অস্ট্রেলিয়া, কানাডা গিয়াছে। বিধ্বস্ত, বিধ্বংস ইউরোপে মার্কিন প্রবেশাধিকার চাহিতেছে। চীনের বাণিজ্যাধিকারও নাকি তাহাদিগকে ছাড়িয়া দেওয়া হইয়াছে। তবে ইংরেজ ধনপতিরা যায় কোথায়?
তাই ভয় হইতেছে শ্রমিক দল নির্বিকার চিত্তে ভারতবর্ষকে ডাকিনীর হস্তে সমর্পণ করিবেন। ভূরিভূরি প্রমাণ দিবার উপায় নাই– যদিও পূর্বতন শ্রমিক মন্ত্রিদল ভারতবর্ষের প্রতি কী অনুকম্পা প্রদর্শন করিয়াছিলেন, তাহা অনেকেই ভুলেন নাই! তবে একটি সামান্য নজির নিবেদন করিতেছি। বর্ষা বিজয়ের পর সেখানে রাষ্ট্র-ব্যবস্থার যে নতুন পরিকল্পনা করা হইয়াছে, তাহাতে বর্মিরা পুনরায় মূষিক হইবে। এই প্রাণদণ্ডাজ্ঞায় স্বাক্ষর আছে মোটা মোটা অক্ষরে, কট্টরদের সঙ্গে হাত মিলাইয়া শ্রমিক নেতাদেরও।
[আনন্দবাজার পত্রিকা, ৩.৮.১৯৪৫]
.
আফগান ইতিহাসের মদনাঙ্ক
যে অঙ্কটি আমি লিখিতেছি তাহার মূল ঘটনাগুলি যেকোনো আফগান ইতিহাসে পাওয়া যায় কিন্তু পশ্চাতে যে দাবাবড়ের চাল চালিয়াছিল, তাহা আমি কাবুলে মোল্লা মৌলবি ও রাজপরিবারের লোকের কাছ হইতে সংগ্রহ করি। যাহারা মোগল বাদশাহ আওরঙ্গজেবের পরবর্তী ফখরুখ-সিয়র, নিকু-সিয়র, রফিউদদৌল্লা, রফি উদ-দরজাত, মুহম্মদ শাহ প্রভৃতি বাদশাহের দ্রুত পরিবর্তনশীল ও ঘটনাময় জীবন লইয়া আলোচনা করিয়াছেন, তাহারই জানেন যে, সে যুগের ইতিহাসের কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার পরেই মনে হয়, ইতিহাস পড়িতেছি না, পড়িতেছি সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য রোমাঞ্চকর রোমান্টিক।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আফগানিস্তানের আমির ছিলেন হবিবউল্লাহ খান। তাঁহার ভাতার নাম নসরউল্লা খান ও দুই পুত্রের নাম যথাক্রমে ইনায়েতউল্লা খান ও আমির (পরে) আমানউল্লা খান। পাঠক ভয় পাইবেন না; উপস্থিত এই কয়টি নাম স্মরণ করিয়া রাখিলেই আফগান ইতিহাসের প্রধান নায়কদের ভাগ্যচক্রগতি লক্ষ করিতে পারিবেন।
হবিবউল্লার ভ্রাতা নসরউল্লা দেশের মোল্লাদের এমনি প্রিয়পাত্র ছিলেন যে, জ্যেষ্ঠ পুত্র ইনায়েতউল্লা তাঁহার মৃত্যুর পর আমির হইবেন এই ঘোষণা হবিবউল্লা করিতে সাহস পান নাই। বরঞ্চ দুই ভ্রাতাতে এই নিষ্পত্তিই হইয়াছিল যে, হবিবউল্লার মৃত্যুর পর নসরউল্লা আমির হইবেন ও তাঁহার মৃত্যুর পর আমির হইবেন ইনায়েতউল্লা। এই নিষ্পত্তি দৃঢ়তর করিবার বাসনায় হবিবউল্লা-নসরউল্লায় মীমাংসা করিলেন যে, ইনায়েতউল্লা নসরউল্লার কন্যাকে বিবাহ করিবেন। হবিবউল্লা মনে মনে বিচার করিলেন যে, আর যাহাই হউক, নসরউল্লা জামাতাকে হত্যা করিয়া দামাদ-কুশ (জামাতা-হন্তা) আখ্যায় কলঙ্কিত হইতে চাহিবেন না। ঐতিহাসিকদের স্মরণ থাকিতে পারে, জয়পুরের রাজা অজিত সিং যখন সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয়ের সঙ্গে মিলিত হইয়া জামাতা দিল্লির বাদশাহ ফররুখ-সিয়রকে নিহত করেন, তখন দিল্লির আবালবৃদ্ধবনিতার