[আনন্দবাজার পত্রিকা ১২.৮.১৯৪৯]
.
নর্তকী
১
মাদ্রাজ শহরের দক্ষিণতম প্রান্তে সমুদ্রের গা ঘেঁয়ে বাড়িটি। চওড়া বারান্দা– আর সে এতই চওড়া যে স্পষ্ট বোঝা যায়, এ বাড়ির ঘরগুলো বারান্দা বানানোর উপলক্ষ মাত্র। বারান্দাটাই মুখ্য, ঘরগুলো না থাকলে চলে না বলেই নিতান্ত এক পাশে কোণ ঠেসে পড়ে আছে।
বারান্দাতেই জীবন-যাত্রা। গ্রীষ্মের মধ্যাহ্ন ছাড়া অন্য কোনও সময়েই ঘরের ভিতরে যাবার প্রয়োজন হয় না– মাদ্রাজ উপকূলের তির্যকতম বর্ষায়ও না। খাটটা একটুখানি ঠেলে নিয়ে নিম নারকোল কালোজাম গোলমোহরের দাপাদাপির এক পাশে দিব্য আরামে ঘুমানো যায়।
সমুদ্রের গর্জন অষ্টপ্রহর লেগে আছে বলে সবাই কথাবার্তা কয় গলা বেশ চড়িয়ে। কোনওদিন যদি হঠাৎ একটুখানি গর্জন কমে, তখনই সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ করি সবাই কীরকম খামখা চেঁচিয়ে কথাবার্তা বলছি। আমার বন্ধু গৃহস্বামী কনকপ্রসাদ রাও হোটেল-রেস্তোরাঁয় কাউকে চেঁচিয়ে কথা বলতে শুনলেই আমাকে কানে কানে বলতেন, লোকটার জন্ম হয়েছে নিশ্চয়ই সমুদ্রপারে। তার সপ্তকের মধ্যমে অভ্যাস হয়ে গিয়েছে কিছুতেই নামতে পারছে না।
কনকপ্রসাদের সেই ফিসফিসও রেস্তোরাঁর আর সবাই স্পষ্ট শুনতে পেত। তিনি ছেলেবেলাটা কাটিয়েছেন ওয়ালটেয়ারের সমুদ্রপারে।
কনকপ্রসাদ ডাক্তার, আর আমি রোগী। মাদ্রাজ উপকূলে গিয়েছি ভাঙা স্বাস্থ্য জোড়া লাগাবার আশায়। কনকপ্রসাদের হুকুম মাফিক পাকা একটি ঘণ্টা সমুদ্রপারে শুধু পায়ে পাইচারি করতে হয়, চারটে কাঁচা আণ্ডা গিলতে হয়, গোনাগুনতি এক ডজন কমলানেবু খেতে হয়, আরও কত কী এটা-ওটা-সেটা তার হিসাব জানেন কনকপ্রসাদের বউ। গিন্নি আমাকে এসব গেলান ভট্টাচার্য বামুনের বউ যেরকম বাড়িসুদ্ধ সবাইকে শাস্ত্রের বিধান গেলায় ভট্টচাষের চেয়েও বেশি কারণ ঠাকুর বরঞ্চ জানেন মাকড় মারলে থোকড় হয়, কিন্তু ব্রাহ্মণীর কাছে নিপাতন বলে কোনও জিনিস নেই। ডাক্তার জানে, দুটো নেবু একদিন কম খেলে আমি কিছু শয্যাশায়ী হব না; ভটচাও জানেন, সরস্বতী পূজার দিনে বই ছুঁলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায় না, কিন্তু ডাক্তারের বউ ভটাচার্য-গিন্নি ওসব বোঝেন না। আমাকে বারোটা কমলানেবু খেতে হত তুলসীতলায় প্রদীপ দেওয়ার মতো, রিচুয়াল হিসেবে।
ঘড়ি ধরে সূর্যাস্তের ঠিক কুড়ি মিনিট আগে হুকুম হত সমুদ্রপারে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বেরোবার। বারান্দায় দাঁড়িয়ে তিনি তদারক করতেন– আমি পিচ-ঢালা কালো রাস্তার ফালি ওপার হয়ে, সবুজ মাঠের ফালি পেরিয়ে গিয়ে, সোনালি বালুতে ধাক্কা খেতে-খেতে সমুদ্রপারে পৌঁছে মাকুটার মতো উত্তর-দক্ষিণ করছি কি না।
করতুম। পড়েছি যবনের হাতে-র যবনকে যখন আর কারও হাতে পড়ে খানা খেতে হয়, তখন আর বুঝিয়ে বলতে হবে না, অখণ্ড-সৌভাগ্যবতী কনকপ্রসাদ-গৃহিণী কী ধরনের মানুষ ছিলেন।
