তাড়াতাড়ি খাইয়ে-দাইয়ে আলো নিবিয়ে দিয়ে আমাকে শুইয়ে দেওয়া হল।
দক্ষিণমুখো হয়ে কালো আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। বাঁ দিক থেকে আসছে সমুদ্রের কান্নার শব্দ শোক যেন উথলে উথলে উঠছে। ডান দিকে নারকোলের ডগায় বাতাসের ঝিরিঝিরি যেন মাথার চুল আঁচড়ে দিচ্ছে। পায়ের তলায় ঝিল্লির রিনিরিনি। সামনের আকাশে মোমবাতির ফোঁটা-ফোঁটা চোখের জল জমে গিয়ে তারা হয়ে কালো চাদরের গায়ে লেগে আছে।
তামিল না বাঙালি, বাঙালি না তামিল?
এবং তার চেয়েও বড় সমস্যা, কাল দেখা হলে পরে তাঁর সঙ্গে যেচে গিয়ে কথা কইব, উপেক্ষা না করে যাব? কোনটা বেশি শোভন হবে?
সকালবেলা ঘুম ভাঙতেই বুঝলুম, অল্প জ্বর। খবরটা কিন্তু চেপে গেলুম। আমাকে আজ বিকেলে যে করেই হোক সমুদ্রপারে যেতে হবে। যদি না যাই তবে পুলিনাসীন হয়তো ভাববেন আমি ইচ্ছে করেই তাঁকে কাট করেছি আর তারই ফলে তিনি চিরতরে কেটে পড়বেন।
অন্যদিনের তুলনায় একটু তাড়াতাড়িই বেরুলুম।
সমস্যার ঝটিতি সমাধান হয়ে গেলে নিজের কাছে তখন নিজেকে কেমন যেন বোকা বনতে হয়। মানুষ তখন ভেবেই পাই না, এই সামান্য, সরল জিনিস নিয়ে সে আপন মনে এত তোলপাড় করেছিল কেন? আমার হল তাই। পরদিন সমুদ্র পারে পৌঁছনো মাত্রই ভদ্রলোক আমার দিকে এগিয়ে এলেন প্রসন্ন বদন দিয়ে অভ্যর্থনা জানিয়ে। কিছু না বলে আমার পাইচারিতে যোগ দিলেন এত সহজে যেন তিনি নিত্যি নিত্যি এমনি ধারা আমার সঙ্গে জোড়া-সান্ত্রির টহল দেন। চলার ধরনটিও সুন্দর। হাত দু খানি পিছনে নিয়ে মাথাটি নিচু করে পায়ের দুটি পাতা একদম সোজা ফেলে ফেলে।
সিন্ধুপার আর ড্রইং-রুম এক জিনিস নয়। ড্রইংরুমে দু জন লোক যদি চুপ করে বসে থাকে তবে সেটা নিশ্চয়ই বেখাপ্পা বলে মনে হয়। সমুদ্রপারে হয় না।
বয়সে আমার চেয়ে যখন উনি বড় তখন পরিচয় ঘনানো না ঘনানো তো তারই হাতে।
আমার জিরোবার সময় এসে বললেন, চলুন, নৌকোটার পাশে গিয়ে বসি। আমি তার বাঁ দিকে বসতে যাচ্ছিলুম বললেন, না, ডান দিকে বসুন। নৌকোটা তা হলে আপনার দৃষ্টি ঢেকে দেবে না।
অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর বললেন, আপনি সাহিত্য-চর্চা করেন?
আমি বললুম, না, তবে খবরের কাগজে মাঝে মাঝে কলাম লিখি।
কবিতা লেখেন না? এখানে তো তার বিস্তর মাল-মশলা।
আমি বললুম, সমুদ্র আকাশ আর বালু-পাড় এ তিনটে জিনিসই আমার কাছে এতই সহজ আর সরল বলে মনে হয় যে মনে মনে তার প্রকাশের ভাষা খুঁজতে গিয়ে বারে বারে হার মেনেছি!
বললেন, কথাটা ঠিক। রবীন্দ্রনাথও বলেছেন,
অপরিচিতের এই চির পরিচয়,
এতই সহজে নিত্য ভরিয়াছে গভীর হৃদয়
সেকথা বলিতে পারি এমন সরল বাণী
আমি নাহি জানি।
আমি শুধালুম, আপনি সাহিত্য-চর্চা করেন?
