তা পাউক। কিন্তু যেসব ভূখণ্ড সুলতানের হাতছাড়া হইল সেগুলি স্বরাজ পাইল না। ইংরেজ ও ফরাসিতে মিলিয়া আরবদিগকে এমনি নির্মম শোষণ করিতে লাগিল যে, তাহাদিগের মোহমুক্ত হইতে বেশিদিন লাগিল না। সুলতানের কড়াইসিদ্ধ হইতে লাফ দিয়া বচিতে গিয়া আরব যে ইংরেজ-ফরাসির নগ্ন অগ্নিতে পড়িয়াছে, সেকথা বুঝিতে পারিল।
তখন সর্বত্র সংগ্রাম আরম্ভ হইল। মিশরের প্রাতঃস্মরণীয়– সর্বাধীনতাকামীর প্রাতঃসন্ধ্যাস্মরণীয়– সাদ জগলুল পাশা তখন মিশরের জন্য যে সংগ্রাম করিলেন, তাহা পৃথিবীর ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকিবে।
প্যালেস্টাইনে মহামুফতি সেই প্রচেষ্টায় নিযুক্ত হইলেন; আজ তিনি গৃহহারা দেশত্যাগী।
নজদের ইবনে সাউদ মক্কা হইতে ইংরেজের ক্রীড়নক শেরিফকে তাড়াইয়া পূর্ণ হিজাজের স্বাধীনতা অর্জন করিলেন। ইবনে সাউদ আজ পৃথিবীর রাজাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা শক্তিমান। শুধু শক্তিমান নহেন, ন্যায় ও ধর্মাচরণে দেশের দশের মঙ্গলসাধন কর্মে তিনি লিপ্ত।
এইসব বিভিন্ন ভূখণ্ডের আরবেরা ন্যাশনালিজম বা জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করে না। প্যালেস্টাইনের আরব এই কথা বলে না যে, সে সিরিয়ার আরব হইতে ভিন্ন। এবং একথাও বুঝিয়াছে যে ইরাক, মিশর, সিরিয়া যদি পৃথক পৃথকভাবে স্বাধীনতা অর্জনে লিপ্ত হয় তবে ইংরেজ-ফরাসি সেই সনাতন দ্বিধা করিয়া পরাধীন রাখো বা ডিভাইড এন্ড রুল নীতি বলবৎ রাখিবে। একথা, এ নীতি সর্বাপেক্ষা অধিক হৃদয়ঙ্গম করিয়াছেন ইবনে সাউদ।
সমস্ত আরবকে কী করিয়া এক পতাকার নিচে সম্মিলিত করিয়া খ্রিস্ট-শোষক-নীতি নির্মূল করা যায় তাহার সাধনা ইবনে সাউদ গত ত্রিশ বৎসর ধরিয়া করিয়াছেন।
হয়তো আজ সে সুদিন আসিয়াছে।
খবর আসিয়াছে, ইবনে সাউদ মিশরের রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে গিয়াছেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যে সংগ্রামানলে মধ্যপ্রাচ্য শীঘ্রই উদ্দীপ্ত হইবে, তাহাতে প্রধান কর্মকর্তা হইবেন ইবনে সাউদ। মিশর হিজাজ-নজদ অপেক্ষা অনেক সভ্য অর্থাৎ ইয়োরোপীয় কায়দাকানুনে পরিপক্ক তাই হিজাজ-নজদের আরবের ধমনিতে যে উষ্ণ স্বাধীন রক্ত প্রবাহিত তাহার সঙ্গে মিশরি রক্তের তুলনা হয় না। তাই হিজাজি আরব সংগ্রামের পুরোভাগে থাকিবে।
মধ্যপ্রাচ্যে সম্মিলিত আরবশক্তি যখন সাম্রাজ্যবাদের বিপক্ষে সগ্রাম ঘোষণা করিবে তখন যেন ভারতবর্ষও তাহার সুবর্ণ সুযোগ না হারায়।
[আনন্দবাজার পত্রিকা ২৩.২১৯৪৬]
.
