কিন্তু এদেশের কোন রাজবন্দি কোন বড়কর্তার ব্যক্তিগত শত্রু? জেলে যাইবার পূর্বে কোন বন্দি কোন জমাদার-হাবিলদার-সুপরিন্টেন্ডেন্ট-হাকিম-লাটের ব্যক্তিগত শত্রুতা করিয়াছে? বরঞ্চ উল্টো কথাই তো শুনিয়াছি। বিপদ-আপদে এইসব সর্বত্যাগীদের নিকট হইতেই তো তাহারা সাহায্য পান সরকারের লাল ফিতার কালা অনাচারের প্রতিবাদ করিতে হইলে তো গোপনে ইহাদের দ্বারস্থ হন; কৌন্সিলে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করান, খবরের কাগজে দুর্নীতি নিবারণের আন্দোলন করান ইহাদেরই দ্বারা।
(৩) হিমলার নিজে স্যাডিস্ট ছিলেন এবং যখন দেখিলেন যে সুস্থ জর্মন জেলার ওয়ার্ডাররা বন্দিদিগকে অমানুষিক অত্যাচার করিতে রাজি হয় না তখন তিনি সমস্ত জৰ্মনি হইতে বাছিয়া বাছিয়া একদল স্যাডিস্ট সংগ্রহ করেন এবং তাহারাই ক-ক-গুলিতে পাশবিক অত্যাচার করিয়া অনৈসর্গিক আনন্দ লাভ করিত।
ইংরাজ সরকার স্যাডিস্ট বাছাই করেন এ অভিযোগ কখনও শুনি নাই। গণ্ডমূর্খ বাছাই করার নীতি কোথাও কোথাও আছে শুনিয়াছি।
সর্বশেষে সর্বাধিক মারাত্মক পার্থক্যটি দেখাইবার চেষ্টা করিব।
(৪) নাৎসিরা হৃদয়মন দিয়া বিশ্বাস করিত যে, তাহারা দেশের দশের তথা বিশ্বজনের মঙ্গলার্থে নাৎসি আন্দোলন আরম্ভ করিয়াছে ও সেই পুণ্য প্রচেষ্টায় অগ্রসর হইতেছে। যাহারা তাহাদের বাধা দিবার চেষ্টা করেন তাহাদের বেশির ভাগই কম্যুনিস্ট। আদর্শে আদর্শে সেখানে লাগিল নিদারুণ দ্বন্দ্ব। যে জিতিল সে অন্যকে দেশদ্রোহী সমাজদ্রোহী ও বিশ্বদ্রোহী হিসাবে চরম শাস্তি দিল।
কিন্তু ভারতে তো তাহা নহে। সদাশয় সরকার যে সৃষ্টির কোন আদিম প্রভাতে সদম্ভে বলিয়াছেন ভারতবর্ষে চরম আদর্শ স্বরাজ লাভ তাহা আমাদের স্মরণ নাই। তদবধি মহামান্য সম্রাট হইতে আরম্ভ করিয়া লাট-বেলাট সকলেই সেই কথাটি বারবার বলিয়াছেন।
দমদম-আলিপুরের বন্দিরাও ওই আদর্শেই বিশ্বাস করেন। আদর্শে আদর্শে এখানে কোনও দ্বন্দ্ব নাই। তফাতের মধ্যে এই যে, সদাশয় সরকার স্বরাজ দিবার শুভ দিনটি কত হাজার বৎসর পরে কোন প্রলয়রাত্রির পূর্বমুহূর্তে ছাড়িবেন তাহা বলেন নাই, বলিবার বাসনাও রাখেন না। ভাবটা এই সবুরে মেওয়া ফলে। দেশসেবকেরা বলেন, মেওয়া ফলিয়ে যে পচিবার উপক্রম করিল। দুর্ভিক্ষে পচিতেছে, অশিক্ষা-কুশিক্ষায় পচিতেছে, রোগ-মহামারীতে পচিতেছে, নৈরাশ্য-হাহাকারে পচিতেছে। আর কত অপেক্ষা করিব?
