আমরা যদি বলি যে, নারীগণই দায়ী, তবে আমরা লিঙ্কনের কথাতেই সায় দিব। আমাদের বক্তব্য, নারী যে তাহার অধিকার হারাইল তাহার প্রধান কারণ অর্থনৈতিক।
বৈদিক যুগে স্ত্রী-পুরুষের সমান অধিকার ছিল, তাহার কারণ যে পুরুষ তখন বেশি ন্যায়ধর্মী ছিল (ও স্মৃতিযুগে অধর্ম পথে চলিল) তাহা নহে। বৈদিক যুগের প্রথমদিকে সমাজ যাযাবর অবস্থায়, শেষের দিকে প্রধানত কৃষি ও গো-পালন সংগঠনে প্রতিষ্ঠিত। এই উভয় ব্যবস্থাতেই স্ত্রীলোকের অর্থনৈতিক মূল্য পুরুষের অপেক্ষা বিশেষ নূন নহে– প্রায় সমান সমান। সেই যাযাবর কৃষি সমাজব্যবস্থার চতুর্দিকে যে ধর্ম ও আচার-ব্যবহারের রীতি-নীতি নির্মিত হইল সেইগুলি সেই কারণেই সমান সমান। গ্রামাঞ্চলে তাই আজও দেখিতে পাইবেন, চাষির মেয়ে-বউয়ের অধিকার মধ্যবিত্তশ্রেণির মেয়েদের চেয়ে অনেক বেশি– চাষির মেয়ে গতর খাটায়, ছেলেও গতর খাটায় মেয়ের উৎপাদনী শক্তি ধান ভানিতে, চাউল কুটিতে, গোয়াল ধুইতে ব্যয়িত হয়। তাহার মূল্য পুরুষের শস্যোৎপাদনের অপেক্ষা কোনও অংশে হীন নহে। তাই চাষার মেয়ের বিবাহে পণ-প্রথা প্রায় নাই, কারণ বর বিবাহ করিয়া বাড়িতে বোঝা লইয়া যাইতেছে না, লইয়া যাইতেছে উৎপাদনী শক্তি। মধ্যবিত্ত ঘরে কন্যা শুধু রন্ধনগৃহ সম্মার্জনই করে, তাহার অর্থনৈতিক মূল্য চাষির মেয়ের তুলনায় কম। চাষির মেয়ের দাম যে কত বেশি তাহার আর একটি উদাহরণ দেই। মুসলমানি চাষি মেয়ে বিধবার বিবাহ হয়। যে চাষির বউ ভালো খাঁটিতে পারে, তাহার স্বামী বিয়োগ হইলে অতি অনায়াসে পুনরায় বিবাহ হয়; অপেক্ষাকৃত অলস বিধবার বিবাহে হাঙ্গামা বেশি। মধ্যবিত্তশ্রেণিতেও দেখিবেন যে মেয়ে মাস্টারি করিয়া টাকা রোজগার করে তাহাকে বউদি, দাদা চোপা দিতে সাহস করেন না। অনেক সময়ে পরিবারে তাহার অধিকার সর্বাধিক।
আমাদের মনে হয়, বৈদিক যুগের শেষের দিকে অর্থাৎ স্মার্ত-যুগ আরম্ভ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রব্যবস্থা জটিল হইতে আরম্ভ করিল। সে জটিল ব্যবস্থার ভিতর বুদ্ধির প্রবেশলাভ ঘটিল। ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজ্য চালনা, সেনা-সংগঠন, যুদ্ধবিদ্যা, নৌ ও জলনিকাশ আয়োজন ইত্যাদি ব্যাপারে গতরের অপেক্ষা বুদ্ধির, সৃজনীশক্তির প্রয়োজন অধিক। যে পুরুষ সেই সমাজ পরিবর্তনের যুগে যত বেশি দান করিতে পারিল তাহার সম্মান ততই বাড়িল। বুদ্ধিজীবীশ্রেণির সৃষ্টি হইল; সে সমাজে স্ত্রীলোককে গতর খাটাইবার আর প্রয়োজন নাই; সে-সমাজে স্ত্রীলোক অপেক্ষাকৃত অপ্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক দৃষ্টিবিন্দু হইতে।
