কিন্তু অন্যান্য কলাসৃষ্টিতে বাঙালি তথা ভারতীয়ের কণামাত্র উৎসাহ উদ্দীপনা ছিল না। বাঙালি যে চিত্রে কিংবা ভাস্কর্যে নিজস্ব কোনওপ্রকারের রসনাভূতি প্রকাশ করিতে পারিবে কিংবা বিশ্বের সম্মুখে নিজস্ব চারুকলা উপস্থিত করিয়া বিশ্বজনের প্রশস্তি অর্জন করিতে পারিবে এই বিশ্বাস যে বাঙালির ছিল না তাহাই নহে, সামান্য যাহা বাঙালির নিজস্ব কলাশিল্পরূপে তখনও বিদ্যমান ছিল বাঙালি তাহার সম্মুখে লজ্জায় অধোবদন হইত। কালীঘাটের পটকে সম্মান দেওয়া দূরে থাকুক বাঙালি তখন তাহার অস্তিত্ব সম্বন্ধেই অচেতন।
তাই অবনীন্দ্রনাথের সাহস দেখিয়া স্তম্ভিত হই। আজ অজন্তা আর্ট, মোগল চিত্রশিল্প বিশ্বরসিকের কাছে সুপরিচিত। আজ চিত্রকলার প্রামাণিক ইতিহাস পুস্তক পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেই প্রকাশিত হউক না কেন তাহাতে অজন্তা-মোগল চিত্রের উল্লেখ না থাকিলে যে পুস্তক অসম্পূর্ণ বলিয়া গণ্য হয়, গ্রন্থকারের সঙ্কীর্ণ সীমাবদ্ধ রসবোধ নিন্দিত হয়। কিন্তু যে যুগে অবনীন্দ্রনাথ ভারতীয় ঐতিহ্যগত কলাশিল্পে অনুপ্রাণিত হইয়া রসসৃষ্টির নব নব অভিযানে বহির্গত হইলেন, সে যুগেও অজন্তা বঙ্গদেশে ন্যায্য সম্মান পায় নাই। আজ অবিশ্বাস্য মনে হয়, কিন্তু অপেক্ষাকৃত বয়স্ক ব্যক্তি মাত্রই স্মরণ করিতে পারিবেন, অজন্তা চিত্র প্রকাশ করার জন্য প্রবাসী পত্রিকাকে কতখানি হাস্যাস্পদ হইতে হইয়াছিল। সেই বিড়ম্বিত অজন্তা সেই লাঞ্ছিত মোগল চিত্রের আদর্শ সম্মুখে লইয়া চিত্র অঙ্কন করিবার মতো দুঃসাহস অসাধারণ পুরুষেই সম্ভব।
জানি, অবনীন্দ্রনাথ চিত্রাঙ্কন না করিলেও অজন্তা-মোগল একদিন তাহাদের ন্যায্য-সম্মান পাইত, কিন্তু একথা আরও নিশ্চয়রূপে জানি, অবনীন্দ্রনাথ না থাকিলে অজন্তা মোগল নবজীবন লাভ করিয়া আমাদের শতশত শিল্পীকে উদ্বুদ্ধ অনুপ্রাণিত করিতে পারিত না। নবভগীরথ অবনীন্দ্রনাথ কলাক্ষেত্রে যে জাহ্নবী অবতরণ করাইলেন তাহার সোনার ধান বঙ্গদেশের ভাণ্ডার সম্পূর্ণ করিয়া এখন সমস্ত ভারতবর্ষের অনুদান আনন্দদান করিতেছে।
আজ যে ভারতবর্ষের সুদূরতম প্রান্তে ভারতীয় শিল্পী চিত্রাঙ্কন করিবার ভাষা পাইয়াছে, তাহার পশ্চাতে অবনীন্দ্রনাথের কী অক্লান্ত পরিশ্রম এবং অবিচল নিষ্ঠা ছিল সেকথা কয়জন শিল্পী কয়জন শিল্পরসিক হৃদয়ঙ্গম করিতে পারে, কিংবা সশ্রদ্ধ স্মরণ করে?
