এই নর্তকী নৃত্যশালার এক প্রান্তে কিছুক্ষণ অন্ধকারের মধ্যে ছিল– সহসা আবার আসিয়া উপস্থিত। কুপিতা নায়িকার ন্যায় রোষ-কষায়িত-নেত্র হইতে আমার উপর তীক্ষ্ণ বাণ-বর্ষণ করিতেছে; আমি যেন উহার নিকট কী একটা অপরাধ করিয়াছি– তাহারই জন্য যেন সে স্বর্গ-মর্ত্যকে সাক্ষী রাখিয়া আমাকে ভর্ৎসনা করিতেছে…।
তার পর, নর্তকী হঠাৎ উচ্চৈঃস্বরে হাসিয়া উঠিল, সে হাসি পরিহাসের হাসি, ঘৃণার হাসি, জনতার নিকট আমাকে হাস্যাস্পদ করিবার জন্য আমার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া হাসিতে লাগিল। জানা কথা, উহার ভর্ৎসনা যেমন কৃত্রিম, এইরূপ উপহাসও সেইরূপ কৃত্রিম। কৃত্রিম হউক, কিন্তু আসলের ঠিক নকল– চমৎকার নকল।
নর্তকী, কণ্ঠ একটু উত্তোলন করিয়া, একটু গম্ভীর স্বরে, তীব্র হাসি হাসিতেছে, তাহার হাসি মুখ দিয়া, ভুরু দিয়া, উদর দিয়া, কম্পমান বক্ষ দিয়া যেন ফাটিয়া বাহির হইতেছে। হাসির আবেশে উহার সর্বাঙ্গ কাঁপিতেছে এবং এইরূপ হাসিতে হাসিতে সে দূরে সরিয়া যাইতেছে। সে হাসি দুর্দমনীয়, সে হাসি শুনিলে অন্যকেও হাসিতে হয়।
আর যেন আমার মুখদর্শন করিবে না, এইভাবে অত্যন্ত অবজ্ঞা সহকারে, মুখ ফিরাইয়া, নর্তকী দ্রুত পদক্ষেপে পিছাইতে পিছাইতে চলিয়া গেল। আবার ফিরিয়া আসিল। আমার উপর তাহার প্রবল ভালোবাসা পড়িয়াছে, সে সর্বজয়ী মদনের নিকট পরাভূত হইয়া, আমার দিকে বাহু প্রসারিত করিয়া কর-জোড়ে মার্জনা ভিক্ষা করিতেছে, আমাকে তাহার সর্বস্ব দান করিবে বলিয়া অনুনয় করিতেছে, ইহাই তাহার শেষ প্রার্থনা। এবার যখন চলিয়া গেল, তখন তাহার দেহ একটু হেলিয়া পড়িয়াছে, ওষ্ঠদ্বয় একটু ফাঁক হইয়া তাহার মধ্য হইতে শুভ্র দরাজি প্রকাশ পাইতেছে; তাহার নাসিকায় হীরকের টুকরোগুলি ঝিকমিক করিতেছে। সে চায়– সে নিতান্তই চায়, আমি তাহার অনুসরণ করি, সে তাহার বাহুর দ্বারা, তাহার কম্পিত বক্ষের দ্বারা, তাহার অর্ধনিমীলিত নেত্রের দ্বারা আমাকে ডাকিতে লাগিল, সে চুম্বকমণির মতো, সর্বান্তঃকরণে আমাকে আকর্ষণ করিতে লাগিল, আমিও মন্ত্রমুগ্ধ অবস্থায়, ক্ষণেকের জন্য তাহাকে অনুসরণ করিলাম, কেন না, সে আমাকে সত্যই মন্ত্রমুগ্ধ করিয়াছিল।
আবার সেই ভর্ৎসনা, সেই দুর্দমনীয় হাসি, নেত্রভঙ্গিতে সেই ক্ৰিপের ভাব, আবার সেই নিরঙ্কুশ প্রেমের আহ্বান…।”
ভদ্রলোক থামলেন। আমি বললুম, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ভাষা সবসময়ই আমার কাছে কেমন জানি একটুখানি আড়ষ্ট বলে মনে হত। কিন্তু আপনার পড়ার ধরনটি এমনি সুন্দর যে সেটা আর কানে বাজে না।
বলেই বুঝতে পারলুম, রসভঙ্গ করা হল।
কিন্তু ভদ্রলোক বিচলিত হলেন না। বললেন, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তো আর রবীন্দ্রনাথের গড়ে-তোলা ভাষার সুযোগ পাননি। এমনকি আমার মনে হয়, তিনি যেন বঙ্কিমকেও এড়িয়ে যেতেন– বরঞ্চ তিনি যদি দ্বিজেন্দ্রনাথের লঘু-শৈলীর দিকে একটু নজর দিতেন তা হলেও হয়তো তার ভাষা খানিকটা গতি-বেগ পেত।
তার পর জিগ্যেস করলেন, আপনি ভরতনাট্যম দেখেছেন?
