কিন্তু একটি বৈশিষ্ট্যের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করিবার প্রলোভন সম্বরণ করিতে পারিলাম না।
অবনীন্দ্রনাথের চিত্রে এক অদ্ভুত আস্বচ্ছ রূপ আছে– এ রূপ পৃথিবীর অন্য কোনও চিত্রে দেখিতে পাওয়া যায় না।
এই অবর্ণনীয় রূপ তিনি সঙ্গীত হইতে গ্রহণ করিয়া চিত্রে প্রকাশ করিয়াছেন। সকলেই জানেন অবনীন্দ্রনাথ বহু বত্সর ধরিয়া সঙ্গীত সাধনা করেন। সঙ্গীত ধ্বনি দৃষ্টিবহির্ভূত; তিনি ধ্বনিকে রূপায়িত করিয়াছেন– তাই তাঁহার চিত্রের এই আস্বচ্ছ শৈলী।
অদ্যকার দিবসে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ অবনীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে যাহা বলিয়াছেন, তাহা স্মরণ করি :
যখন আমি ভাবি বাঙলায় শ্রদ্ধালাভের সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত ব্যক্তি কে তখন প্রথমই আমার যে নামটির কথা মনে আসে, তাহার হইতেছে অবনীন্দ্রনাথের। দেশকে তিনি আত্মগ্লানির পাপ হইতে রক্ষা করিয়াছেন। অপমানের পঙ্ক হইতে টানিয়া তুলিয়া দেশকে তিনি উহার ন্যায্য সম্মানজনক স্থানে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন। শিল্পচেতনার পুনরুষেণার মধ্য দিয়া ভারতে এক নবযুগের অভ্যুদয় হইয়াছে। এবং তাহার নিকট হইতে সমগ্র ভারত নতুন করিয়া তাহার পাঠ গ্রহণ করিয়াছে। এইভাবে তাঁহার সাফল্যের মধ্য দিয়া বাঙ্গলা গৌরবময় আসন লাভ করিয়াছে।
.
ভরতনাট্যম
শ্ৰীমতী যোগম ও মঙ্গলমের ভরত রীতিতে নৃত্য দেখিয়া আমরা বিমল আনন্দ উপভোগ করিয়াছি। বিশুদ্ধ নৃত্যরস ও আঙ্গিকের দিক দিয়া ইহার পূর্ণ বিশ্লেষণ গুণীরা করিবেন। আমরা অন্যান্য নানা আনন্দের সঙ্গে বিশেষ আনন্দ অনুভব করিয়াছি রসের ভিতর দিয়া উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের কৃষ্টিগত সাদৃশ্য হৃদয়ঙ্গম করিয়া।
উত্তর ভারতে বিশেষ করিয়া বাঙলা দেশে আমরা শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা করি শৃঙ্গার রসের দ্বারা। আমাদের পদাবলিতে কৃষ্ণের প্রতি ভক্তের প্রেম শ্রীরাধার বিরহের ভিতর দিয়া প্রকাশ পায়। এ রস উত্তর ভারতে সম্পূর্ণ অপরিচিত নহে কিন্তু বিষ্ণু-নারায়ণের রাম অবতার সেখানে তুলসীদাস প্রধানত ভক্তিরসের দ্বারা জনগণের হৃদয়-মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন। যুবক-যুবতীর প্রেমবেদনা শ্রীরাধার কণ্ঠে উচ্ছ্বসিত হইয়াছে বিশেষ করিয়া বাঙলা দেশের পদকীর্তনে ও রাজপুতনার মীরাবাঈয়ের ভজনে।
কিন্তু পদাবলিতে কি শুধু শৃঙ্গার? শৃঙ্গার প্রধান রস বটে কিন্তু তাহার সঙ্গে কী সূক্ষ্ম ভক্তিই না মিশ্রিত আছে।
তোমার চরণে আমার পরানে
লাগিল প্রেমের ফাঁসি।
তোমার পরানে আমার পরানে নয়, তোমার চরণে আমার পরানে। কিন্তু চরণে ও পরানে বাঁধা হয় ভক্তি ও স্নেহবন্ধন অথচ কবি বলিলেন– প্রেমের ফাঁসি। ভক্তির সঙ্গে প্রেম, না প্রেমের সঙ্গে ভক্তি, কী বলিব
