বিধবাবিবাহ প্রচেষ্টা নিষ্ফল করিল শুধু পুরুষ? ওমা, কী ঘেন্না, ছ্যা ছ্যা, বলিয়াছে কাহারা ঐকতানে, নির্মমভাবে?
তাই শ্রদ্ধেয়া লেখিকাকে সবিনয় নিবেদন করি যে, শুধু পুরুষের বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হইলে চলিবে না, আপন ভুল বুঝিয়া নারীকে নারীর বিরুদ্ধে সতর্ক হইতে হইবে, আপন ঘর প্রথম গুছাইতে হইবে। নারী-আন্দোলন ব্যাপকভাবে করিতে হইলে হৃদয়হীন আচারের একজিকিউটিভ অফিসার নারীগণকে তুমিও ভালো, আমিও ভালো বলিয়া আগাইয়া গেলে চলিবে না– মেয়েরাই line of supply কাটিবে– স্রেফ অভ্যাসজনিত হৃদয়হীনতা দ্বারা।
এখন মূল বক্তব্য– শ্রদ্ধেয়া লেখিকা কি বৈদিক যুগেই ফিরিয়া যাইতে চাহেন? বৈদিক যুগই কি বিংশ শতাব্দীতে আমাদের আদর্শ? শুনিয়াছি, বৈদিক যুগেও নাকি পিতা ও ভ্রাতাহীন অরক্ষণীয়াকে ঘৃণ্যবৃত্তিতে যোগদান করিতে হইত। তাহাকে বরদাস্ত করিতে হইবে? জানি ঋষি ওই কু-ব্যবস্থার সমর্থন করেন নাই কিন্তু আদর্শ বাছিবার সময় নিরঙ্কুশ আদর্শ লইব না কেন? আর এক বিপদ এই যে, বৈদিক যুগ বলিতে অথর্ব বেদের যুগও তো বোঝায়। সেখানে দেখি জ্বর হইলে রোগীকে দুই নদীর মোহনায় খড়ের ঘরে শোয়াইয়া খাটে ব্যাঙ বাঁধিয়া মন্ত্রোচ্চারণের ব্যবস্থা– কুইনিনের উল্লেখ নাই। লেখিকা কি সত্যই এই চিকিৎসায় ফিরিয়া যাইতে চাহেন? স্বামী অন্য স্ত্রীতে আসক্ত হইলে সে নারীকে ধ্বংস করিবার যে কৌশল বর্ণিত হইয়াছে (ভাগ্যিস, তাহা ফলপ্রসূ নয়) শ্রদ্ধেয়া লেখিকা কি বিংশ শতাব্দীর নারীকে তাহাই বরণীয় বলিয়া উপস্থাপিত করেন? বিবাহ-চ্ছেদ বা ডিভোর্সের দিকে অগ্রসর হওয়াই কি অধিকতর যুক্তিযুক্ত নহে? অরক্ষণীয়ার বর লাভের জন্য যে প্রজাপতিমন্ত্র শিখানো হইতেছে, এ যুগে তাহাই আমাদের চরম আদর্শ?
আমাদের তো মনে হয়, কী স্মার্ত, কী বৈদিক, সর্বশাস্ত্র মাথায় থাকুন। নারীকে অগ্রসর হইতে হইবে যুগ যুগ সঞ্চিত নিরপেক্ষ অর্থনীতি, রাজনীতি –বিশেষ করিয়া সমাজনীতির প্রসূত জ্ঞানের সাহায্যে কোনও সুবর্ণ বৈদিক যুগে ফিরিয়া যাইবার জন্য নহে, কোনও রঘুনন্দনকে ভুল বলিয়া প্রমাণ করিয়া নহে– তাঁহাকে ও সে যুগকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করিয়া।
আমাদের মতো সাধারণ কোনও নারী বৈদিক যুগে ফিরিয়া যাইতে চাহিলে আমি কোনও উচ্চবাচ্য করিতাম না কারণ যদিও তাহা স্বীকার করিতাম না তবু সে নারীর মনস্তত্ত্ব বুঝিতে পারিতাম। কারণ দেখিয়াছি বহু আন্দোলন গোড়ার দিকে ধার্মিক বা পশ্চাদমুখী হয় অর্থাৎ কোনও কাল্পনিক সুবর্ণযুগে ফিরিয়া যাইতে চাহে। ভারতবর্ষে সর্বপ্রথম যে স্বাধীনতার আন্দোলন হয় তাহাতে বাঙলা দেশে