আমাকে বাধ্য হয়ে বাধা দিতে হল। শুধালাম, কোথায়?
ওহ্! আমি বলতে ভুলে গিয়েছিলুম, পুদুকোট্রাই থেকে আমার কাহিনী আরম্ভ হওয়ার কারণ আমি ওখানে প্রথম ভরতনাট্যম দেখি। পুদুকোট্টাই মহারাজার সেক্রেটারির ছেলে য়লমঞ্চলি ভেঙ্কটরাও রামেশ্বরাইয়া চৌধুরী আমার সতীর্থ পুদুকোট্রাইয়ে আমার শুভাগমন উপলক্ষে ভরতনাট্যমের ব্যবস্থা করেন। গাইয়ে বাজিয়ে নর্তকী আনানো হয় বিশেষ তোয়াজ করে মদুরা থেকে। লোতির জন্য যেমন করে পণ্ডিচেরির লোক বিশেষ নাচের ব্যবস্থা করেছিল আমার জন্য তেমনি য়লমঞ্চলি মদুরার তরুণী নর্তকীদের সবচেয়ে নামকরাকে মুজরার জন্য ডেকেছিল। পুদুকোট্রাইয়ে দ্রষ্টব্য জিনিস কিছুই নেই– একমাত্র অজন্তা শৈলীতে আঁকা কিছু গুহাচিত্র ছাড়া, অবশ্য সে অপূর্ব জিনিস, অজন্তাকেও ছাড়িয়ে যায়– তাই মলমঞ্চলি আমাকে এমন কিছু দেখাতে চাইল যা আমি পূর্বে কখনও দেখিনি। স্কটিশে পড়ার সময় বিদেশি অলমঞ্চলিকে আমি যে সামান্য হৃদ্যতা দেখিয়েছিলুম সে যেন তারই শোধ দেবার জন্য উঠে-পড়ে লেগে গিয়েছিল।
কী বলছিলুম? হ্যাঁ আমি প্রথম দর্শনেই ভরত-নৃত্যমে রস পেয়ে গেলুম। মলমঞ্চলি আমাকে অভিনয় আর মুদ্রাগুলো পাশে বসে বুঝিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু আমার প্রাণ নেচে উঠল নর্তকীর রসসৃষ্টির শুদ্ধ নৃত্যের দিকটা অনুভব করতে পেরে। লোতির বর্ণনায় শুনলেন, নর্তকী প্রেমের কত চিত্র-বিচিত্র অভিনয় করল– লোতি নৃত্যের দিকটা লক্ষ করেননি বলে তার আসল রস, তার মূল রস ধরতে পারেননি। সেটা এক কথায় বলতে গেলে বলা যেতে পারে– প্রেম। প্রত্যেক রাগ-রাগিণীর যেমন একটা মূল বক্তব্য থাকে, প্রত্যেক ছবির যেমন একটা মূল বিষয়বস্তু বা লাইট-মতিফ (Leit motif) থাকে, ঠিক তেমনি সে রাত্রের ভরত-নৃত্যে আমি যে মূল রসটি ধরতে পারলুম সেটি অলঙ্কারবিবর্জিত শুদ্ধ প্রেমের অনুভূতি।
লোতি বলেছেন, নর্তকীর আহ্বান শুনে দেশ-কাল-পাত্র ভুলে গিয়ে ক্ষণেকের তরে তিনি নর্তকীর অনুসরণ করেছিলেন; আমিও ঠিক তেমনি একবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলুম। লমঞ্চলি আমার কোটের আস্তিনে সামান্য টান দিতেই আবার স্বপ্নভঙ্গ হয়। শুনলুম বলছে, সুন্দর–।
আমি শুধালাম, সুন্দর তো বাংলা নাম নয়।
বললেন, আমার নাম রামেন্দ্রসুন্দর চৌধুরী। য়লমঞ্চলি মাঝখানের সুন্দরটা নিয়ে মাদ্রাজি রসমের ম লাগিয়ে সেটাকে দ্রাবিড়স্থ অর্থাৎ ভদ্রস্থ করে নিয়েছিল।