মিশর
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যনীতি কী দুর্দান্ত হৃদয়হীনরূপে প্রকাশ পাইতে পারে, তাহার প্রকৃষ্ট উদাহরণ মিশর দেশ। সে সাম্রাজ্যনীতি ইংলন্ডে কে রাজত্ব করিতেছে তাহার উপর বিন্দুমাত্র নির্ভর করে না; শ্রমিক দলই হউন আর রক্ষণশীল দলই হউন মিশর সম্বন্ধে কূটনীতি কখনও পরিবর্তিত হয় না। সে নীতি দ্বিধা করিয়া সিধা রাখো নহে, কারণ সাম্রাজ্যবাদের পরম দুর্ভাগ্যবশত মিশরে দ্বিখণ্ডিত করিবার মতো দুই বর্ণ, ধর্ম বা সম্প্রদায় নাই। মিশরের প্রাচীনতম অধিবাসীরা কণ্ঠ। যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইহারা ধর্ম পরিবর্তন করিয়া করিয়া সর্বশেষে খ্রিস্টান হয় এবং আরব অভিযানের পর ইহাদের অধিকাংশ মুসলমান হইয়া যায়। মুষ্টিমেয় যে কতিপয় খ্রিস্টান কপ্ট এখন মিশরে আছে, তাহাদিগকে সাম্প্রদায়িক আরক খাওয়াইয়া উন্মত্ত করিবার চেষ্টা যে কখনও করা হয় নাই এমন নহে, কিন্তু প্রাতঃস্মরণীয় সাদ জগলুল পাশার বদান্যতা সাম্রাজ্যনীতির ক্ষুদ্র প্রলোভনকে পরাজিত করে ও কপ্টরা অল্পদিনের মধ্যেই সম্যক হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ হয় যে, তাহাদের চরমস্বার্থ কাহার উপরে নির্ভর করিলে সুরক্ষিত হইবার সম্ভাবনা বেশি। ইদানীং মিশরে যে ব্যাপক আন্দোলন হইতেছে, তাহাতে করা হয় যোগদান করে, না হয় এক পার্শ্বে দণ্ডায়মান হইয়া সহানুভূতির সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে; কিন্তু কোনও অবস্থাতেই তৃতীয়পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়া ইহকাল পরকাল বিনষ্ট করিতে সম্মত হয় না। মিশরের অন্যতম প্রধান নেতা, অর্থনীতিতে তাবত মিশরীয়দের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বিচক্ষণ মুকরিম পাশা আবিদ খ্রিস্টান কপ্ট। ব্যক্তিগত কারণে ওয়াফদ দলের নেতা মুস্তফা নহাজ পাশার সঙ্গে তাহার কখনও কখনও মনোমালিন্য হইয়াছে ও তিনি ওয়াফদ-বিরুদ্ধ মন্ত্রিসভায় অংশগ্রহণ করিয়াছেনও বটে, কিন্তু দেশের অনিষ্টকারী কোনও দলের সঙ্গে যোগদান করিয়া তিনি কখনও স্বধর্মাবলম্বীদিগের জন্য অন্যায় পারিতোষিক গ্রহণ করেন নাই।
মিশর সম্বন্ধে তাই সরকারের চিরন্তন নীতি– যত কম পারো দাও, যতদিন পারো ঠেকাইয়া রাখো। দ্বিতীয়ত, দেশ চুপচাপ থাকিলে কোনও নতুন সন্ধি-শর্তের আলোচনা আদপেই করিবে না, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে হিংস্র, অহিংস কোনও আন্দোলন হইলেই বলিবে– আমাদিগকে ভয় দেখাইয়া কিছুই হইবে না, প্রথম আন্দোলন থামাও, তার পর সন্ধি-শর্ত লইয়া আলোচনা হইবে। গত সপ্তাহে মিশরে যে হানাহানি হইয়া গেল, তাহার উত্তরে ইংরাজ কর্তৃপক্ষ বলিয়াছেন, উই শান্ট বি ইন্টিমিডেটেড। এ নীতি কিছু নবীন নহে। আমরাও বলি, বর্ষাকালে ছাত মেরামত করিবার উপায় নাই, কারণ বৃষ্টিপাত হইতেছে, শীতকালে করিবার প্রয়োজন নাই, কারণ বৃষ্টি কোথায়?
