কিছু ভুলও বলেনি। কারও শুভাগমন উপলক্ষে সিঁড়ির উপর যে লাল কাপড় পাতা হয় সেটা দেখে আমারও ভয় লাগে। মনে হয়, ওয়েটিংরুম রাক্ষসীর লাল জিভ লকলক করে বেরিয়েছে রাস্তা পর্যন্ত অতিথি অভ্যাগত সবাইকে গিলে ফেলবার জন্য।
য়লমঞ্চলি বলল, চল, প্ল্যাটফর্মে শেষের দিকে যদি কিছু দেখবার মতো থাকে। পাইক-বরকন্দাজকে ধমক দিয়ে বলল, তোরা সব বস গিয়ে ওয়েটিংরুমে–আমরা আসছি।
দূর থেকেই দেখতে পেলুম একগাদা বাজনার যন্ত্রপাতি। কাছে আসতেই জন পাঁচেক লোক দাঁড়িয়ে উঠে আমাদের নমস্কার করল। নর্তকী পিছন ফিরে কার সঙ্গে কথা বলছিল। ঘুরে দাঁড়িয়ে আমাদের দেখতে পেয়ে ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল। আমার দিকে চোখ যেতেই আমি তাকে একটি ছোট্ট নমস্কার করলুম। লজ্জায় তার মুখ-কান লাল হয়ে গেল। আরও ভ্যাবাচাকা খেয়ে কী যে করবে বুঝেই উঠতে পারল না– তার পর হঠাৎ যেন লুপ্ত বুদ্ধি ফিরে পেয়ে ঝুঁকে ঝুঁকে নর্তকীদের কায়দায় আমাকে বারবার সেলাম করল।
য়লমঞ্চলি বলল, চল। একটু দূরে এসে বলল, পুদুকোট্টাই ভিন্ন অন্য যে কোনও জায়গা হলে আমি তোমাকে পঙ্কজমের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতুম।
পঙ্কজম পঙ্কজম–ম যোগ করলে যে শব্দের সৌন্দর্য বাড়ে তা এই প্রথম লক্ষ করলুম।
লোতি বলেছেন, জনতার মাঝখানে নর্তকীকে দেখাচ্ছিল পথ-হারা পরীর মতো৷ আমার মনে হয়েছিল, নৃত্যের ভিতর দিয়ে যে রমণী সুধা-পারাবারের সন্ধান পেয়েছে, যার প্রতি পদক্ষেপ প্রতি হস্তবিন্যাস অফুরন্ত রসের ধারা বইয়ে দেয় প্রতিক্ষণে, সে তার ধ্যানলোক থেকে নিজেকে বিমুক্ত করে আর পাঁচজনের সঙ্গে কথা কয় কোন ভাষায়, খায়-দায়, ওঠে-বসে কী প্রকারেঃ খান আব্দুল করীম খান সাহেবের গান শোনার পর কখনও কল্পনা করা যায় যে তিনি ওই গলা দিয়েই দৈনন্দিন কথাবার্তা বলছেন? নৃত্যের বশে যে-পদযুগ প্রজাপতির ডানা হয়ে আকাশে-বাতাসে উড়তে থাকে সেই পা-দু খানি কী করে চলতে পারে শানবাঁধানো প্ল্যাটফর্মের উপর দিয়ে?