দামাদ-কুশ দামাদ কুশ চিৎকারে অতিষ্ঠ হইয়া তিনি দিল্লি পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হন। রাস্তার বালকেরা পর্যন্ত নির্ভয়ে অজিত সিংহের পালকির দুই পাশে ছুটিয়া চলিত ও সিপাই বরকন্দাজের তম্বিত উপেক্ষা করিয়া তারস্বরে ঐক্যতানে দামাদ-কুশ দামাদ-কুশ বলিয়া চিৎকার করিত। এমনকি জয়পুরেও তিনি এতই অপ্রিয় হইয়া পড়িয়াছিলেন যে, এক বিশেষ পত্র দ্বারা তিনি জামাতা হত্যার কারণ দর্শাইয়া সাফাই গাহিয়াছিলেন। পত্রখানা অধুনা বোম্বায়ের এক ঐতিহাসিক ত্রৈমাসিকে বাহির হইয়াছে।
হবিবউল্লা-নসরউল্লা-ইনায়েতউল্লা সকলেই এই চুক্তিতে অম্লাধিক পরিমাণে সন্তুষ্ট হইলেন। অসন্তুষ্ট হইলেন মাতৃহীন ইনায়েতউল্লার বিমাতা, আমানউল্লার মাতা, হবিবউল্লার দ্বিতীয় মহিষী। আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব মনে হইতে পারে, কিন্তু তিনিও দাবা খুঁটিগুলির দিকে কড়া নজর রাখিয়া স্থির করিলেন, নসরউল্লা, ইনায়েতউল্লার মতো দুই প্রধান খুঁটিকে মারিয়া তাহার নিজের বড়ে-পুত্র আমানউল্লাকে দিয়া তিনি রাজা (হবিবউল্লাকে) মাত করিবেন।
এমন সময় কাবুলের অতি উচ্চ খানদানি বংশের মুহম্মদ তর্জি সিরিয়া-নির্বাসন হইতে দেশে ফিরিলেন। সঙ্গে তাঁর পরমাসুন্দরী তিন কন্যা, কাওকাব, সুরাইয়া ও বিবি খুর্দ। ইহারা দেশ-বিদেশে দেখিয়াছেন, লেখাপড়া জানেন, উত্তম বেশভূষা পরিধান করিতে পারেন; উঁহাদের উদয়ে কাবুল-কন্যাদের মুখ অতি ম্লান, কুৎসিত, অমার্জিত বা অনকলচরড (অজ জঙ্গল অমদেহ = যেন জঙ্গলি) মনে হইতে লাগিল।
হবিবউল্লা রাজধানীতে ছিলেন না। আমানউল্লার মাতা– যদিও আসলে দ্বিতীয়া মহিষী, কিন্তু ইনায়েতউল্লার মাতার মৃত্যুতে প্রধানা মহিষী হইয়াছেন–এক বিরাট ভোজের বন্দোবস্ত করিলেন। প্রধান অতিথি তর্জি পরিবার, কন্যাগণসহ। রানি অন্তরঙ্গ আত্মীয়স্বজনকে হুকুম দিলেন যে, ইনায়েতউল্লাকে কাওকাবের প্রতি যে কোনওপ্রকারে আকৃষ্ট করিতেই হইবে। বিপুল রাজপ্রাসাদের আনাচে-কানাচে দুই-একটি কামরা বিশেষ করিয়া খালি রাখা হইল। সেখানে যেন কেহ হঠাৎ গিয়া উপস্থিত না হয়।
খানাপিনা চলিল, গানবাজনায় রাজবাড়ি সরগরম। রানি স্বয়ং ইনায়েতউল্লাকে কাওকাবের সঙ্গে আলাপ করাইয়া দিলেন, আর অতি সন্তর্পণে কানে কানে কাওকাবকে বলিলেন, ইনিই যুবরাজ (মুঈন উস-সুলতানে), আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ আমির। কাওকাব ইঙ্গিতটা হয়তো বুঝিয়াছিলেন। অসম্ভব নহে। তাছাড়া শঙ্কারাচার্যও তো বলিয়াছেন, তরুণ তরুণীর রক্ত অনুসন্ধান করে। প্ল্যানটা ঠিক উতরাইয়া গেল। বিশাল রাজপ্রাসাদে ঘুরিতে ঘুরিতে ইনায়েত-কাওকাব পুরীর এক নিভৃত-কক্ষে বিশ্রম্ভালাপে রত হইলেন। ইনায়েত ভাবিলেন, স্বেচ্ছায় ওই কক্ষে উপস্থিত হইয়াছেন (ধর্মশাস্ত্রে যাহাকে বলে ফ্রিডম অব উইল), রানি জানিতেন তাহার জালে ঠিক মাছ ধরিয়াছে (ধর্মশাস্ত্রে যাহাকে বলে প্ল্যানড ডেসটিনি)।
