সদাশয় সরকারকে কোনও অনুরোধ আমি কখনও করি না। কিন্তু এখন করিতেছি, হে সরকার বাহাদুর, দমদমায় সুপারিন্টেন্ডেন্টের নোকরিটি খালি পড়িলে স্টেটমেনকে দিও। মাগৃগি ভাতা আমরাই বারোয়ারি করিয়া দিব।
বেলজেনের ভিতরে কী অত্যাচার হইত ও ভারতীয় জেলে কী অত্যাচার হইতেছে তাহার আলোচনা আমরা করিব না। কারণ বেলজেন জাতীয় যে আধা ডজন ক-ক জর্মনিতে ছিল সেগুলি মিত্রশক্তি তন্ন তন্ন করিয়া, দলিলদস্তাবেজ ঘটিয়া, মাটি খুঁড়িয়া, ফটো তুলিয়া, বাইস্কোপ বানাইয়া, তেইশ লোক ঘুরাইয়া সর্বত্র বিনামূল্যে বিতরণ করিয়াছেন। ইংরাজরাজত্বে ভারতে এদেশবাসীরা যেদিন অক্ষরে অক্ষরে সে সুযোগ পাইবে সেইদিনই ভিতরকার তুলনা সম্ভবপর হইবে। তদুপরি আরেকটা মারাত্মক তফাৎ রহিয়াছে। ক-ক মাত্র আধ ডজনখানেক ছিল। ভারতবর্ষে জেলের সংখ্যা কত ঠিক জানি না। বোধহয় ছয়টির বেশিই হইবে। সেই পঙ্গপালের আনাচে-কানাচে সরকারের জানা-অজানাতে, সুপারিন্টেন্ডেন্টের হুঁশিয়ার খেয়াল-খুশিতে কী হইতেছে না হইতেছে তাহার হিসাবনিকাশ করিতে হইলে বিরাট সেনসাস আপিসের হাজারো জেরা বসাইতে হইবে। আর বসাইয়াই বা হইবে কী? রবীন্দ্রনাথই বলিয়াছেন–
রাজকারা বাহিরেতে নিত্যকারাগারে
জেলের বাহিরেও তো জেল। এই যে মাত্র সেইদিন কলিকাতার বুকের উপর অসংখ্য লোক না খাইয়া মরিল তাহা কোন বেলেজেনে কী সংখ্যায় হইয়াছে স্টেটমেনই জানেন।
পাঠক স্বপ্নেও ভাবিবেন না, আমরা ক-কর পক্ষে সাফাই গাহিতেছি। এমন অপকর্ম করিলে যেন আমরা কোনওদিন স্বাধীনতা না পাই। যুদ্ধ লাগিবার পূর্বেও ইংলন্ড সরকার জানিতেন ডাশাও ও ওর্যানয়েনবুর্গে কী হয় না হয়; পূর্বে উল্লিখিত হেন্ডারসেন সাহেবের পুস্তকে তাহার উল্লেখ আছে। তবে যুদ্ধ না লাগা পর্যন্ত সরকার এ সমস্ত জনির নিতান্ত ঘরোয়া ব্যাপার বলিয়া কোনও উচ্চবাচ্য করেন নাই। যুদ্ধ লাগার পর সরকার ইহাদের প্রচুর নিন্দা করিয়া তাহাদের মতে প্রামাণিক ব্লু-বুক প্রকাশ করেন। নিঃস্বার্থ সত্যের খাতিরে, না ইংরাজ জনগণের মন জর্মনবিমুখ করিবার জন্য তাহা আমাদের জানা নাই। কিন্তু ভারতবাসীরা যুদ্ধ লাগার পূর্বেও নাস অনাচারের নিন্দা করিয়াছেন।
হলপ করিয়া বলিতে পারিব না, কিন্তু ভাসা ভাসা মনে পড়িতেছে স্বয়ং স্টেটসমেনও ক-কর নিন্দা করিয়া যুদ্ধ লাগার পূর্বেই লিখিয়াছিলেন। তাই জিজ্ঞাস্য, কংগ্রেসের বড় বড় নেতারা ভারতীয় জেলের নির্মম নিন্দা না করা পর্যন্ত স্টেটসমেন কয়বার জেল-তদন্ত চাহিয়াছেন। দেশের মৃদু প্রতিবাদ গুঞ্জরণ কি স্টেটমেনের মতো ভারি কাগজের পাতলা কানে কখনও পৌঁছায় নাই? আশ্চর্য!