বললেন, দেশে থাকতে করতুম। কোন বাঙালি ছেলে করে না? আর আমাদের আমলে বাঙালির ছিল ওই একমাত্র ব্যসন, আর কিঞ্চিৎ ধর্মচর্চা। রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ কিংবা শিবনাথ শাস্ত্রী, রবীন্দ্রনাথ!
সেদিন আর বেশি কথাবার্তা হল না। বাড়ি ফেরার জন্য যখন উঠলুম তখন বললেন, কিছু মনে করবেন না, আমি বয়সে বড় তাই আপনাকে আমি আমার আপন পর্যবেক্ষণ থেকে একটি কথা বলি। আকাশ সমুদ্র বালু-পাড় এগুলো আপনার কাছে এখন এতই সহজ ঠেকছে যে আপনি সেগুলোকে প্রকাশ করবার ভাষা পাচ্ছেন না। আরও কিছুদিন যাক, তখন আকাশের থমথমানি আর সমুদ্রগর্জনের ভাষা একদিন আপনার কাছে অনেক নতুন কথা বলতে আরম্ভ করবে।
আমার লোভ হচ্ছিল জিগ্যেস করতে তিনি সাহিত্য-চর্চা করেন কি না, কিন্তু চেপে গেলুম।
পরদিন বেড়াতে গেলুম অনেকগুলো প্রশ্ন এমনি কায়দা করে বানিয়ে নিয়ে যে তিনি কিছুটার উত্তর দিতে বাধ্য হবেনই হবেন। কিন্তু আমারই হিসাবে ভুল। ভদ্রলোক আমার পাইচারিতে যোগ না দিয়ে আপন আসনে চুপ করে বসে রইলেন নিত্যিকার মতো। আমার মনটা খুঁতখুঁত করতে লাগল।
কিন্তু ঠিক বাড়ি ফেরার সময় তিনি উঠে এসে আমাকে বললেন, দেখুন, আপনাকে একটা কথা বলি। আপনি হয়তো নিঃসঙ্গ ভ্রমণ পছন্দ করেন তাই ইচ্ছে করেই আজ আমি দূরে ছিলুম। আমার কিন্তু দুই-ই সমান। আপনার ইচ্ছে হলেই আমার সঙ্গে এসে কথাবার্তা বলবেন আর আমি যখন চলা-ফেরাটা পছন্দ করিনে তখন আপনার ইচ্ছে হলেই একা একা পাইচারি করতে পারবেন।
ব্যবস্থাটা আমারও মনঃপূত হল।
তার পর দশ দিন ধরে রোজ বিকেলে বৃষ্টি। পাইকারি তখন মৌতাত হয়ে দাঁড়িয়েছে– বাধা পড়ায় হন্যে হয়ে উঠলুম। অনভ্যাসের ফোঁটা অভ্যেস হয়ে যাওয়ার পর ফোঁটা না কাটলে চড়চড় করে আরও বেশি।
এগারো দিনের দিন উঠল কড়া রদুর। বাড়ির বারান্দা থেকেই দেখতে পেলুম, দুপুর হতে না হতেই সমুদ্রপারের বালু শুকিয়ে গিয়েছে। মনটা আশ্বস্ত হল– ভেজা বালুতে বসা যায় না বলে পাকা একঘণ্টা একনাগাড়ে পাইচারি করা সহজ কর্ম নয়।
দশ দিন ধরে মনে মনে প্রশ্নগুলো আরও গুছিয়ে নিয়েছি।
বিকেলবেলা তারই একটা অতি সন্তর্পণে জিগ্যেস করতেই ভদ্রলোক হেসে উঠলেন। বললেন, আমি বুঝতে পেরেছি আমি কে, কী বৃত্তান্ত জানবার জন্য আপনি ব্যগ্র হয়ে উঠেছেন। পৃথিবীতে একরকম মানুষ আছে যারা সামান্যতম প্রহেলিকার সামনেও যাক” গে ছাই, আমার কী?” বলে ঘাড় ফিরিয়ে নিয়ে আপন পথে চলে যেতে পারে না। আপনি সেই ধরনের। কিন্তু আপনি ব্যস্ত হবেন না, আমিও স্থির করেছি আপনার সব প্রশ্নেরই উত্তর দেব এবং এমন আরও কিছু বলব যা আপনার প্রশ্নেরও বাইরে।