পাইচারি করতুম আর হিংসেয় আমার বুক ফেটে টুকরো টুকরো হত একটি তামিল ব্রাহ্মণকে সমুদ্রপারে একটা জেলে নৌকার গা ঘেঁষে আরামসে বসে থাকতে দেখে। মাদ্রাজ শহরের শেষ-প্রান্ত বলে এখানে কেউ বড় একটা বেড়াতে আসে না– তাই মাসের আঠাশ দিন এই তামিল ব্রাহ্মণ আর আমাতে মিলে এ রাজত্বে পুরুষ-প্রকৃতির মতো সৃষ্টি চালাতুম। ব্রাহ্মণটিই পুরুষ, কারণ তিনি নির্বিকার, নিশ্চল, নিশ্চুপ হয়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতেন আর আমি প্রকৃতি–শাটল কর্কের মতো কখনও হেথায়, কখনও হোথায় গুত্তা খেয়েই যাচ্ছি, একটানা দশ মিনিটের বেশি জিরোবার হুকুম নেই। সেশ্বর সাংখ্যে প্রকৃতি-পুরুষের উপরেও আছেন আরেকজন। তিনি ডাক্তারের বউ।
ব্রাহ্মণের সামনেই আমি মাকু চালাতুম। কখনও কখনও ঘাড় বাঁকিয়ে দেখেছি, তিনি আমার দিকে একবারের তরেও তাকান কি না। উঁহু। তার দৃষ্টি সমুদ্র পেরিয়ে সোজা দিগ্বলয়ের দিকে। হয়তো তিনি কোনও মারাত্মক রকমের সাধনা নিয়ে পড়ে আছেন শুনেছি কোনও কোনও বিশেষ সাধনা যেমন গুহাগহ্বরে করতে হয়, কোনওটা নাকি তেমনি করতে হয় সিন্ধু-পুলিনে, নির্জনে, গুরুগম্ভীর গর্জনের মাঝখানে। সাধকরা বলেছেন, লোকালয়ে বহু শব্দ, অরণ্যেও পশু-পক্ষীর অহেতুক কলরব; সমুদ্রের গর্জন আর সব ধ্বনি ডুবিয়ে দেয় বলে ওই গম্ভীর মন্ত্রের দিকে মনোনিবেশ করে চিত্তবৃত্তি নিরোধের পয়লা ধাপ অতি অনায়াসে পার হওয়া যায়।
তা হয়তো যায়, ব্রাহ্মণ হয়তো হয়েছেন। আমার তাতে কোনও হিংসে নেই–হিংসে হয় শুধু দেখে, ভদ্রলোক কীরকম আয়েশে গা ডুবিয়ে দিয়ে সিন্ধুর গর্জন গান শুনে, আকাশে রঙের নাচ দেখে, ইসপার উস-পার জুড়ে যে চাঁদের আলোর ঝিকিমিকি লাগে তারই দিকে আপন-ভোলা হয়ে তাকিয়ে থাকে।
লোকটি সুপুরুষ। শ্লেটার সায়েব দক্ষিণ ভারত সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে বলেছেন, মানুষ নাকি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছিল, তাকে যেন প্রলোভনে ফেলা না হয়, আর তারই উত্তরে নাকি ভগবান তামিল রমণী সৃষ্টি করেছেন। দোহাই ধর্মের, এ মত আমার নয়, শ্লেটার সায়েবের, কারণ আমি তো বুঝে উঠতে পারিনে তামিল রমণী যদি সৌন্দর্যহীনাই হবে তবে এরকম সুপুরুষ ব্রাহ্মণ জন্ম নিল কার গর্ভে
কী অপূর্ব কাঁচা সোনার রঙ। সমুদ্রের নীল জলে ধোওয়া সোনালি বালু যেরকম ঝলমল করে ওঠে, ঠিক তেমনি ভদ্রলোকের রঙ। নীল আকাশ আর নীল সমুদ্রের পাশে তার মুখ, হাত-পা যেরকম আপন তেজে অপ্রকাশ হয়ে থাকত, তা তাঁকে সমুদ্র পারে না বসিয়ে দেখলে কিছুতেই বিশ্বাস হবে না। খুব কাছে গিয়ে দেখিনি তবু দূর থেকেই লক্ষ করেছি তার শান্ত চোখ, ছোট একটুখানি মুখ, চওড়া কপাল আর গোল করে কামানো মাথার মাঝখানে একঝুঁটি মিশকালো চকচকে চুল। তামিল ব্রাহ্মণদের এরকম ঝুঁটিবাঁধা চুল দেখলেই আমার মনে প্রশ্ন জাগে, মানুষ ইচ্ছে করে নিজেকে এরকম কুরূপ কুৎসিত করে কেন? কিন্তু এর চুল দেখে এই প্রথম বুঝতে পারলুম, তামিল নটবর কোনও শিব গড়তে গিয়ে কোন বাদর মাথায় তুলে নিয়েছে। এই বিদঘুঁটে ঢঙের কামানো মাথায় খুঁটিবাঁধা চুলও যে কী আশ্চর্য সুন্দর হতে পারে, তা আমি দেখলুম এই প্রথম আর এই শেষ।
