১৯৪৫-৪৬ অবস্থা ভিন্ন। মধ্যপ্রাচ্যে সরকারের একচ্ছত্র আধিপত্য। ফরাসি সম্পূর্ণ ঘায়েল। সে জখমি কুকুরের ন্যায় দেশের ক্ষতস্থল লেহন করিতেছে, মধ্যপ্রাচ্যের শিকার তাড়না করিবার মতো উৎসাহ ও শক্তি তাহার আদপেই নাই। প্রমাণস্বরূপ এইটুকু বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, দিনকয়েক পূর্বে সিরিয়া যখন ফরাসিকে তম্বি করিয়া বলিল, কুইট সিরিয়া তখন তাহাকে কর্ণ মর্দন করিবার মতো বাঘা, ক্রেমাসে আর নাই, মেরা ভেদো বিদো (ফরাসি পররাষ্ট্র সচিব Bidault) সকরুণ কণ্ঠে কহিলেন, ইংরাজ সরকার সিরিয়া সম্বন্ধে যাহা কর্তব্য বিবেচনা করেন, আম্মো তাহাই করিব। অর্থাৎ জ্ঞানদাসী ভাষায় বলিলেন, বধু, তোমার গরবে গরবিনী হম, ভীতুয়া তোমার ভয়ে।
কিন্তু হায়, এই নশ্বর সংসারে অবিমিশ্র আনন্দ কোথায়? ফরাসি নাই, জর্মন নাই; তাবৎ মধ্যপ্রাচ্য সরকার পুরষ্ট্র পাঁঠার ন্যায় ঘোঘোত করিয়া বেড়াইতেছেন, চণ্ডীমণ্ডপের ভয় নাই, তথাপি প্রশ্ন যদিস্যাৎ বিপদ উপস্থিত হয় তবে ত্রাণ করিবে কে? পূর্ববঙ্গে একটি প্রবাদ আছে–
একা ঘরে বউ হয়ে খেতে বড় সুখ,
মারের বেলায় ধরবে কে, ওই বড় দুখ।
অর্থাৎ যে বাড়িতে শাশুড়ি নাই, ননদী নাই, জা নাই সে বাড়িতে একা বউ নিত্য নিত্য নতুন রান্না করে, স্বামীকে খাওয়ায়, নিজে মনের সুখে খায়, কিন্তু বিপদ কিল মারার গোসাই যখন কাঁঠাল পাকানো আরম্ভ করেন, তখন তাহাকে ঠেকাইবার মতো কেহই থাকে না। কাজেই বিচক্ষণা বউ একটি যত অপ্রিয়ই হউক না কেন বিধবা-সধবা জা ননদীর সন্ধানে থাকে।
সদাশয় সরকার অধুনা সেই সন্ধানে আছেন। কারণ ইরান হইতে লিবিয়া পর্যন্ত সরকার যত ঘোঁতঘেতই করুন না কেন, কিল মারার গোসই রাশিয়া দরজার কাছে বসিয়া কখন যে কী করিয়া বসে তাহার ঠিক নাই। তখন তাহাকে ঠেকাইবে কে? ফরাসি নাই, জর্মনি নাই, ইটালি নাই, এমনকি জাপানও নাই। অন্যকে দিয়া লড়ানোর কায়দা সরকার এত যুগ ধরিয়া রপ্ত করিয়াছেন; অন্য সবই লড়িয়া লড়িয়া প্রাণ দিয়াছে। তবে কি আখেরে সরকারকেই লড়িতে হইবে? সে যে অভূতপূর্ব অচিন্তনীয়।
তবে ভয় নাই, বোকা মার্কিন রহিয়াছে। জর্মনিকে শেষ পর্যন্ত সে-ই শায়েস্তা করিয়াছে। রুশকেও কেনই বা সে-ই শায়েস্তা করিবে না?