আমি বললুম, দেখেছি, কিন্তু লোতির চোখ দিয়ে দেখিনি। এখন যদি আবার দেখতে পাই তবে তার থেকে অনেক বেশি রস বের করতে পারব। আমার লজ্জাবোধ হয় যে বিদেশি লোতি প্রথম দর্শনেই ভরতনাট্যমের এতটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে পেল আর আমি এদেশের লোক হয়েও বিদেশির সাহায্য নিয়ে আপন নৃত্য চিনতে যাচ্ছি।
রসের ব্যাপারে দিশি-বিদেশি বলে কোনও পার্থক্য তো নেই। আর অন্যের সাহায্য নিতেই বা আপত্তি কী?
ঐ যে ঝড়ের মেঘের কোলে।
বৃষ্টি আসে মুক্ত-কেশে আঁচলখানি দোলে
শোনার পরই তো আমি প্রথম লক্ষ করলুম, দূর-দূরান্ত থেকে যখন আষাঢ়ের প্রথম বর্ষা ধেয়ে আসে গ্রামের দিকে তখন তার সৌন্দর্য আমার কোনও চেনা জিনিসকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তার মাধুর্য দিয়ে আমার হৃদয় ভরে দেয়। বেশির ভাগ লোকই তো প্রকৃতিকে চিনতে শেখে কবির সৃষ্টির ভিতর দিয়ে। আপনি যদি ভরতনাট্যম্ লোতির সাহচর্যে শেখেন, তবে তাতে আর আপত্তি কী? কিন্তু আপনাকে একটুখানি সাবধান করে দিই এইবেলা– লোতির বর্ণনাতে কোনও জিনিসের অভাব লক্ষ করেছেন কি?
আমি খানিকটা ভেবে নিয়ে বললুম, না তো।
কেন? লক্ষ করেননি, লোতি দেখেছেন প্রধানত অভিনয়ের দিকটা। নাচের দিকটা তার চোখ এড়িয়ে গিয়েছে। যে অঙ্গ-সঞ্চালন যে পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করে সমস্ত নৃত্যটি তার রূপ পেল, যে রূপ আমার হৃদয়ের ভিতর তার ছাপ মেরে রসসৃষ্টি করল সেই তো আসল নৃত্য– অভিনয় তো তার সামান্য একটি অংশ মাত্র। মনে করুন, আপনি মেঘ শুনছেন– তাতে বর্ষার খানিকটা বর্ণনা থাকে কিন্তু সেইটেই তো সবচেয়ে লক্ষণীয় জিনিস নয়। তা হলে তো আসল রাগটি আপনাকে এড়িয়ে গেল–সত্যকার রসটি আপনি পেলেন না। রসের মা-ও বাচ্চাকে ভুলিয়ে রাখতে চান বর্ণনার ঝুমঝুমি দিয়ে যে বাচ্চা তখনও সন্তুষ্ট না হয়ে আরও বেশি কান্নাকাটি জুড়ে দেয় মা তাকে শেষ পর্যন্ত রসের স্তন্য না দিয়ে থাকতে পারেন না।
আমার অদৃষ্ট ভালো বলতে হবে যে নাচ দেখার অভ্যাস না থাকা সত্ত্বেও প্রথম দর্শনেই খুঁটি রসটাকে ধরতে পেরেছিলুম। আমি দম্ভ করছিনে, আর এতে আশ্চর্য হবারও কিছু নেই। দেখেননি, গাঁয়ের কত রাখাল ছেলের ভিতরেও এমন রসবোধ থাকে যে প্রথম শ্রবণেই তারা অজানা-অচেনা রাগ-রাগিণী চিনে ফেলে। শুধু তাই নয়, আপন বাঁশি দিয়ে বিনা কসরৎ বিনা মেহৎ সেগুলো শুনিয়ে দেয়। তাই যখন প্রথম ভরতনাট্যম্ দেখলুম–
