প্ল্যানমাফিকই রানি হঠাৎ যেন লক্ষ না করিয়া সেই কক্ষে উপস্থিত হইলেন। তরুণ-তরুণী ঈষৎ লজ্জিত হইয়া সম্মানার্থে নত মস্তকে দাঁড়াইলেন। রানি সোহাগ মাখিয়া অমিয়া ছানিয়া সপত্নী-পুত্রকে বলিলেন, বাচ্চা, তোমার মাতা নেই, আমিই তোমার মাতা। তোমার সুখ-দুঃখের কথা আমাকে বলিবে না তো কাহাকে? তোমার বিবাহের ভার তো আমার স্কন্ধেই। এই কন্যা যদি তোমার মন হরণ করিয়া থাকে তবে এবম্প্রকার ব্রীড়াবনত হইতেছ কেন? তর্জি-কন্যার পাণিগ্রহণ অতীব শ্লাঘনীয়। তোমার হৃদয় কী বলে?
হৃদয় আর কী বলিবে? ইনায়েত তখন কাওকাব ও রানির দুই জালে বদ্ধ মক্ষিকা।
হৃদয় যাহা বলে বলুক। মুখে কী বলিয়াছিলেন, সে সম্বন্ধে কাবুলের চারণরা পঞ্চমুখ। কেহ বলেন, তিনি মৌনতা দ্বারা সম্মতি প্রকাশ করিয়াছিলেন; কেহ বলেন, মৃদু আপত্তি জানাইয়াছিলেন, কেননা জানিতেন যে, নসর-কন্যার সঙ্গে তাহার বিবাহ প্রায় স্থির; কেহ বলেন, মৃদুস্বরে সম্মতি প্রকাশ করিয়াছিলেন, কেননা পূর্বমুহূর্তেই নাকি অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করিয়া প্রেম নিবেদন করিয়া বসিয়াছিলেন–হয়তো ভাবিয়াছিলেন প্রেম আর বিবাহ তো ভিন্ন ভিন্ন শিরঃপীড়া পরমুহূর্তেই এড়াইবেন কী করিয়া; কেহ বলেন, শুধু হুঁ হুঁ হু হু করিয়াছিলেন তাহা হইতে হস্ত-নিস্ত (হ-না– যে কথা হইতে বাঙলা হেস্তনেস্ত আসিয়াছে) কিছুই বুঝবার উপায় ছিল না। কেহ বলেন, তিনি কিছু প্রকাশ করিবার পূর্বেই রানি কক্ষ ত্যাগ করিয়াছিলেন। অর্থাৎ কাবুল চারণবর্গের পঞ্চমুখ পঞ্চতন্ত্রের কাহিনী বলে।
অর্থাৎ সেই অবস্থায় রাজা হউক, রাজপুত্র হউক, প্রজা হউক, দাস হউক, সাধারণ লোক গুরুজনের সম্মুখে যাহা করিয়া বা বলিয়া থাকে, ইনায়েত তাহাই করিয়াছিলেন।
কিন্তু কী বলিয়াছিলেন, তা জানিবার যত না প্রয়োজন, তদপেক্ষা অধিক প্রয়োজন, রানি-মা মজলিসের সম্মুখে গিয়া সে বলার কী অর্থ প্রকাশ করিলেন। জালবদ্ধ ভারতবাসী মাত্রই জানে, আমরা ক্ষীণকণ্ঠে দেশে আবেদন ক্রন্দন করিয়া কী বলি না বলি তাহার ওপর নির্ভর করিয়া নুন, মুদলেয়ার বিশ্বের মজলিসে নিজেদের ভাষণ তৈয়ার করেন না। তাহাদের কণ্ঠ রাজকণ্ঠ। সে প্ল্যানে খোলে, প্ল্যানে বন্ধ হয়।
রানির কণ্ঠ মজলিসের আনন্দোল্লাস ধ্বনি ক্ষণিকের মতো ছাপাইয়া উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করিল, আজ পরম আনন্দের দিন। যুবরাজ ইনায়েত তর্জি-কন্যা কাওকাবকে বিবাহ করিবেন। খানা-মজলিস রাত্রি দুইটার সময় ভাঙিবার কথা ছিল; তাহা বাতিল। সূর্যাস্ত পর্যন্ত আনন্দোৎসব চলিবে। আজ রাত্রেই আমি কন্যাপক্ষকে প্রস্তাব পাঠাইতেছি।
মজলিসের ঝাড়বাতি দ্বিগুণ আভায় জুলিয়া উঠিল। চতুর্দিকে হর্ষধ্বনি, আনন্দোচ্ছাস। দাসদাসী ছুটিল বিবাহ প্রস্তাবের তত্ত্বের তত্ত্বতাবাস করিতে। সবকিছুই রাজবাড়িতে সেই দ্বিপ্রহর রাত্রে মৌজুদ পাওয়া গেল। আশ্চর্য হইবার সাহস কাহার?