উপস্থিত তাহাকে প্যালেস্টাইনের ফঁদে বাঁধা হইয়াছে।
প্যালেস্টাইনের জমিজমার উপর সদাশয় সরকারের কোনও লোভ নাই একথা তাহার পরম শত্রুও স্বীকার করিবে। সেখানে তেল নাই, লোহা নাই, কয়লা নাই, কিছুই নাই যাহার উপর লোভ করা যাইতে পারে। যাহাও বা সামান্য কিছু আছে, যথা লবণ সমুদ্র হইতে উৎপাদিত রাসায়নিক দ্রব্যসামগ্রী তাহাও ইহুদিরা এমন দাম দিয়া কিনিতে প্রস্তুত যে, সুচতুর ইংরাজ কারবারি সে দাম দিতে রাজি হইবে না। কাজেই প্যালেস্টাইনে ইংরাজের স্বার্থ সেখানে সমর, নৌ ও বিমানঘাঁটি নির্মাণ করিয়া মধ্যপ্রাচ্য হাতের কজায় রাখা। এবং প্যালেস্টাইনে যদি মহাপ্রলয় পর্যন্ত সরকারের থাকার বাসনা থাকে, তবে সে দেশ আরব বা ইহুদি কাহাকেও ছাড়িয়া দেওয়া যায় না। অতএব সেখানে সেই সনাতন অথচ চিরনবীন পন্থা, ভাগ করিয়া রাজত্ব করো, চালাইতে হইবে। সেই দ্বিধা করণ উচাটনমন্ত্র জপিয়া জপিয়া সরকার পুনরায় প্যালেস্টাইনকে পাকিস্তান-ইহুদিস্থান রূপে দ্বিধা করিতে চাহিয়াছেন–১৯৩৮ সালে প্রথম এই প্রস্তাবটি করা হয়, তখন ইহুদি-আরব দুই দলই হুঙ্কার দিয়া তীব্রস্বরে প্রতিবাদ করিয়াছিল। এখনও করিবে সন্দেহ নাই।
কিন্তু এই নীতি ইংরেজ একা চালাইতে পারিবে না বলিয়া দোসর খুঁজিতেছিল। মূর্খ মার্কিন ধরা দিয়াছে। আমেরিকার বহু ধনপতি ইহুদি, তাহারা বস্তা বস্তা ইহুদি প্যালেস্টাইনে চালান করিতে বসে– এদিকে সদাশয় সরকার আরবকে কথা দিয়াছিলেন যে, আর ইহুদি আমদানি করা হইবে না। কাজেই সরকার মার্কিন ইহুদি ধনপতিদিগকে বলিলেন, ১৫০০ ইহুদি প্রতি মাসে প্যালেস্টাইন চালান করিতে দিব কিন্তু আরব আপত্তি করিলে এবং আরব অতি অবশ্য করিবে– সে ঠেলা তোমাদিগকে সামলাইতে হইবে। ইহুদি ধনপতি তৎক্ষণাৎ রাজি হইল– যুদ্ধ থামিয়া যাওয়ায় তাহার বিস্তর টমিগান, মেসিনগান বেকার পড়িয়া আছে। সেইসব মাল গোপনে ও ইহুদি মাল প্রকাশ্যে প্যালেস্টাইনে চালান করিতেছে– আরবের নাকের ডগার উপর দিয়া। আরব আপত্তি করিলে ইহুদিরা ওইসব বন্দুক কামান দিয়া আরবকে নির্বংশ করিবে।
সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকান ইংরেজের সঙ্গে যুগ কৌন্সিলে বসিয়া ইহুদিগের সুরাহার তদারকি করিতেছে। মার্কিন ইহুদি খুশি, এখতেয়ার চালাইতে পারিয়া– ইংরেজ খুশি মার্কিনকে অক্টোপাশের পাশে জড়াইতে পারিয়া।
এতদিন মার্কিন ইংরেজের হইয়া লড়িত, এখন ইংরেজের হইয়া নোংরা পলিটিক্সও করিবে। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রতীক মার্কিন কুসংসর্গে পড়িয়া নিরীহ আরবকে ধর্ষণ করিবে। মূখের ইহাই পরম গতি।
এই বিশাল ভূখণ্ডের অধিকাংশ এককালে তুর্কির সুলতানের সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। ১৯১৮-এর যুদ্ধের পর সুলতানের প্রায় সকল ক্ষমতা যায়– ক্রুসেডের আমল হইতে খ্রিস্টশক্তিবর্গ সুলতানকে হৃতবল ও হৃতসর্ব করিবার যে প্রচেষ্টা চালাইয়াছিল, তাহা ১৯১৮-এ সফল হয়। সুলতানের তখন এমন অবস্থা যে খাস তুর্কিতেও তাঁহার স্বাধীনতা লোপ পাইয়াছে।