কিন্তু এসব কথা থাক। স্টেটসমেনের কথায় বেলজেন চলে নাই, আলিপুর চলে কি না জানি না।
কিন্তু আসল তফাৎ কোথায় ও সে তফাৎ কাহার স্বপক্ষে কাহার বিপক্ষে যায় পাঠক বিবেচনা করিবেন।
(১) যুগ-পরিবর্তনকারী আন্দোলনের পুরোভাগে সবসময় শান্তশিষ্ট ভদ্রমণ্ডলী থাকেন না বড় বড় অভিযানেও না। ভারতে ইংরাজ রাজত্বের প্রথম প্রতিষ্ঠাতারা খানদানি ঘরের সুবোধ ছেলে ছিলেন না। ক্লাইভ-হেস্টিংস ইত্যাদি সব দুদে দস্যি ছেলে– অ্যাডভেঞ্চারার! অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ঔপনিবেশিকগণ সম্বন্ধেও নানা কথা শুনিয়াছি। ইহারা কিড গ্লাভস বা মোলায়েম নিয়মে বিশ্বাস করে না।
জর্মনির ভদ্রঘরের সুবোধ ছেলেরা যখন ফরাসি-ইংরেজ তথা লিগ অব নেশনের বিস্তর খোসামোদ করিয়া রাজ্য চালনা করিতে পারিলেন না, তখন তাহাদিগকে পদাঘাত করিয়া আসিল স্টুদেরা। তাহাদের সর্দার হিটলার, হিমলার, শ্লাইখার, রোম জাতীয় ঐতিহ্যহীন অশিক্ষিত নিষ্ঠুর, জেল নীতিতে অনভ্যস্ত শক্রর প্রতি নৃশংস সাক্ষাৎ খাণ্ডার। তাহারা মোলায়েম নিয়মে বিশ্বাস করে না। তাহারা যে নিষ্ঠুর প্রথা অবলম্বন করিতে পারে ইংরেজের তো সে হক নাই।
ক্লাইভ ভারতীয়দের কোন বেকায়দায় শায়েস্তা করিতেন জানি না কিন্তু তাহার পর তো দুই শত বত্সর কাটিয়াছে। এতদিনে তো সে দুরন্তপনা চলিয়া যাইবার কথা। যদিও নেহরুজি বলিয়াছেন যে, এদেশের আইসিএস আপিসাররা অপদার্থ তবু তো স্বীকার করিতে হয় ইহাদের অনেকেই অতি ভদ্র ঘরের ছেলে, বেশির ভাগই ইংলন্ডের সর্বোত্তম বিদ্যায়তনে শিক্ষালাভ করিয়াছেন, গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন বলিয়াই জানি, নাৎসি বড়কর্তাদের ন্যায় নীচ তাড়িখানায় মাতলামি করেন না, রোম জাতীয় জঘন্য অনৈসর্গিক লিপ্সা হঁহাদের আছে একথা কখনও শুনি নাই।
কাজেই তাঁহাদের ব্যবহারের সমালোচনা আমরা করি। তাহাদের হুকুমে চিমটিটি কাটা হইলে সে বেলজেনের মুষল অপেক্ষাও নিন্দনীয়।
বাঙলার লাট দুনিয়ার নামকরা রাজনৈতিক, ভারতের বড়লাট বড় বড় লড়াই করিয়া নাম করিয়াছেন– হারাজেতার কথা সবসময় উঠে না– ইহাদের বিশ্বরূপ আছে। ইহাদের আমলে জেলে ক্ষুদ্রতম অন্যায় হইলেই ইহাদের বিশ্বমূর্তির মৃত্তিকা পদযুগ বাহির হইয়া পড়িবে। আমাদের ইচ্ছা হঁহাদের বিশ্বরূপ যেন অটুট থাকে, ভারতের জেলে যেন রাজনৈতিক বন্দি না থাকে। তাহারা সেই মহৎ কার্যটি তো অনায়াসেই করিতে পারেন।
(২) ক-কর বহু বন্দি নাৎসিদের ব্যক্তিগত শত্রু ছিল। কেহ হিটলারকে মারিবার চেষ্টা করিয়াছে, কেহ হিটলারের বন্ধু হর্সট বেজেলকে খুন করিয়াছে, কেহ রোমকে চাবকাইয়াছে, কেহ গ্যোবেলসকে অপমান করিয়াছে। নাৎসিরা শক্তি পাইয়া যে ইহাদের হত্যা করিবে ও বহুদিন ধরিয়া জিঘাংসার আনন্দ পাইবার জন্য না মারিয়া অত্যাচার করিবে, ইহা তো বোঝ। যায়, যদিও ক্ষমা করা যায় না।