অর্থাৎ ইংরেজিতে যাহাকে বলে timing বাঙলাতে যাহাকে বলি লগ্ন সেই লইয়াই তফাৎ। এবং এই সামান্য তফাতের জন্য এত লাহোর, এত লালকেল্লা? ইংরেজরা তো খ্রিস্টান। প্রভু যিশু বলিয়াছেন, হে ভগবান অদ্যকার রুটি অদ্যই দাও। আরও বলিয়াছেন, কল্যকার ভাবনা আজ ভাবিও না, অর্থাৎ অদ্যকার কর্তব্য আজই সমাপ্ত কর। আমরা নেটিভরা সংস্কৃতে বলি শুভস্য শীঘ্রং, আরবিতে বলি অল-ইন্তিজারু আশাদু মিনাল মওত অর্থাৎ অপেক্ষা করা মৃত্যুযন্ত্রণার অপেক্ষাও পীড়াদায়ক।
সর্বজনকাম্য মঙ্গলদায়ক স্বরাজ লাভের জন্য যাঁহারা কিঞ্চিৎ অসহিষ্ণু তাঁহাদের জন্য শাস্তি!
নিন্দুকে বলে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা এদেশে আছে উদর পূর্তির জন্য। যদি তাহাই সত্য হয়, তাহা হইলে সে তো আরও নিদারুণ। তাহারা অর্থ তো এই দাঁড়াইবে যে, স্বাধীনতাকামীরা নিঃস্বার্থভাবে যে পুণ্যকর্ম করিতেছেন, স্বার্থান্বেষীরা তাহাতে বাধা দিতেছে তাহা হইলে তো সেই বাধা দানের প্রতীক আলিপুর, দমদমা নির্মাণ করাই পাপ। সেখানে কী শাস্তি দেওয়া হইতেছে না হইতেছে তাহার আলোচনা তো অত্যন্ত অপ্রয়োজনীয়– বেলজেনের সঙ্গে তুলনা কোথায়?
হিটলার কখনও কোনও ক-ক হইতে কাহাকেও খালাস করিয়া মিত্রভরে আহ্বান করিয়া বলেন নাই আইস, তোমার সঙ্গে সহযোগিতা করিয়া দেশের মঙ্গল সাধন করি। কারণ নাৎসিদের হিসাবে তাহারা দেশদ্রোহী কুষ্ঠরোগী।
[আনন্দবাজার পত্রিকা ৯.১১.১৯৪৫]
.
মধ্যপ্রাচ্য
মধ্যপ্রাচ্য লইয়া সদাশয় সরকার সমূহ বিপদগ্রস্ত হইয়াছেন। বিপদে পড়িলে মানুষের বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পায় ও তখন রাগের বশে হাঙ্গামহুজ্জৎ করে ও যত্রতত্র কটুবাক্য নিক্ষেপে লিপ্ত হয়। বেভিন-ভিশিনস্কিতে যে বাক্যালাপ হইল তাহার ভাষাতে কিঞ্চিৎ বিশেষ রস-সম্পর্কের আত্মীয়তাবাচক শব্দ প্রয়োগ করিলেই মুক্ত মৎস্যহট্টে সে ভাষা জয়ধ্বনি লাভ করিবে।
সরকারের উষ্মর কারণ পশ্চাতের দিকে দৃষ্টিপাত। ১৯১৯ সনের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া সরকার দেখেন, তখন যুদ্ধের রক্তক্ষয়ের ক্ষতিপূরণস্বরূপ প্রভু জিহোভা তাহাকে ইরান দিয়াছিলেন, ইরাক দিয়াছিলেন, হিজাজ দিয়াছিলেন, ট্র্যান্সজর্ডন দিয়াছিলেন, প্যালেস্টাইন দিয়াছিলেন, এমনকি তাবৎ মিশরদেশ এবং সুদান দিয়াছিলেন, ইস্তেক বসফরস-দার্দানেলেজসহ তুর্কি দিয়াছিলেন। একমাত্র সিরিয়া-লেবাননে ফরাসি ঈষৎ নাসিকাগ্র প্রবেশ করাইয়াছিল, কিন্তু কালক্রমে তাহা কর্তন করিতে বিশেষ অসুবিধা হইত না।
অর্থাৎ তাবৎ মধ্যপ্রাচ্য সরকারের হাতে, খানিকটা সরকারি খানিকটা বেসরকারিভাবে। এবং এই মধ্যপ্রাচ্যে সরকারের ফরফরদালালি খবরদারি সরদারি মৌজুদ ছিল বলিয়াই রমেলকে হারানো সম্ভবপর হইল, অতিকষ্টে সরকার মহতী বিনষ্টি হইতে পরিত্রাণ পাইলেন।
