এদেশে নহে, মিশরে ও অন্য সর্বপরাধীন দেশে দুর্গন্ধ সাম্রাজ্যবাদ-বাতে স্ফীত বেলুনের ন্যায়, উড্ডীয়মান হয়। দেশের লোক তাজ্জব মানিয়া উদগ্রীব হইয়া নানাবর্ণের সেই বেলুনের খেলা দেখে; জানে, সূত্র কাহার হস্তে এবং ইহাও জানে, সাম্রাজ্যবাদের পতন হইলে পর এগুলিকে নষ্ট করিবার জন্য সূচ্যগ্রই যথেষ্ট।
কিন্তু পূর্বেই নিবেদন করিয়াছি– মিশরিরা অসহিষ্ণু। কোন মহাপ্রলয়ের পূর্ব মুহূর্তে স্বরাজ সপ্রকাশ হইবেন, সে আশায় বসিয়া থাকিতে জানে না। কাজেই যখনই কোনও নপুংসক বা চোটা মুসোলিনি জনমত উপেক্ষা করিয়া রাজ্যচালনা করিবার চেষ্টা করিয়াছে তখনই তাহারা ব্যাপক আন্দোলন চালাইয়াছে; গত সপ্তাহে যাহা করিয়াছে তাহা যে কতবার করা হইয়াছে তাহার হিসাব রাখিতেও মিশরিরা ভুলিয়া গিয়াছে।
১৯৩৯ পর্যন্ত এই লীলা চলিয়াছিল। যুদ্ধ লাগার অল্প কিছুদিন পরেই ব্রিটিশ দেখিল যে, মিশরকে সম্পূর্ণরূপে করায়ত্ত না করিলে যুদ্ধ চালানো অসম্ভব। ওয়াফদ দল ইংরেজকে সেই সঙ্কটের সময় সাহায্য করিতে প্রস্তুত ছিল বটে, কিন্তু দেশের সর্বস্ব বিনাশ করিয়া নহে। কে জানে, বাঙলা দেশের দুর্ভিক্ষের ন্যায় সেখানে কোনও অঘটন ঘটনের প্রয়াস চলিতেছিল কি না– কারণ, জাপানের ইফল আগমন ও রমেলের অল-অলামেন গমন তো একই রোগ– বৈদ্যরাজ যখন একই তখন ঔষধও একই হইবে না কেন? সে যাহাই হউক, ওয়াফদ সরিয়া দাঁড়াইল, আকাশে দেখা দিলেন দুর্গন্ধবাতপূর্ণ বেলুন, আলি মেহের পাশাই প্রধানমন্ত্রীরূপে। তৃতীয়বার বলি, মিশরি অসহিষ্ণু। আততায়ীর হস্তে আলি মেহের প্রাণ হারাইলেন। তখন আসিলেন নুক্ৰাশি পাশা। ইতোমধ্যে যুদ্ধ শেষ হইয়াছে। মিশরিরা দেখিল, বহু কষ্টে, বহু রক্তপাতে অর্জিত তাহাদের অভ্যন্তরীণ আংশিক স্বাধীনতা যুদ্ধের হট্টগোলের ভিতর হারাইয়া ফেলিয়াছে। সন ১৯১৯-এ ফিরিয়া আসিয়াছে। অর্থাৎ সমস্ত রাত প্রাণপণ নৌকা বাহিয়া সূর্যোদয়ের সময় দেখে নৌকা বাড়ির ঘাটে।
চতুর্দিকে কচুরিপানা। মিশরি মরিয়া হইয়া সেই পানা কাটিতে উদ্যত। পানা বলে– মধ্যপ্রাচ্যের জল শীতল রাখিবার জন্য বিশ্বশান্তির জন্য নিঃস্বার্থভাবে আমরা আছি। মিশরিরা বলে তাহা হইলে সুয়েজখালের ওই পারে প্যালেস্টাইনে গিয়া থাকিলেই পার।
ইহার সদুত্তর-অসদুত্তর সরকার কিছুই দেন নাই।
[আনন্দবাজার পত্রিকা, ১.৩.১৯৪৬]
.
যবনিকান্তরালে
ফরাসি বইয়ের দোকান থেকে যে কেতাবখানা কিনেছিলাম, তার সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেব এরকম একটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলুম সে কথাটা মনে পড়েছে। কারবারে আদালতে হরবকতই ওয়াদা-খেলাফ করা হয়, আইন-আদালত ব্যবসায়ী-কারবারি তার জন্য প্রস্তুতও থাকেন কিন্তু খোসগল্পের বাজারে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার মানে মকমল ডিক্রি কবুল করে নেওয়া। কিস্তি রদবদলের কথা তুললেই সবাই চেঁচিয়ে বলে, দেউলে হওয়ার নোটিশ দাও, বুরুজ হয়ে গেছ মেনে নাও।
করি কী? কারণ কেতাবখানা ভালো না। অর্থাৎ আমার মতের সঙ্গে কেতাবখানা সায় দেয়নি। নিরপেক্ষ পাঠক হুঙ্কার ছেড়ে বলবেন, অবাক করলে! তোমার মতের সঙ্গে কেতাবখানার মত মিলল না বলেই কেতাবখানা খারাপ? এ তো বড় তাজ্জব কি বাৎ।