এই প্রেমের সূক্ষ্ম ভক্তি মিশ্রিত আছে বলিয়াই তাহার প্রকাশ করিতে পারেন বিদগ্ধ কীর্তনিয়ারা। রাধার বিরহ গাহিতে গাহিতে যখন তাহাদের চক্ষু নিবিড় বেদনায় প্লাবিত হয় তখন সে বেদনার কতটুকু গায়কের নিজের যৌবনের প্রিয়া-বিরহের স্মরণে আর কতটুকু বার্ধক্যের তীব্র অনুভূতি–শ্রীকৃষ্ণ অর্থাৎ অস্তিত্বের পরম সত্তা শ্রীভগবানকে জীবনে উপলব্ধি করিতে না পাওয়ায়! জীবনের বহু দহনে দগ্ধ হইয়া যে বৈদগ্ধ্য পরিপূর্ণতা লাভ করে তাহার অভাব হইলে শৃঙ্গার হইতে ভক্তি লোপ পাইয়া যে রস থাকে তাহা অনেক সময় সম্পূর্ণ পার্থিব হইয়া বিকৃতরূপ ধারণ করে।
শ্ৰীমতীদ্বয়ের গৌর (কৃষ্ণ) চন্দ্রিকায় এই ভক্তি ও প্রেমের অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখিয়া পরমানন্দ উপভোগ করিলাম। মনে হইল চরণ ও পরানের ফাঁসিতে যে ব্যঞ্জনা তাহা কাব্যের গুঞ্জরন কুঞ্জবন ত্যাগ করিয়া শ্ৰীমতীদের অঙ্গে সঞ্জীবিত হইল– চিন্ময়ী মৃন্ময়ী রূপ ধারণ করিল। কাব্যে ভক্তি ও শৃঙ্গারের মিলন অপেক্ষাকৃত কঠিন, নৃত্যাভিনয়ে অপেক্ষাকৃত সরল। চোখে-মুখে বিরহের বেদনা অথচ করদ্বয় ভক্তিনমস্কারে যুক্ত। দুই রসের অবর্ণনীয় সম্মেলন। অভিনয়ে এই সম্মেলন অপেক্ষাকৃত সরল বলিয়াই মনে হয় শ্রীমতীরা অল্প বয়সেই তাহা প্রকাশ করিতে সমর্থ হইয়াছেন।
নটরাজের বাঙলা কাব্যে প্রবেশ অগ্রদূত রবীন্দ্রনাথের শঙ্খ ঘোষণায়। নটরাজ দুঃসাহসী যৌবনকে উদ্ধার করেন; কবি যখন নৃত্য আরম্ভ করেন তখন তাহার পদে পদে যেন নটরাজের চঞ্চল চরণ ভঙ্গি পড়ে এই প্রার্থনা করেন; কবি দেখেন নটরাজের নৃত্য বিদ্রোহী পরমাণুকে সুন্দর করিয়া তোলে। শ্রীমতীদ্বয়ের নৃত্যে এই রস রূপ গ্রহণ করিয়া নবীন রসের সৃষ্টি করিল আর নবীন ব্যঞ্জনা পাইলাম নটরাজকে রসস্বরূপে আরাধনা করিবার। হে চিদম্বরমের প্রভু, ত্রিলোক ও কামের ধ্বংসকর্তা নটরাজ, তুমি কি আমার দ্বারপ্রান্তে একবার ক্ষণেকের জন্য দাঁড়াইবে না, আমাকে আহ্বান করিবে না।
নৃত্যের সঙ্গে দ্রাবিড় গীতের সঙ্গত শুনিয়া আমাদের মনে পড়িল ওগো মা রাজার দুলাল যাবে আজি মোর ঘরের সমুখ পথে। সে তো চাহিবে না, তাহার রথের চাকা আমার দরজায় দাঁড়াইবে না, তবু চিদম্বরমের পরম প্রভুকে ক্ষণেক দাঁড়াইবার জন্য মানুষের কী আকুল ক্রন্দন নিবেদন। শ্ৰীমতীদ্বয়ের নৃত্যে কৃষ্ণ নটরাজের প্রতি ভক্তি শৃঙ্গার রসের অভিব্যক্তিই যে সর্বোৎকৃষ্ট ইহা বলা আমাদের উদ্দেশ্য নহে। অপেক্ষাকৃত তরুণরা হয়তো ইহাদের নৃত্যে তালোল সম্বলিত জটিল আঙ্গিকে শুদ্ধ রস পাইয়াছেন; আমার বাল্যকাল হইতে কীর্তন রসে আপুস বলিয়া এই রসই প্রধানত লক্ষ করিয়াছি। এবং তাহার সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ করিলাম যে, উত্তর-দক্ষিণের দেবদেবী যে একই তাহা নহে– সে তো সকলেই জানেন– অধিকন্তু আমাদের রসপূজার সঙ্গে তাঁহাদের রসপূজার স্কুল-সূক্ষ্ম উভয়প্রকারের যোগ আছে। আমাদের পূজাকে পূর্ণাবয়ব করিবার জন্য দক্ষিণের ভরত নৃত্য উত্তরে প্রচারিত হউক।
