আমিই বলে যাই, আপনার সব প্রশ্নের উত্তর আপন অজানাতেই আপনি জেনে যাবেন।
পুদুকোট্টাই থেকেই আরম্ভ হোক। তার আগের পঁচিশ বৎসরের মধ্যে বলবার মতো বিশেষ কিছু নেই। জন্মেছি কৃষ্ণনগর, পড়াশোনা করেছি কলকাতায়, আর বিস্তর ছুটি কাটিয়েছি হয় শিলঙে না হয় ব্রহ্মপুত্র-পদ্মায় ডিসপাঁচ জাহাজে। বাবা কাঠের ব্যবসা করতেন এবং আমা দ্বারা ব্যবসা হবে না জানতেন বলেই মরার পূর্বেই আমার জন্য ভালো শেয়ার কিনে রেখে যান।
তাই শ্রাদ্ধাদি চুকিয়ে পঁচিশ বৎসর বয়সে ভ্রমণে বেরোবার পথে কোনও বাধাই ছিল না। প্রথমে দেখলুম উত্তর ভারত তন্ন তন্ন করে আমার ইতিহাসে শখ। বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখা ইতিহাসের কঙ্কাল তক্ষশিলা, কাশী, দিল্লি, আগ্রা গিয়ে রক্তমাংস পেয়ে যেন প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। তখন ইচ্ছে হল দক্ষিণ দেখবার। ওয়ালটোয়ার, রাজমহেন্দ্ৰী, বেজওয়াড়া সেরে এলুম মাদ্রাজ তার পর কাঞ্চিবর, চিদম্বরম, মাদুরা, তাঞ্জোর করে শেষটায় পৌঁছলুম গিয়ে পুদুকোটাই।
আমি জিগ্যেস করলুম, পুদুকোট্টাই দেশি রাজ্য কিন্তু ঠিক কোন জায়গায় আমার মনে পড়ছে না।
বললেন, না পড়ারই কথা। তবু জায়গাটার নাম মাঝে মাঝে কাগজে বেরোয়। আমাদের যেমন কুচবিহার, খাস দক্ষিণ অঞ্চলের তেমনি পুদুকোট্রাই। কিন্তু বাঙলা দেশের মাহাত্ম্য জানতে হলে যেমন কুচবিহার যাবার দরকার নেই, এদেশে এসে তেমনি পুদুকোট্টাই না গেলেও চলে।
আমার ওখানে যাওয়ার একমাত্র কারণ আমার এক তেলুগু সতীর্থের পিতা সেখানে মহারাজার প্রাইভেট-সেক্রেটারি ছিলেন। মলমঞ্চলি মাদ্রাজে এসে আমাকে একরকম জোর করে পুদুকোট্টাই ধরে নিয়ে গেল।
ভদ্রলোক থামলেন।
সেদিন ষোড়শী। চাঁদ উঠবে অন্ধকার হয়ে যাওয়ার পর। বাড়িতে বলে গিয়েছিলুম চাঁদের আলোতে বাড়ি ফিরব। পুবের আকাশে তখন অল্প অল্প চিলি লেগেছে আমার চতুর্দিকে ঘন অন্ধকার আর তার সঙ্গে মেশানো রয়েছে সমুদ্রের গম্ভীর গর্জনধ্বনি। তার ভিতর দিয়েও আমি স্পষ্ট অনুভব করলুম ভদ্রলোক তাঁর গল্পের, তাঁর জীবনের এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছেন যেখান থেকে এগোবার সময় ভেবে-চিন্তে কথা বলতে হয়।
চাঁদ উঠল। আমি ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি চোখ বন্ধ করে আছেন। হঠাৎ বললেন, আপনি পিয়ের লোতির “ইংরেজ-বর্জিত ভারতবর্ষ” পড়েছেন? আমি জ্যোতিরিন্দ্রনাথের বাংলা অনুবাদের কথা জিগ্যেস করছি।
আমি বললুম, কী আশ্চর্য! আজ সকালের ডাকেই জ্যোতিরিন্দ্রনাথের গ্রন্থাবলি পেয়েছি। আর আজ সকালেই আমি লোতির পণ্ডিচেরি-বৰ্ণন পড়ছিলুম।
অতি শান্ত স্বরে বললেন, সবই যোগাযোগ। মানুষ তার ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করবে কী করে যতক্ষণ না যোগাযোগের ওপর তার কর্তৃত্ব লাভ হয়? কিন্তু আজ আর না। বাড়ি ফিরে আমাকে একগাদা প্রফ দেখতে হবে। কাল সকালেই ফেরত পাঠাবার কথা। আপনি কাল আসবার সময় লোতির বইখানা সঙ্গে নিয়ে আসবেন।
.