অবনীন্দ্রনাথ প্রথমযৌবনে ইউরোপীয় পদ্ধতিতে চিত্রাঙ্কন করেন এবং পরবর্তী যুগে নিজস্ব শৈলীতে রসবিকাশ করিয়া স্বদেশে-বিদেশে খ্যাতি অর্জন করেন একথা সকলেই জানেন, কিন্তু নিজস্ব শৈলী নির্মাণের জন্য তিনি যে চীন-জাপান প্রত্যেক প্রাচ্য দেশের শিল্পে বৎসরের পর বৎসর গভীর সাধনা করিয়াছিলেন তাহার সন্ধান তাহার প্রতি শ্রদ্ধানিবেদন করেন আজ কয়জন শিল্পী-ঐতিহাসিক
জাপানের অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পী টাইকান ভারতবর্ষে আসেন প্রথমযৌবনে– অবনীন্দ্রনাথও তখন যুবক। একদিকে টাইকান যেরকম অবনীন্দ্রনাথের সাহচর্যে ভারতবর্ষে সর্ব চারুকলাবিকাশ প্রচেষ্টার সঙ্গে সংযুক্ত হইয়া আপন শৈলী সর্বাঙ্গসুন্দর করিতে সমর্থ হন ঠিক সেইরকম অবনীন্দ্রনাথও জাপানি শৈলী হইতে এমনসব কলাকৌশল আয়ত্ত করেন যাহার প্রসাদে তাঁহার অঙ্কন-পদ্ধতি বহু রসের সংমিশ্রণে অপূর্ব সামঞ্জস্য ধারণ করে। অবনীন্দ্রনাথের প্রধান কৃতিত্ব ছিল এইখানে। যেকোনো কলানিদর্শন, দেখামাত্রই তিনি তাহার প্রকৃত মূল্য বুঝিতে পারিতেন এবং সেই নিদর্শন হইতে কোন বস্তুটি তাহার শৈলীতে সম্পূর্ণ এক হইয়া তাহাকে সমৃদ্ধিশালী করিবে সে রসবোধ ছিল তাহার অসাধারণ। তাই যখন অবনীন্দ্রনাথের চিত্র বিশ্লেষণ করি তখন আর বিস্ময়ের অবধি থাকে না যে এই সঙ্কীর্ণ মানবজীবনে একজন মানুষ কী করিয়া এতখানি কলাকৌশল আয়ত্ত করিতে সক্ষম হইল।
তাই বোধহয় অবনীন্দ্রনাথের কৃতী শিষ্যগণ এত ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে চিত্রাঙ্কন করিয়া বঙ্গদেশের কাজগৎকে এতখানি চিত্রবিচিত্রিত করিতে সক্ষম হইয়াছেন। যে গুরু বহুবিধ সাধনা করিয়া সত্যরস পাইয়াছেন, একমাত্র তিনিই প্রত্যেক শিষ্যের আপন বৈশিষ্ট্য সম্যকরূপে হৃদয়ঙ্গম করিয়া তাহাকে সেই পন্থাতেই কত নব নব অভিজ্ঞতা কত নব নব বিকাশ আছে তাহার সন্ধান দিতে পারেন। সার্থক চিত্রকার এই জগতে অনেক আছেন, কিন্তু অবনীন্দ্রনাথের মতো সার্থক গুরু এই সংসারের সর্বত্রই সর্বযুগেই বিরল। আজ ভারতবর্ষে এমন প্রদেশ নাই যেখানে অবনীন্দ্রনাথের শিষ্য বিরল; কারণ অবনীন্দ্রনাথের শিষ্য নন্দলালের কাছে যাহারা কলাশিল্প আয়ত্ত করিয়াছেন, তাঁহাদের গর্বের অন্ত নাই যে অবনীন্দ্রনাথ তাঁহাদের গুরুর গুরু।
স্পর্শমণির স্পর্শ লাভ করিয়া মৃত্তিকা স্বর্ণ হয়, কিন্তু সেই স্বর্ণ তো স্পর্শমণির মতো অন্য মৃত্তিকাকে স্বর্ণরূপ দিতে পারে না। অথচ যে প্রদীপ অন্য প্রদীপ হইতে একবার অগ্নিশিখা আহরণ করিয়া প্রদীপ্ত হইয়াছে সে পৃথিবীর সর্বপ্রদীপকে প্রজ্বলিত করিতে পারে। সাধনাতে সিদ্ধিলাভ সংসারের অধিকাংশ ক্ষেত্রে মৃত্তিকার স্বর্ণরূপ প্রাপ্তির ন্যায়। তিনি কিন্তু তাহার সাধনার ধন অন্যকে দিতে পারেন না। অবনীন্দ্রনাথের সাধনা দীপ্ত সাধনা। তিনি আপন জীবনে যে রসের সন্ধান পাইয়া নিজেকে প্রদীপ্ত করিয়াছিলেন, সেই অগ্নিশিখা দিয়া বহু শিষ্য আপন আপন অণুদীপ প্রজ্বলিত করিয়াছেন। আজ তাই বঙ্গদেশে তথা তাবৎ ভারতবর্ষে চারুকলার যে অনির্বাণ দীপান্বিতা প্রজ্বলিত হইয়াছে তাহার প্রথম প্রদীপ অবনীন্দ্রনাথ। অবনীন্দ্রনাথের চিত্রকলা-বিশ্লেষণ অদ্যকার কর্ম নয়। তাহার রসবোধ, তাঁহার চিত্রাঙ্কণ পদ্ধতি আধুনিক ভারতীয় চারুকলাকে কতখানি প্রভাবান্বিত করিয়াছে সে আলোচনা করিবার দিন এখনও আসে নাই। কারণ তাহার অনুপ্রেরণা আরও বহু বৎসর ধরিয়া ভারতীয় চিত্রকলাকে সম্মুখের দিকে অগ্রসর করিবে তাহার আসন গ্রহণ করিতে পারে, এমন কোনও পুরুষকে এখনও দিকচক্রবালে দেখিতে পাইতেছি না।