য়লমঞ্চলি বলেছিল, সুন্দর, নৃত্যটা তা হলে তোমার মতো অরসিককেও চঞ্চল করে তুলেছে; আমার মেহন্নত সফল হল। আমি বলেছিলুম, এ মেয়েটির নাচ আমাকে আরও দেখতে হবে। য়লমলি বলেছিল, সিনেমাতে প্রত্যেক ট্রেলার দেখার সময় যেরকম মনে হয়, ও ছবিটা আমাকে দেখতেই হবে আর তার পর ট্রামে উঠবার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষ ট্রেলারের কথা বেবাক ভুলে যায়, ভরত-নৃত্যমের বেলাও তাই। কাল-পরশুর ভিতরেই তুমি সবকিছু ভুলে যাবে।
আমি কিছু বলিনি, কারণ যেখানে প্রতিপাদ্য বিষয় যুক্তির জন্য সুদ্ধমাত্ৰ তুলনার ওপর নির্ভর করে সেখানে তর্ক করে কোনও লাভ নেই। ট্রেলার তো চেষ্টা করে চোখের ওপর কৌতূহলের চটক লাগাবার– তাই মানুষ দু মিনিট পরেই সে ভেল্কিবাজির কথা ভুলে যায়। ভরতনাট্যম তো আমাকে দিল এক অভিনব রসের সন্ধান, যে রস আপন গৌরবে স্বে মহিমি, ক্ষুদ্র কৌতূহল জাগাবার যার কোনও প্রয়োজন নেই।
নাচ শেষ হয়েছিল রাত প্রায় একটার সময়। বাড়ি ফিরে আমার চোখে কিছুতেই ঘুম আসছিল না। পুদুকোট্টাই শহরে কোনওপ্রকারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নেই কিন্তু রাজবাড়ি এবং সেক্রেটারির বাংলোর মাঝখানের পাঁচিল-ঘেরা লটি সত্যই মনোরম। বাংলোর একপাশে জলের চৌবাচ্চা। বারান্দার ডেক-চেয়ারে শুয়ে শুয়ে চাঁদের আলোয় দেখলুম রাজার পোষা হরিণ জোড়ায় জোড়ায় এসে জল খেয়ে গেল– নিঃশব্দ পদ-সঞ্চারণে। চাঁদ হেলে পড়তে লাগল, সারিবধা গাছের ছায়া দীর্ঘতর হল, রাজার হরিণ আলো-ছায়ার আলিঙ্গনের মাঝখানে একে অন্যের গা ঘেঁষে পূর্বাকাশে আলোর আভাস লাগার পূর্বেই মিলিয়ে গেল।
আমার মন এক অজানা অস্বস্তিতে ভরে উঠল।
রামেন্দ্রসুন্দর থামলেন। সূর্য অস্ত গিয়েছে। আকাশের লাল আভা মিলিয়ে যাওয়ার দরুন সমুদ্রের বেগুনি জল আবার গাঢ় নীল হয়ে শেষটায় একেবারে কালো হয়ে গিয়েছে। এখন আর দেখাই যায় না। আজ চাঁদ উঠবে অনেক দেরিতে।
রামেন্দ্রসুন্দর বললেন, পরদিন সন্ধেয় আমার মাদ্রাজ ফেরার ট্রেন। য়লমলি স্টেশনে এল এগিয়ে দিতে। রাজাকে প্রজা যত না ডরায়, তার চেয়েও বেশি ডরায় তার সেক্রেটারিকে এবং সবচেয়ে বোধহয় বেশি ডরায় তার বড় ব্যাটাকে। য়লমঞ্চলি দুঃখ করে বলল, ওই দ্যাখো, আমি আসব বলে ওয়েটিংরুম প্ল্যাটফর্ম ঝেটিয়ে সাফ করে দেওয়া হয়েছে। ভিড়ের মধ্যিখানে তুমি বসবে ট্রাঙ্কটার উপর, আমি হোন্ডলটা চেপে, আইসক্রিমটা-পানটা খাব, আড়নয়নে এদিকে-ওদিক তাকাব, তা না। চলতে গেলে সামনে পাইক, পিছনে বরকন্দাজ। কারও দিকে যদি সিকি-নয়নেও তাকাই সঙ্গে সঙ্গে খবর রটে যাবে, য়লমঞ্চলি কোডাই-কানাল গেছেন হনিমুন করতে। তোমাকে যে ইস্টিশনটা ভালো করে দেখাব তারও উপায় নেই। এরকম অনবরত বকর-বকর করে মলমঞ্চলি আসন্ন বন্ধু-বিচ্ছেদটা কাটাবার চেষ্টা করছিল।
