ইতোপূর্বে বহু সদুদ্দেশ্য লইয়া শ্রমিক মন্ত্রিমণ্ডলী কর্মভার গ্রহণ করিয়াছিলেন বটে, কিন্তু তাহাদের প্রচেষ্টা, তাহাদের আদেশ-উপদেশ পদে পদে খণ্ডিত করিয়াছিল প্রগতি পরিপন্থী, শ্রমিক স্বার্থ-বিরোধী আমলারা। এতদিন ধরিয়া তাহারা যে পদ্ধতিতে রাজ্য শাসন করিয়াছিল, তাহার উলটা করিলে তাহাদের পদমর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় এবং তাহাদের আত্মীয়স্বজন গোষ্ঠীবর্গের স্বার্থহানি হয়। দেশে-বিদেশে কাহারওই বুঝিতে অসুবিধা হয় নাই যে, ইহাদের নবীন তিলকটি শুধু যে অনভ্যাসের তাহা নয়, চন্দনে বিছুটি মাখানোও বটে।
তবে প্রশ্ন, ইহাদিগকে পদচ্যুত করা হইল না কেন? সে সাহস শ্রমিক মন্ত্রিমণ্ডলীর ছিল না; অন্তরায়ও বিস্তর ছিল। প্রথমত, আমলাতন্ত্র যে পাকাঁপোক্ত শতাব্দ-বৃদ্ধ আইনকানুন নজির রেওয়াজের উপর প্রতিষ্ঠিত, তাহা নূতন আইন না গড়িয়া ভাঙা অসম্ভব; দ্বিতীয়ত, শক্তি গ্রহণের প্রথমাবস্থায় তাহা করিতে গেলে প্রগতিপন্থিরা তারস্বরে সে আইনের এমনি কদর্য করিত যে, দেশের পাঁচজন ভাবিত যে, শ্রমিক দলের নেতারা অধর্ম বুদ্ধি দ্বারা চালিত হইয়া প্রাচীন আমলাদের তাড়াইতেছেন–সেইসব আপন আপন আত্মীয়স্বজনকে দিবার জন্য। এই কুৎসা হইতে আত্মরক্ষা কবিবার জন্য শ্রমিক মন্ত্রীরা অনেক সময় জানিয়া শুনিয়াও শ্রমিকবিরোধী কর্মচারীদের গাত্রে হস্তক্ষেপ করেন নাই।
দেশের ভিতরে তো এই। বিদেশে যেসব কনসুলেট, লিগেশন, এম্বেসি সেগুলি ধনপতিদের আত্মীয়স্বজনে পরিপূর্ণ। তাহারা রাজার হালে থাকে, তাহাদের প্রধান কর্ম সরকারি অর্থে, শ্রমিক দলের অনর্থে ভোজ দেওয়া ও ভোজ খাওয়া। তাহাদের অধিকাংশ অভিজাত শ্রেণির; শ্রমিক দলের মুখপাত্র হইতে তাহাদের যেমন লজ্জা, তেমনি ঘৃণা। তাহারা পদে পদে শ্রমিক মন্ত্রিদলের মতামত উপেক্ষা করিয়া পুরাতন নীতি চালাইবার চেষ্টা করিয়াছে ও রাজনৈতিক ধড়িবাজিতে তাহারা বংশানুক্রমে পরিপক্ক বলিয়া দেশের কর্তাদের আদেশ-উপদেশ যে অর্বাচীনতানিবন্ধন, তাহা বিদেশে সপ্রমাণ করিয়া ছাড়িয়াছে। শ্রমিক দলকে অপদস্থ করিতে ইহারাই সর্বাপেক্ষা উদগ্রীব ও অকুতোভয়। ইহাদের পৃষ্ঠে সম্মার্জনী সঞ্চালন সুকঠিন, প্রায় অসম্ভব।
এই দেশি-বিদেশি আমলাদের পিছনে রহিয়াছে রক্ষণশীল ধনপতির দল। ইহারা ব্যাঙ্ক, কারবার, ধর্মসঙ্ (চার্চ), বিশ্ববিদ্যালয়, আইন-আদালত, প্রেস ইত্যাদির শক্তিকুঞ্চিকা লইয়া বসিয়া আছে। শ্রমিক দল ইহাদের এক ধাক্কায় সরাইবার চেষ্টা করে নাই। ইহাদের সহযোগে রাজ্য-চালনা করিয়া ধীরে ধীরে ইহাদের রাজনৈতিক শক্তি কমাইবার চেষ্টা করিয়াছিল। কিন্তু পরিশেষে হস্ত অপেক্ষা আম্র বৃহত্তর হইয়া পড়াতে সফল হয় নাই। পূর্বে প্রকাশিত পরাজিত জর্মনি প্রবন্ধেও উল্লেখ করিয়াছি যে, বাইমার রিপাবলিকের সোশাল ডিমোক্রেট সভ্যগণ শক্তি পাইয়াও এ সাহস সঞ্চয় করিতে পারেন নাই- য়ুঙ্কার, সামরিক কর্তাব্যক্তি, ধনপতিগণের রাজনৈতিক শক্তি কমাইবার চেষ্টা করেন নাই, কংগ্রেস যখন মন্ত্রিমণ্ডলী গঠন করেন, তখন তাহারাও এই বিপদে পড়িয়াছিলেন।