পঙ্কজমের নৃত্য আমাকে মুগ্ধ করেছিল নাচের মজলিসে কিন্তু স্টেশনে মুগ্ধ হলুম পঙ্কজকে দেখে। ভরতনাট্যমের বেশ আমার কাছে সবসময়ই দৃষ্টিকটু বলে মনে হয়েছে। উত্তর-ভারতের রাজপুত-মোগলাই নর্তকীরা পরে চুড়িদার টাইট পাজামা আর তার উপর মলমলের ঘাগরা। পাজামা বড় অপ্রিয়দর্শন জিনিস– সেটাকে আস্বচ্ছ ঘাগরা কিছুটা ঢেকে দেয় বলে উত্তর ভারতের নর্তকীর সজ্জায় খানিকটা সৌন্দর্য আছে, কিন্তু ভরতনাট্যমের নর্তকী পাজামার উপরে পরে মারাঠি ধরনের কাছা-মারা শাড়ি দুটো জিনিসই বাঙালির চোখকে বড্ড বেশি পীড়া দেয়। উরু আর পদবিন্যাস দেখাবার জন্য মোগলাই পাজামার প্রয়োজন সেকথা বুঝতে পারি, কিন্তু সেটার উপর মারাঠি শাড়ি চাপিয়ে যে নর্তকীর কোন সৌন্দর্যবর্ধন হয় সেটা আমি আজও বুঝতে উঠতে পারিনি।
স্টেশনে পঙ্কজমের পরনে ছিল মিলের মামুলি শাড়ি আর বাঙ্গালোর সিল্কের কাঁচুলি। কিন্তু নাচের সময় যে-নর্তকীর প্রতি-অঙ্গ বিশ্লেষণ করে দেখা সমঝদারের কর্তব্য, সেই যখন আটপৌরে কাপড় পরে নাচের বাইরে এসে দাঁড়ায় তখন তার দিকে তাকানো শালীনতার লক্ষণ নয়। লোতি নর্তকীর দেহের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, তার গাত্র ধাতু-স্তম্ভের ন্যায় সুচিক্কণ- আর আমি এক পলকে যেটুকু দেখতে পেয়েছিলুম তার স্মরণে আজ বলতে পারি, সে গাত্রে এতটুকু অনাবশ্যক মেদ ছিল না, এমনকি কোমর আর কাঁচুলির মাঝখানের অনাবৃত হলেও না।
আমার বয়স তখন কম, তাই আমি যে লজ্জা করে দুবার তাকাতে পারিনি সেটা বুঝতে কষ্ট হয় না, কিন্তু নর্তকীও যে লজ্জা পেল সেইটে দেখে আমার আশ্চর্য বোধ হল। কত লোক তাদের দিকে তাকায় প্রতিদিন, কই, তারা তো লজ্জায় জড়সড় হয় না? তবে কি আমার সঙ্কোচ-ভরা তাকানোটাই তার মুখে ব্রীড়ার ভাব এনে দিয়েছিল?
সেটা ঢাকবার জন্যই বোধ করি একটুখানি হেসেছিল।
আমি জানি, সাদা চামড়ার প্রতি বাঙালির দুর্বলতা আছে কিন্তু একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, দাঁতের আসল সৌন্দর্য ফুটে ওঠে শ্যামবর্ণের ভিতর দিয়ে বিদ্যুতার শিহরণ তো কালো মেঘের ফাঁকে ফাঁকেই।
আমি বললুম, তুলনাটি বেশ।
বললেন, সাহিত্য-সৃষ্টি যে করে না তার পক্ষে খুব মন্দ নয়। কিন্তু আমি তো কিছুমাত্র বানিয়ে বলছিনে। আর তা করলেও বিশেষ কোনও ফল হবে না। কারণ সাহিত্যরস সৃষ্টি করবার জন্য যে খাটুনির প্রয়োজন তার উপযুক্ত সময় আমার আদপেই নেই। আমি যে কাজ নিয়ে পড়ে আছি তাতে সাহিত্যরস সৃষ্টি করতে গেলেই সমঝদার পাঠক সন্দেহ করবে, তথ্যের অভাব আমি বাক-চাতুরি দিয়ে ঢাকতে চাই। থাক সে কথা।
সমস্ত রাত আমার ঘুম হয়নি। অস্বীকার করব না, পঙ্কজমের নাচ আমাকে মুগ্ধ করেছিল আগের রাত্রিতে, আর আজ সন্ধ্যায় আমাকে মুগ্ধ করল তার মামুলি আটপৌরে ভাব সাধারণ মেয়ের সাধারণ ব্রীড়া, সাধারণ লজ্জা। নাচের পূর্বে নর্তকীকে বলে দেওয়া হয়েছিল যে বিশেষ করে আমার জন্যই তাকে আনানো হয়েছে, এবং সে-ও তার সমস্ত কলা-নৈপুণ্য প্রয়োগ করেছিল আমার দেশ-কাল-পাত্র-বোধ বিস্মৃতিতে বিলোপ করে দেবার জন্য, তবু আমি কিছুতেই ভুলতে পারিনি,
হৃদয় ব্যথিল মোর অতি মৃদু গুঞ্জরিত সুরে
ও যে দূরে, ও যে বহুদূরে,
যত দূরে শিরীষের উর্বশাখা, যেথা হতে ধীরে
ক্ষীণ গন্ধ নেমে এসে প্রাণের গভীরে—
