পরনে লুঙ্গির মতো করে ধুতি, মাদ্রাজি ধরনের কুর্তা, পায়ে চপ্পল কাঁধে তোয়ালে যাকে বলে নসিকে মাদ্রাজি ব্রাহ্মণ; নস্যি নিতে দেখিনি, বাদ পড়েছে মাত্র এইটুকু।
এ সবেতে আমার হিংসে হয় না, আমার হিংসে হত তার বসার ধরনটুকু দেখে। মুখে। দুশ্চিন্তার লেশ নেই, বসেই আছেন বসেই আছেন, সূর্য ডুবল, চাঁদ উঠল, তার কাছে যেন সবই সমান। বাড়ি ফেরার তাড়া নেই, আকাশে মেঘ জমলেও বৃষ্টির ভয়ে তাঁকে আপন আসন ত্যাগ করে ব্যস্ত হতে কখনও দেখিনি।
পাকা তিনটি মাস ধরে আমি পুলিনবিহারী, আর তিনি পুলিনাসীন হয়ে রইলেন। আমি তাঁকে লক্ষ করলুম নিত্যি নিত্যি– এরকম সৌমকান্তি লোককে অবহেলা করা কঠিন। তিনি আমাকে লক্ষ করলেন কি না, বলতে পারব না। কারণ আর যে দু চারজন মাঝে মাঝে এদিকে বেড়াতে আসেন, তাঁদের কাউকেও ওঁর সঙ্গে কথা বলতে দেখিনি। তাই অনুমান করলুম, কাউকে লক্ষ করা এঁর অভ্যাস নয়, না হলে নিশ্চয়ই কারও না কারও সঙ্গে এঁর আলাপপরিচয়, অন্তত নমস্কারটা হয়ে যেত।
আমার আলাপ করতে ইচ্ছে হয়েছিল কি না ঠিক বলতে পারব না। কারণ আমি জানি, এরকম শান্ত ধীর সংযত সংহত লোকের সামনে চপল মানুষ লজ্জা পায় আপন চপলতা নিয়ে, আর সেটা ঢাকতে গিয়ে চপলতা বেড়ে যায় আরও বেশি। অথচ আলাপ করবার লোভও যে হয়নি, সেকথাও বলতে পারিনে।
তবু হয়ে গেল একদিন যোগাযোগ। বিনা মেঘে বজ্রপাত হয় শুনেছি, কিন্তু বিনা মেঘে বৃষ্টিপাত হয় এ তত্ত্ব আমার জানা ছিল না। আমি ছিলুম একদৃষ্টে ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে। কবি নই, তবু মনে মনে ভাবছিলুম, এই যে দূর থেকে রোষে ক্রোধে তর্জনে গর্জনে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে সিন্ধুপারে লুটিয়ে পড়ে ঢেউগুলোর বিগলিত আত্মনিবেদন এর ঠিক যুতসই তুলনা কী বললে ঠিক ঠিক ওত্রাবে। মনে মনে ভাবছিলুম দুত্তোর ছাই, কবিরা বান্ডিল বান্ডিল তুলনা ছাড়ে কথায় কথায় আর আমার মাথা এমনি নিরেট যে, একটা পর্যন্ত তুলনা খুঁজে খুঁজে বের করতে পারছিনে! ভাগ্যিস, এ যুগের পরীক্ষায় কবিতা রচনা করতে হয় না, না হলে বাবাকে পরীক্ষার ফিজ দিতে দিতে ফতুর হতে হত।
হঠাৎ ঝমাঝঝম বৃষ্টি। ছুট ছুট ছুট। এ বৃষ্টিতে ভিজলে আমার তিন মাসের মেহন্নতে জমানো স্বাস্থ্য তিন টুকরো হয়ে যাবে। সেই নৌকাটার পাশ দিয়ে বেরুচ্ছি, এমন সময় দেখি তামিল ভদ্রলোকটি আমার দিকে ইঙ্গিত করছেন– সমুদ্রের গর্জন ছাপিয়ে চিৎকার করা মানুষের কর্ম নয়। আমি কাছে যেতেই বললেন, নৌকার উপরে উঠে বসুন, আমি পাল দিয়ে আপনার গা ঢেকে দিচ্ছি। একটু পরেই আমার চাকর ছাতা নিয়ে আসবে।
এছাড়া অন্য উপায়ও ছিল না। যত তেজেই ছুট মারি না কেন, বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে কাঁই হয়ে যাব।
গা বাঁচিয়ে বসার পর উত্তেজনা কাটতেই খেয়াল গেল, তামিল ভদ্রলোক কথা বলেছেন পরিষ্কার রাঢ়ী বাঙলায়! কী করে হল? এক মুহূর্তেই ভুলে গেলুম, এরকম শান্ত সংহত লোককে হড়হড় বলে প্রশ্ন জিগ্যেস করা অনুচিত– চিৎকার করে পালের তলা থেকে শুধালুম, এরকম বাঙলা বিদেশি বলতে পারে না। আপনার বাড়ি কোথায়?