যদি বলি সেই অর্থনৈতিক যুগ-পরিবর্তনের সময়, নূতন রাষ্ট্রনৈতিক সংগঠনের সময় স্ত্রীলোকের অবদান নগণ্য ছিল বলিয়া তাহাদের অর্থনৈতিক মূল্য কমিল, কাজেই সঙ্গে সঙ্গে সমাজে ও ধর্মের নানাবিধ অনুষ্ঠানে তাহার অধিকার হ্রাস পাইল, তবে কি ভুল বলা হয়? লেখিকা দার্শনিক। নিরপেক্ষভাবে কোনও বিদ্যান্বেষণের জন্য চিত্তের যে উৎকর্ষের প্রয়োজন হয় তাহা তাঁহার আছে। তিনি যদি সমাজতত্ত্বের এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঙ্গটি দার্শনিক মননবৃত্তি দিয়া আলোচনা করিয়া নারীজাতিকে সারতত্ত্বটি বুঝাইয়া বলেন, তাহা হইলে আমাদের মহদুপকার হইবে, সন্দেহ নাই। পুরুষের দ্বারা আলোচিত এইসব বিষয় আমাদের সম্পূর্ণ বিশ্বাস আকর্ষণ করিতে পারে না।
দ্বিতীয়ত শ্রদ্ধেয়া লেখিকা সতীদাহ, কৌলীন্য-প্রথা ইত্যাদির বিরুদ্ধে আলোচনা করিতে গিয়া বলিয়াছেন, এইরূপ স্মার্ত ভট্টাচার্যগণের সম্পূর্ণ বেদ-বিরুদ্ধ, বৈষম্যমূলক, অন্যায্য (আমরা অনার্যও বলিব– লেখিকা) বিধি-বিধানে নারীগণ ক্রমশ দুর্গতির চরম গর্ভে নিক্ষিপ্ত হন।
কোনও সন্দেহ নাই; কিন্তু প্রশ্ন, মাত্র পুরুষেরাই কি দায়ী? সতীদাহই ধরুন। পুরুষেরা তো বিধান দিলেন– না-হয় মানিয়াই লইলাম, যদিও বুঝিতে পারিলাম না কেন যে এহেন বিকট বিকৃত মনোবৃত্তি এই ভারতবর্ষের পুরুষেই সঞ্চারিত হইল– কিন্তু প্রশ্ন, নারী কি নারীকেও এই হৃদয়হীন আচারে সাহায্য করে নাই, প্ররোচিত করে নাই? শোকাতুরা বিধবাকে হৃদয়হীনা নারীরা কি চতুর্দিকে ঘিরিয়া সতীদাহের ফলস্বরূপ নানারকম স্বৰ্গ-সুখের বর্ণনা দেয় নাই? জ্বলন্ত চিতায় পতি-অনুগমন না করিলে যে কোনও অজানা শতগুণে যন্ত্রণাদায়ক নরকাগ্নিতে দগ্ধ হইবে তাহার বীভৎস চিত্র অঙ্কন করে নাই? পতি-অনুগমন করিলে যে সে কী ভয়ঙ্কর প্রাতঃস্মরণীয়া হইয়া যুগ যুগ ধরিয়া সমাজের আদর্শস্থলা হইয়া থাকিবে তাহার জাজ্বল্যমান চিতাগ্নি অপেক্ষা সহস্র গুণে জাজ্বল্যমান চিত্র অঙ্কন করিয়া পতিশোকাতুরা বিগতপ্রজ্ঞা, হতবুদ্ধি বিরহবিধুরাকে প্রলুব্ধ করে নাই? হয়তো বিধবা সারাজীবন অজানা কোণে কাটাইয়াছে; হঠাৎ লোকচক্ষুর সম্মুখে দেবীরূপে বিভাসিত হইবার লোভ তাহাকে প্রধানত দেখাইল কে? সেই রোরুদ্যমান অন্তঃপুরে স্মার্ত পণ্ডিতেরা তখন প্রধান নায়ক, না তাঁহাদের পত্নীরা, মাতারা? কে জানে?
নিরম্বু উপবাসের বিধান দিয়া যখন স্মার্ত পণ্ডিত গঙ্গাস্নানে চলিয়া গেলেন তখন মাতা কি অষ্টমবর্ষীয়া কন্যাকে প্রকাশ্যে অথবা গোপনে জল দিতে সম্পূর্ণ অক্ষম ছিলেন? এস্থলে তো গায়ের জোরের কথা উঠিতেছে না। পুরুষ যে পৈশাচিক আচারের সৃষ্টি করিল, নারী তাহাকে ধর্মজ্ঞানে স্বীকার করিল কেন? গোপনে জল দিলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হইয়া যাইত– মঞ্জুলিকার মাতারা সব ছিলেন কোথায়? অশীতিবর্ষীয় বৃদ্ধকে গৌরীদানের সময় সর্বাবস্থায় কি মা-জননীরা আপত্তি জানাইয়াছিলেন, না সমাজের উচ্চমঞ্চে আরোহণ করিবার প্রমত্ততা তাঁহাদের স্কন্ধেও ভূতের মতো চাপিয়াছিল? না, অন্যান্য নারীর (পাঠিকা লক্ষ করুন, নারীই) গঞ্জনা হইতে রক্ষা পাইবার জন্য কন্যাকে অন্তর্জলি বরের সঙ্গে সপ্তপদী হইবার জন্য অগ্রপদী করিলেন?
