আশ্চর্য! সঙ্গীত, পদ-বিন্যাস, অঙ্গ-সঞ্চালন, ভঙ্গি, ওষ্ঠাধর কম্পন, অসিত নয়নের কৃষ্ণবিদ্যুত্বহ্নি দিয়ে যে রমণী নিবিড়তম অন্তরঙ্গতায় শতাধিক বার আমার চিত্তজয় করেছিল কাল রাত্রে, তাকে তখন মনে হয়েছিল ও যে দূরে, ও যে বহুদূরে আর আজ যখন সে লজ্জায় মুখ ফিরাল তখন মনে হল, সে তো অত দূরে নয়, সে যে অনেকখানি কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
আর সেই মুহূর্তেই আমি পেলুম ভয়। অজানা এক অদ্ভুত ধরনের ভয়, বহু বিশ্লেষণ করেও আমি তখন সে ভয়ের কারণ বের করতে পারিনি। পরে একদিন পেরেছিলুম– সেকথা পরে হবে।
লোতি বলেছেন, ভরতনাট্যম দেখে তাঁর ক্লান্তি বোধ হয়েছিল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার ভয়ও হচ্ছিল পাছে নর্তকী তার নৃত্য বন্ধ করে দেয় তা হলে তো তিনি আর তাকে দেখতে পাবেন না। গাড়িতে শুয়ে শুয়ে আমারও মনে হচ্ছিল, নর্তকী আমাকে যেভাবে অভিভূত করে ফেলেছে সেটা আমার পক্ষে মঙ্গলদায়ক নয়, এবং সঙ্গে সঙ্গে মনে মনে আশাও পোষণ করেছিলুম, সে যেন মাদ্রাজের আগে কোনও স্টেশনে না নেমে যায়। জানতুম এ গাড়ি কলম্বো থেকে আসা প্যাসেঞ্জার নিয়ে যাচ্ছে মাদ্রাজ অল্প দূরের যাত্রীকে এ গাড়িতে উঠতে দেয় না– তবু তো সামনে রয়েছে বড় বড় স্টেশন, তাঞ্জোর আর তার পর বিল্বপুরম্। সেখান থেকে ডাইনে পণ্ডিচেরি, বায়ে তিরুআন্নামলাই হয়ে বাঙ্গালোর, মহীশূর কত কী।
রাত তখন তিনটে হবে। আমি আর কিছুতেই আমার কৌতূহল দমন করে উঠতে পারলুম না, পঙ্কজরা ইতোমধ্যে কোথাও নেমে গিয়েছে কি না জানবার জন্য। আমি তখন ছেলেমানুষ ছিলুম অস্বীকার করিনে তবু মনে হয়েছিল ছেলেমানুষিটার বাড়াবাড়ি হচ্ছে– আমার ভিতরকার ছেলেমানুষ তখন বুড়ো সেজে বিজ্ঞ মনকে বোঝাচ্ছে, বাইরের ঠাণ্ডা বাতাসে দু পা হেঁটে নিলে ঘুম পেলেও পেতে পারে– যেন আমি ইতোপূর্বে ট্রেনে আর কখনও বিন্দ্ৰি যামিনী যাপন করিনি!