তর্জি হাতে স্বর্গ পাইলেন; কাওকাব হৃদয়-স্বর্গ পাইয়াছেন।
সঙ্গে সঙ্গে রানি হবিবউল্লার নিকট সুসংবাদ জানাইয়া দূত পাঠাইলেন। মাতা ও রাজমহিষীরূপে তিনি ইনায়েতউল্লার হৃদয়ের গতি কোন দিকে জানিতে পারিয়া তর্জি-কন্যা কাওকাবের সঙ্গে তাঁহার বিবাহ স্থির করিয়াছেন। প্রগতিশীল আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ রাজমহিষী সুশিক্ষিত হওয়ার একান্ত প্রয়োজন। কাবুলে এমন দ্বিতীয় বধূ নাই যিনি রাজপ্রাসাদ অলঙ্কৃত করিতে পারেন। প্রাথমিক মঙ্গলানুষ্ঠান খোদাতালার মেহেরবানিতে সুসম্পন্ন হইয়াছে। মহারাজ অতিসত্ত্বর রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করিয়া আকদ-রসুমাতের (আইনত পূর্ণ বিবাহ) দিবস ধার্য করিয়া পৌরজনের হর্ষবর্ধন করুন।
হবিবউল্লা পত্র পাইয়া ক্ষিপ্ত হইলেন, কিন্তু রাগান্ধ হইলেন না। আর কেহ না হউক, তিনি বুঝিতে পারিলেন যে, মূর্ব ইনায়েত নসরকন্যাকে হারায় নাই, হারাইতে বসিয়াছে রাজসিংহাসন। কিন্তু হবিবউল্লা যদিও অত্যন্ত অলস ও কামুক ছিলেন, তবু বুঝিতে তাঁহার বিলম্ব হইল না যে, সমস্ত ষড়যন্ত্রের পশ্চাতে রহিয়াছে মহিষী। বিমাতার এত প্রেম তো সহজে বিশ্বাস হয় না। হবিবউল্লা কখনও পূর্ববঙ্গে আসেন নাই; কিন্তু প্রবাদটি জানিতেন।
সতীন মার কথাগুলি
মধুরসের বাণী
তলা দিয়ে গুঁড়ি কাটেন
উপর থেকে পানি।
ক্রোধ সম্বরণ করিয়া হবিবউল্লা অতি কমনীয় নমনীয় উত্তর দিলেন। খোদাতালাকে অসংখ্য ধন্যবাদ যে মহিষী শুভবুদ্ধিপ্রণোদিতা হইয়া এই বিবাহ স্থির করিয়াছেন। তর্জিকন্যা কাওকাব যে সর্বাংশে রূপগুণসম্পন্না তাহাতে সন্দেহের কোনও অবকাশ নাই। কিন্তু শুধু কাওকাব কেন, সুরাইয়াও সর্বাংশে কাওকাবের ন্যায় সুশিক্ষিতা, সুরূপা, সুমার্জিত। দ্বিতীয় পুত্র আমানউল্লাই বা খাস কাবুলি জংলি বিবাহ করিবেন কেন? অতএব তিনি মহিষীর সদৃষ্টান্ত অনুকরণে সুরাইয়ার সঙ্গে আমানউল্লার বিবাহ স্থির করিয়া সেই মর্মে তর্জির নিকট প্রস্তাব এই পত্র লিখিবার সঙ্গে সঙ্গেই পাঠাইয়া দিয়াছেন। সত্ত্বর তিনি রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করিয়া– ইত্যাদি ইত্যাদি।
হবিবউল্লা জানিতেন রানির মতলব, ইনায়েতের স্কন্ধে কাওকাবকে চাপাইয়া দিয়া, আমানউল্লার সঙ্গে নসরকন্যার বিবাহ দিবার। তাহা হইলে নসরউল্লার মৃত্যুর পর আমানের আমির হইবার সম্ভাবনা অনেকটা বাড়িয়া যায়। হবিবউল্লা সে পথ বন্ধ করিবার জন্য আমানের স্কন্ধে সুরাইয়াকে চাপাইলেন। যে রাজমহিষী কাওকাবের বিদেশি শিক্ষাদীক্ষার প্রশংসায় শতমুখ তিনি কোন লজ্জায় সুরাইয়াকে ঠেকাইবেন? বিশেষত যখন চিহলসতুন হইতে বাগইবালা পর্যন্ত সুবে কাবুল জানে যে সুরাইয়া কাওকাব হইতে উদ্ধৃষ্টা বই নিকৃষ্টা নহেন।
