রানির মস্তকে বজ্রাঘাত। বড়ের কিস্তিতে রাজাকে মাত করিতে গিয়া তিনি যে বিপদগ্রস্ত হইলেন। হবিবউল্লাকে অভিসম্পাত দিলেন, নসরকন্যাকে তুই পেলিনি, আম্বো পেলুম না। তবু মন্দের ভালো, নসরউল্লার কাছে এখন ইনায়েত-আমান দুই-ই বরাবর। ইনায়েতের অক্ষ এখন আর নসরকন্যা সিসায় পক্ষপাতে পুষ্ট হইবে না তো! সেই মন্দের ভালো।
এখন কী কর্তব্য! রানি মন্ত্রণা করিলেন, এখন দ্রষ্টব্য যে হবিবউল্লা যেন এমন সময় মারা যান, যে সময় আমানউল্লার শুভযোগ আছে– ফলিত জ্যোতিষার্থে নহে, এই অর্থে যে তখন। যেন নসর, ইনায়েত কেহই রাজধানীতে না থাকেন। কিন্তু মানুষ মরে ভগবদিচ্ছায় সে আমিরই হউক, আর ফকিরই হউক। অতএব হবিবউল্লাকে হত্যা করিতে হইবে– গুপ্তহত্যা।
রানি হবিবউল্লার দুশমনদের ডাকিয়া পাঠাইলেন।
কিন্তু এইখানে আফগান ইতিহাসের দ্বিতীয় অঙ্ক আরম্ভ হয়। সে অঙ্ক লিখিবেন– কৌটিল্য, কারণ সে অঙ্ক নির্জলা রাজনীতি, অর্থনীতি; আমি মদন-পর্যায় বাৎস্যায়নের হইয়া লিখিয়া দিলাম।
আমি শুধু ভাবি যে তর্জি এই গজকচ্ছপ যুদ্ধে কী বিমলানন্দই না উপভোগ করিয়াছিলেন। ডবল কন্যার জন্য রাতারাতি ডবল রাজপুত্র!
[দেশ পূজাসংখ্যা, ১৩.১০.১৯৪৫]
.
বেলজেন, স্টেটসমেন
১
অহনহনি ভূতানি গচ্ছন্তি কারাদন্দম
শ্বেতাঃ স্থিরমিচ্ছান্তি কিমাশ্চর্যমতঃ পরম।
—(পরিবর্তিত মহাভারত- বকের প্রশ্নে যুধিষ্ঠির)
২৭ অক্টোবরের স্টেটসমেন কাগজের সম্পাদকীয় বেজেন ও এই দেশের জেলের তুলনা করিতে গিয়া নানা কথা বলিয়াছেন। সেগুলির উত্তর আনন্দবাজারে প্রকাশিত হইয়াছে। বেজেন ও ভারতীয় জেলে তুলনা করা যায় কি না, বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে তাহাই দ্রষ্টব্য।
তৎপূর্বে দুই-একটি কথা অবতরণিকা হিসাবে বলিয়া লইলে ভালো হয়। প্রথমত, বেলজেন, বুখেনবাল্ট, ওরানিয়েনবুর্গ, ডাশাওয়ের সঙ্গে আমাদের চাক্ষুষ পরিচয় নাই– স্টেটসমেন সম্পাদকেরও নাই। আলিপুর, দমদমা, লাহোর, লালকেল্লা চিনিবার সৌভাগ্য আমাদের অনেকেরই হইয়াছে ও এখনও হইতেছে। স্বয়ং বিশ্বকবি, পরম খানদানি–কত যে খানদানি তাহার প্রমাণ কবির স্যার উপাধি, তাঁহার পিতামহের প্রিন্স উপাধি স্টেটসমেনের জাতভাইদেরই দেওয়া চিরটা কাল কাটাইলেন পদ্মার বিশাল বক্ষে ও শান্তিনিকেতনের উন্মুক্ত প্রান্তরে। কিন্তু তিনি পর্যন্ত কারারুদ্ধদের প্রতি উল্লেখ করিয়া গাইলেন,
বন্ধন পীড়ন দুঃখ অসম্মান মাঝে
হেরিয়া তোমার মূর্তি কর্ণে মোর বাজে
আত্মার বন্ধনহীন ইত্যাদি।
—(অরবিন্দ রবীন্দ্রের লহ নমস্কার)
যাহা করিতে পারেন নাই-রবীন্দ্রনাথ তাহাও করিয়াছেন। আলিপুরের জেলখানাকেও তাঁহার কাব্যে অমর করিয়া গিয়াছেন;– শুনছি নাকি বাঙলা দেশের গান হাসি সব ঠেলে/ কুলুপ মেরে করছে আটক আলিপুরের জেলে।
***
টুটল কত বিজয় তোরণ লুটলো প্রাসাদ চুড়ো,