না নামলেই ভালো হত। দেখি, কাটাল-বোঝাই নৌকার মতো থার্ড ক্লাসের ভিড়ের এক কোণে পঙ্কজ জড়সড় হয়ে বসে আছে। ভিড়ের মাঝখানে নর্তকীকে আর লোতির পথহারা পরীর মতো দেখাচ্ছিল না, মনে হচ্ছিল স্টিমরোলারের একপাশে যেন কোনওপ্রকারে প্রাণ বাঁচিয়ে ফুটে রয়েছে পথপ্রান্তের বনফুল। দুঃখ হল, কিন্তু আশ্চর্য হলুম না, কারণ ইন্দোর না গোয়ালিয়র কোথায় যেন একবার দেখেছিলুম, ওস্তাদ ফৈয়াজ খান বসে আছেন থার্ড ক্লাসের জগদ্দল ভিড়ের মাঝখানে। গুণীর কদর পৃথিবী করে না– হয়তো ভালোই। অন্তত ভরতনাট্যমের নর্তকীদের পয়সা হলে তাদের নাচ তিন বৎসরের ভিতরেই বন্ধ হয়ে যায়– গাদা গাদা ভাত, রস আর মণ মণ ঘি খেয়ে তারা দেখতে না দেখতে রাগবি বলের ঢপ ধরে ফেলে-নৃত্য তখন সে দেহ-বর্তুল ত্যাগ করে অন্যত্র আশ্রয় খোঁজেন। কিন্তু তখনকার মতো দুঃখ হয়েছিল একথা অস্বীকার করিনে- কারণ তখনও আমার এসব গূঢ়তত্ত্ব জানা ছিল না।
ততক্ষণে আমি মনস্থির করে ফেলেছি। ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পৌঁছলুম মাদ্রাজ। আমার সঙ্গে ছিল বাড়ির পুরনো চাকর তারাপদ। মাল-বোঝাই কুলির পিছনে যেতে যেতে তাকে জিগ্যেস করলুম যে প্ল্যাটফর্মে পঙ্কজকে লক্ষ করেছে কি না– পুদুকোট্রাইয়ের নাচে সে আমার সঙ্গে গিয়েছিল তাই লক্ষ না করাটাই আশ্চর্যের বিষয় হত। তারাপদ বিচক্ষণ লোক। উত্তর শুনে বুঝলুম, সে প্রয়োজনেরও বেশি অনেক কিছু লক্ষ করেছে– এমনকি আমি যে রাত তিনটের সময় একবার গাড়ি থেকে নেমেছিলুম সেটাও তার চোখ এড়িয়ে যায়নি।
বললুম, আমি হোটেলে যাচ্ছি। তুমি দেখে এসো তো এরা সব কোথায় ওঠে।
তারাপদ আমাকে ছেলেবেলা থেকেই চেনে– আমার জীবনের কিছুই তার কাছে অজানা ছিল না। তাই সে একটু আশ্চর্য হয়ে আমার দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বলল, আচ্ছা।
[রচনাটি অসম্পূর্ণ মাসিক বসুমতী, অগ্রহায়ণ ও পৌষ সংখ্যা ১৩৫৬]
.
নারীর অধিকার
ডক্টর শ্রীমতী রমা চৌধুরী এমএ ডি-ফিল (অক্সন) নারীর অধিকার সম্বন্ধে একখানা রচনা প্রকাশ করিয়াছেন। তাহার প্রধান বক্তব্য নর-নারীর অধিকার সমান হওয়া উচিত। আমাদেরও সেই মত। কিন্তু প্রবন্ধে লেখিকা এমন অনেকগুলি যুক্তির অবতারণা করিয়াছেন, যেগুলি সম্বন্ধে আমরা সম্পূর্ণ একমত নহি। আমাদের মূল বক্তব্যে উপস্থিত হইবার পূর্বে দুই-একটি সাধারণ আলোচনার প্রয়োজন।
প্রথমত লেখিকা বলিয়াছেন, সেই (অর্থাৎ বৈদিক) সুবর্ণযুগে নরনারীর মধ্যে কোনওরূপ সামাজিক বৈষম্য হইত না। কিন্তু বৈদিক যুগের পরবর্তী স্মৃতিযুগে নানা দিক হইতেই সমাজের দুরবস্থা উপস্থিত হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে নারীগণের পূর্ব গৌরবোজ্জ্বল অবস্থারও অবসান ঘটে।
লেখিকার সঙ্গে আমরা একমত। কিন্তু প্রশ্ন, এই বৈদিক যুগের সুবর্ণকাল হইতে নারী যে হঠাৎ স্মৃতিযুগের লৌহকালে পতিত হইল তাহার জন্য দায়ী কে? লেখিকার পরবর্তী বাক্য স্মার্ত-সমাজপতিগণ নারীগণের জন্য নানাবিধ বেদ-বিরুদ্ধ আইন-কানুন প্রচলিত করেন এবং ফলে নারী সকল স্বাতন্ত্র, সকল ন্যায্য অধিকার হারাইয়া ক্রীতদাসীরূপে পরিণত হন। কিন্তু স্মার্ত-সমাজপতিগণ কেন করিলেন? লেখিকা সেদিকে কোনও ইঙ্গিত করেন নাই। আমাদেরও আশ্চর্য বোধ হয়; কথা নাই, বার্তা নাই, স্ত্রী-পুরুষ সমান অধিকার ভোগ করিতেছে, হঠাৎ পুরুষ তেরিয়া হইয়া স্ত্রীকে ক্রীতদাসী বানাইয়া কী চরমসুখ পাইল? লেখিকা দর্শনশাস্ত্রে সুপণ্ডিতা; কারণ বিনা কার্য হয় না– এই তত্ত্ব তো তিনি আমাদের চেয়ে অনেক বেশি বোঝেন।