২
আমি জিগ্যেস করলুম, লোতির বইয়ের কোন অংশের কথা আপনি ভাবছিলেন?
বললেন, পণ্ডিচেরি বাসের সময় তিনি যে ভরতনাট্যম্ দেখেছিলেন, তার বর্ণনাটা পড়ুন।
আমি বললুম, আপনিই পড়ুন। আপনার উচ্চারণ আমার চেয়ে অনেক পরিষ্কার আর ঢেউয়ের আওয়াজ ছাপিয়ে আমার গলা চড়াতে গেলে কষ্ট হয়, অল্পেতেই হাঁপিয়ে পড়ি।
হেসে বললেন, গলা নামিয়ে নিলেই হয়।
তখন লক্ষ করলুম, এ ভদ্রলোক যে কটি বার কথা বলেছেন, সবসময়ই গলার পর্দা নামিয়ে দিয়ে। কনকপ্রসাদ তা হলে জানেন না যে, সমুদ্রের গর্জনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কথা কইতে হলে যেমন চড়িয়ে বলা যায়, তেমনি নামিয়ে বলতেও বাধা নেই, অত্যন্ত দ্রুত বাজিয়ে যেরকম তবলচিকে কাবু করা যায় তেমনি অত্যন্ত বিলম্বিত লয় নিলেও তাকে হার মানানো যায় আরও সহজে।
দীর্ঘায়ত-নেত্র-বিশিষ্ট, রং-করা একটি তরুণ মুখ–ইন্দ্রিয়াসক্তি-পরিব্যঞ্জক মুখ, তিমির রাজ্যের সুখ খুব লঘু ভাবে, তাড়াতাড়ি একবার এগিয়ে আসিতেছে আবার পিছিয়া যাইতেছে। চোখের দুইটি তারা মিনা-র সাদা জমির উপর বসানো কৃষ্ণমণির মতো কালো দুইটি তারা আমার চোখের উপর নিবদ্ধ। এই যে হৃদয়-দুর্গ অধিকার করিবার জন্য একবার আমাকে আক্রমণ করিতেছে, আবার পলায়ন করিয়া ছায়ান্ধকারের মধ্যে মিশিয়া যাইতেছে– এই সমস্ত ক্ষণ উহার চোখের দুইটি কালো তারা আমার চোখের উপর সমানভাবে নিবদ্ধ রহিয়াছে।…
জনতার মধ্যে এই রমণীকে ছাড়া আমি আর কিছুই দেখিতেছি না– উহার ওই সিথিবিভূষিত মস্তক ছাড়া আর কিছুই দেখিতেছি না। রমণী, হীরক-মাণিক্য-খচিত বলয়-কেয়ূরাদি ভূষণে আস্কন্ধ-বিভূষিত বাহুযুগকে ভূজঙ্গ গতির অনুকরণে কতরকম করিয়া বাকাইতেছে–কিন্তু না, সর্বাগ্রে উহার চোখের দৃষ্টি আমার চোখের অন্তস্তল পর্যন্ত এমনভাবে ভেদ করিতেছে যে, আমার সর্বাঙ্গ শিহরিয়া উঠিতেছে; ওই চোখে নানাপ্রকারের ভাব খেলিতেছে– কখনও পরিহাসের ভাব, কখনও স্নিগ্ধ কোমল প্রেমের ভাব… উহার মণিরত্নখচিত শিরোভূষণের ও কর্ণ-নাসিকার অলঙ্কারের এরূপ উজ্জ্বলতা এবং ওই উজ্জ্বল সোনার সিঁথিটি এমন পরিপাটি রূপে উহার মুখটি বেড়িয়া আছে যে, তাহাতে ওই সুন্দর শ্যামল মুখখানিতে কী জানি একটা অস্পষ্ট দূরত্বের ভাব আসিয়া পড়িয়াছে– আমাকে স্পর্শ করিলেও যেন সে দূরত্ব ঘুচিবার নহে।