এটলি সাহেব ইতোমধ্যেই কয়েকটি মোক্ষম কথা বলিয়া ফেলিয়াছেন; প্রথমত, নতুন মন্ত্রিসভায় অ-প্রাচীনদিগকে স্থান দেওয়া হইবে। অর্থাৎ প্রাচীন শ্রমিকপন্থিদের এতটা সাহস নাই যে, রক্ষণশীলদের নির্মমভাবে আঘাত করিতে পারে। তাহাদের চক্ষুলজ্জা বেশি ও হন্তকণ্ডুয়ন কম। আমরাও বলি, শবদাহে তরুণদেরই প্রাধান্য দেওয়া উচিত।
দ্বিতীয়ত, যদি তখন শবদেহ উচ্চাবাচ্য করে অর্থাৎ মৃতদেহ ভূতগ্রস্ত হয়, তবে শ্রমিক দল রক্ষণশীল দলের বিরোধিতার জন্য প্রস্তুত আছেন। এই কথাটিই ট্রেড ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট জর্জ আইসাক সাহেব আরও লবণ-লঙ্কা মিশাইয়া হুঙ্কার দিয়া বলিয়াছেন, পূর্বের ন্যায় কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা আর নয়, এইবার দৃঢ় পদক্ষেপে অগ্রগামী হইবে। বাঙলা কথায় যুদ্ধং দেহি।
তৃতীয়ত, খবর আসিয়াছে যে, কনসুলেট, লিগেশন, এম্বেসিগুলির সংস্কার করা হইবে। এতদ্ব্যতীত নানাবিধ খবর আসিয়াছে, তবে সেগুলি সরকারি সিলমোহরযুক্ত নয়– তন্মধ্যে প্রধান এই যে, কতকগুলি মোটা কারবার অচিরাৎ রাষ্ট্রধন করিয়া ফেলা হইবে।
উত্তম প্রস্তাব। কিন্তু প্রশ্ন এই; ধনপতিরা কি এতই নির্জীব যে, চতুর্দিকে বিস্তৃত তাহাদের শক্তিধারাগুলিকে একত্রীভূত করিয়া প্লাবনের দ্বারা শ্রমিকদিগকে ভাসাইয়া দিবার চেষ্টা করিবেন না? ইহার উত্তর কেহই আপ্তবাক্যের ন্যায় নির্ভুল দিতে পারিবেন না, আমরাও অক্ষম। তবে ভাগ্যফল গণনাকালে যেমন কোনওরকম গ্যারান্টি কেহ চাহে না, আমাদের নিকটও আশা করি কেহ নির্ভুল ফল গণনা আশা করিবেন না।
মনে হইতেছে বিনা বিপ্লবে শ্রমিক দল এত বড় শ্রেণিস্বার্থবিরোধী কার্যপরিক্রমা সফল করিতে পারিবেন না। অথচ বিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে রক্তপাতের সম্ভাবনাও তো রহিয়াছে এবং দেশের অভ্যন্তরবর্তী কর্মকলাপে এইসব বর্বর রক্তপাত নীতি তো ইংরেজ বহুকাল হইল বর্জন করিয়াছে। তবে উপায় কী?
উপায় আছে ও সেইখানেই আমাদের মতো গরিব ভারতবাসীর ভয়। আমার মনে হয়, ধনপতিদিগকে দেশে ধনক্ষয় ও শক্তিক্ষয়ের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হইবে বিদেশে। বেদে কথিত আছে, যম পিতৃপুরুষের প্রথম যিনি স্বর্গ অধিকার করেন। মনে হয় পরবর্তী যুগে ইন্দ্র তাহাকে খেসারৎ হিসাবে নরক দান করেন।