মা কালীকে লইয়া দাপাদাপি করা হইয়াছিল– আজ আমরা আমাদের রাজনৈতিক আন্দোলন মা-কালীকে বাদ দিয়াই করিয়া থাকি (মা কালী নারী; তাঁহাকে যে স্বাধীনতা আন্দোলনে আজ পুরুষ সিংহাসন হইতে নামাইয়া দিয়াছে তাহার জন্য আমরা নারীরা দুঃখিত নই)। কয়েকদিন পূর্বে কলিকাতায় যে আন্দোলন হইয়া গেল, তাহাতে মা-কালীকে আবাহন করা হয় নাই। মুসলিম লীগ নূতন আন্দোলন, তাই সে আন্দোলন ধর্মপ্রধান। ইসলামের সহিত সুপরিচিতা নহি বলিয়া মুসলমান ভ্রাতারা কোন সুবর্ণযুগে যাইতে চাহেন জানি না, কিন্তু ইতিহাস স্মরণ করিয়া ভরসা রাখি তাহারাও একদিন ধর্মালোচনা রাজনীতি হইতে বাদ দিয়া বাঙলা কথা বলিতে শিখিবেন– অর্থাৎ স্পেডকে স্পেড বলিবেন। লেখিকা দর্শনশাস্ত্রে সুপণ্ডিতা তিনি স্থির বিচারে আমাদিগকে পথ দেখাইবেন। কোনও দার্শনিক কি সত্যই কোনও বিশেষ সুবৰ্ণ-যুগে বিশ্বাস করেন?
বঙ্কিম একদিন বলিয়াছিলেন, যাহা শাস্ত্র তাহাই বিশ্বাস্য নহে, যাহা বিশ্বাস্য তাহাই শাস্ত্র। আমরা বলি যাহা বৈদিক যুগ তাহাই কাম্য নহে, যাহা কাম্য তাহাই বৈদিক যুগ। যদি ভবিষ্যৎ সমাজ ও রাষ্ট্রের নারীব্যবস্থা আমাদের মনঃপূত না হয়, কিন্তু চৌকসবৈদিক, তবুও বেদচতুষ্টয়কে পরম শ্রদ্ধাভরে নমস্কার করিয়া লেখিকার সঙ্গে সুর মিলাইয়া বলিব
If you Vedas come, with you; if you do not come inspite of you.
[সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকায় ড. রমা চৌধুরীর নারীর অধিকার শীর্ষক প্রবন্ধের আলোচনা প্রসঙ্গে লিখিত। নিবন্ধটি লেখকের স্বনামে প্রকাশিত হয় নাই। ইন্দ্রাণী সরকার এই ছদ্মনাম লেখক ব্যবহার করেন।]
.
ঘরে বাইরে শ্রমিক নীতি
শ্রমিক দল সংখ্যাগৌরবের বিজয়শঙ্খ বাজাইয়া রাজ্যভার গ্রহণ করিয়াছেন। সে শঙ্খরবের প্রতিধ্বনি সর্বদেশে মুখরিত হইয়াছে। কেহ বা ভয় পাইয়াছেন, কেহ ভরসা পাইয়াছেন। সকলেই একবাক্যে স্বীকার করিয়াছেন যে, আমাদের সকলের অগোচরে, এমনকি, স্বয়ং ইংরেজের অজানাতে ইংলন্ডে রাতারাতি রাজনৈতিক বিপ্লব নিঃশব্দে ঘটিয়া গেল। ইংরেজের স্বভাবই এইরকম– তাহার বাম হস্তের আচরণ দক্ষিণ হস্ত জানিতে পারে না। এস্থলে আরও আশ্চর্যের বিষয় এই যে, স্বয়ং বামহন্তই জানিত না যে সে কী করিয়া বসিয়াছে।
গৃহে যখন এরকম বিপর্যয় ঘটিল, তখন বাইরেও কিঞ্চিৎ হইবে, এইরকম ভয় বা আশা অনেকেই পোষণ করিতেছেন। আমাদেরও দুশ্চিন্তা বাহির লইয়া।
প্রশ্ন এই, শ্রমিক দলের প্রথম কার্য কী হইবে। স্পষ্ট বুঝা যাইতেছে যে, যেসব নিতান্ত প্রয়োজনীয় কর্ম পূর্ববর্তী শ্রমিক দল না করিয়া অপ্রিয়ভাজন হইয়াছিলেন সেগুলি তাহারা এইবার করিতে দৃঢ়সঙ্কল্প হইবেনই।