ভদ্রলোক শুনতে পেলেন কি না, জানিনে। আমি কোনও উত্তর না পেয়ে বৃষ্টি-বাদল ভুলে গিয়ে ভাষা সমস্যার সমাধানে লেগে গেলুম। অসম্ভব! এরকম অতি পরিষ্কার নদের বাঙলা মাদ্রাজি শিখবে কী করে? কিন্তু বাঙালি এরকম পাকা সেরী ওজনের কট্টর মদ্রাজি বেশভূষাই বা পরতে যাবে কেন? তা-ও না হয় বুঝলুম, কারণ বাঙালি বিদেশি ভূষা গ্রহণে হামেশাই তৈরি, কিন্তু মাথা ন্যাড়া করে বঁটি বাঁধতে তো বাঙালির রাজি হওয়ার কথা নয়। ফরাসি পণ্ডিত ফুশে সায়েব গণপতির মাথা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, গণপতি অর্থাৎ গণ অর্থাৎ যুথ অর্থাৎ হাতির রাজা। এককালে তিনি পুজো পেতেন সাদাসিধে হাতিরূপেই আজও যেমন হনুমানজি, বৃষরাজ পান। তার পর ক্রমে ক্রমে তার নিচের দিকটা বদলে গিয়েছে কিন্তু মাথাটি তিনি বদলাতে রাজি হননি, কারণ শিরাভরণ মানুষ সহজে বদলাতে চায় না। ফুশের কথাটি ঠিক পূর্ব বাঙলার মুসলমান ধুতি-পাঞ্জাবির সঙ্গে টুপি পরে, পাঞ্জাবি শিখ পাঠান স্যুট পরে পাগড়ির সঙ্গে। তার ওপর আরেকটা তত্ত্ব আমার বিলক্ষণ জানা আছে বাঙালি আপন শরীরের অবহেলা করুক আর নাই করুক, চুলটিকে সে কেতাদুরস্ত রাখবেই। তাই তো গেঁয়ো কবিতায় আছে,
বাইরে তোমার লম্বা কেঁচা
ঘরেতে চড়ে না হাঁড়ি
খেতে মাখতে তেল জোট না।
কেরাসিনে বাগাও তেড়ি।
কেরাসিন দিয়ে কেশ-প্রসাধন করবে, তবু চুলের মায়া ছাড়ে না যে বাঙালি, সে মাথা ন্যাড়া করে পরতে যাবে মাদ্রাজি ঝুঁটি!
কিন্তু নদের বাঙলা!
শুনলুম, ছাতা বরসাতি নিয়ে চাকর এসেছে, আপনি বাড়ি যান।
আমি বেরিয়ে এসে শুধালুম, আর আপনি?
ঠিক আছে বলে কী ঠিক আছে, সেটা ভালো করে না বুঝিয়েই তিনি রওয়ানা দিলেন উত্তরমুখো হয়ে সমুদ্রের পারে পারে আর আমি পশ্চিম দিকে, বালু, ঘাস আর পিচের রাস্তা পেরিয়ে বাড়িমুখো।
অভদ্রতা হল অস্বীকার করিনে, কিন্তু তর্কাতর্কি করলে নেমকহারামি হত। যে হাত ছাতা এগিয়ে দেয় সেটাকে তো আর কামড়ানো যায় না।
অপরিচিত মনিব সম্বন্ধে চাকরকে প্রশ্ন করা আরও বেশি অভদ্রতা। তাই কিছু জিগ্যেস করলুম না। বেশিক্ষণ সে সঙ্গে ছিলও না– সবুজ ফালির মাঝখানেই অখণ্ড সৌভাগ্যবতীর পাঠানো ছাতা-বরষাতির সঙ্গে দেখা। বাড়ি পৌঁছে গেল মাথার উপর দিয়ে আরেক ঝড়। কনকপ্রসাদ ছাতা ধরবার চেষ্টা করলেন, কিন্তু শোনে কে? অখণ্ডসৌভাগ্যবতী বারে বারে বলেন দোষ তাঁরই, ছাতা পাঠিয়ে আমাকে এত্তেলা দেওয়া উচিত ছিল তারই, কিন্তু ধমকটা দেন আবার আমাকেই। মেয়েদের বোধহয় এইরকমই স্বভাব। বাচ্চা সংসারে আনেন ওনারাই আবার বাচ্চাকে গালাগাল দেন তেনারাই।