কত রাজার কত গারদ ধুলোয় হল গুঁড়ো,
আলিপুরের জেলখানাও মিলিয়ে যাবে যবে,
তখনও এই বিশ্বদুলাল ফুলের সবুর সবে। —(পূরবী)
স্টেটসমেনের খুবসম্ভব সব এই জায়গার সঙ্গে পরিচয় নাই। যাহারা এইসব জায়গায় স্বেচ্ছায় অনিচ্ছায় গমনাগমন করেন, তাহাদের সঙ্গেও বোধ করি, স্টেটসমেনের কোনও যোগাযোগ নাই। তিনি ফিরোতে খান, পেলিটিতে নাচেন; সেসব জায়গায় যাবার মতো অর্থ ও ইচ্ছা রাজবন্দিদের থাকার কথা নহে। আর দুর্ভাগ্যক্রমে উভয়ের যোগাযোগ যদি কখনও হয় তবুও ধরিয়া লইতে পারি যে, স্টেটসমেন তখন পরম উৎসাহে জেলের নিদারুণ কাহিনী আকণ্ঠ পান করেন না। এদিকে সরকারও জেলে যেসব অত্যাচার অনাচার হইতেছে সেসব অভিযোগের কোনও উত্তর দেন নাই– স্বয়ং স্টেটসমেন ও তাঁহার স্টেট অথবা কৃটবুদ্ধি দ্বারা তাহা লক্ষ করিয়াছেন। তবেই প্রশ্ন, স্টেটসমেন বিচার করিতেছেন কী প্রকারে? তাহার আভাসও তিনি দিয়াছেন। ভাবটা এই, ইংরেজের যে জাজ্বল্যমান আদর্শবাদের ইতিহাস রহিয়াছে তাহা হইতে কিছুতেই কল্পনা করা যায় না যে, ভারতের জেলগুলি বেলজেনের দ্বিতীয় সংস্করণ। ইংরাজ যে অনেক মহৎ কীর্তি করিয়াছেন সে বিষয়ে কাহারও মনে সন্দেহ নাই- অবশ্য ধৰ্মত বলিতে গেলে সকল জাতই কিছু না কিছু মহৎ কীর্তি করিয়াছেন ও পরিমাণ নির্ভর করে প্রোপাগান্ডা শক্তির উপর। কিন্তু অভিযোগ উপস্থিত হইলে তো পূর্ব ইতিহাসের উপর নির্ভর করিয়া সবকিছু হাসিয়া বা হিট ব্যাকের ভয় দেখাইয়া উড়াইয়া দেওয়া যায় না। বিশেষত ভারতের জেলগুলি তো ডিন ইন জাতীয় ধর্মভীরু মহাজন দ্বারা চালিত হয় না হইলে কোন পাষণ্ড বেলজেনের সঙ্গে দেশি জেলের তুলনা করিত?
এমন লোক যদি পাওয়া যাইত, যিনি জার্মান ও ভারতীয় উভয় জেলেরই নিকট রস আস্বাদন করিয়াছেন, তাহা হইলে মীমাংসা সহজ হইত। কিন্তু তাহা তো হইবার উপায় নাই। কারণ যে জর্মন জেলে মার খাইয়াছে সে ইংরেজের স্নেহ পায়, আর যে আলিপুর ফের্তা তাহাকে নাৎসিরা বস বলিয়া কোল দেয়। কিন্তু সৃষ্টির কী বিচিত্র প্যাটার্ন নির্মাণ! এইরকম একটি লোকও জন্মিয়াছেন এবং কী কৌশলে যে তিনি অলৌকিক সাধনাটি সিদ্ধ করিতে সমর্থ হইলেন তাহার রহস্য আমরা আজও নিরূপণ করিতে সমর্থ হই নাই।
সেই খানদানি বিশ্বকবির ঘরের ছেলে শ্রীযুক্ত সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা ভাবিতেছি। তিনি জর্মন জেলের নির্যাতন সহ্য করিয়াছেন ও এদেশের জেলের আরাম যে কতবার কত বৎসর ধরিয়া উপভোগ করিয়াছেন সে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে আমরা বিস্মৃত হইয়াছি। তিনি যদি স্বাস্থ্যসমেত দমদমা হইতে বাহির হইয়া আসিতে পারেন, তাহা হইলে তিনি তাহার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দ্বারা আমাদের বহু সমস্যার সমাধান করিতে পারিবেন।
