নামে কী করে?
গোলাপে যে নামে ডাকো,
গন্ধ বিতরে।
(হেম বন্দ্যো’র অনুবাদ)
আমার অপরাধ ফৌজদারি আইনে নয়, আলংকারিক নন্দন শাস্ত্রী-রূপে কবিগুরুর ভাষায় সাহিত্যিক দণ্ডনীতির ধারায় অপরাধের কোঠায় পড়া উচিত– অবশ্য সমসাময়িক কতিপয় মডার্ন কবিই এস্থলে ফরিয়াদি, কবিগুরু নন, আমি নামকরণে গুবলেট করে ফেলেছি। পদ্মলোচন নাম যার প্রাপ্য তাকে দিয়ে বসেছি ভেটকি লোচন, চন্দ্র-বদনকে দিয়েছি বদনা-বদন, রতি-গঠনকে বলেছি গাড়–গঠন।
আমার বিরুদ্ধে ফরিয়াদ আমি গবিতা রচকদের গবি বলে উল্লেখ করেছি।
সঙ্গে সঙ্গে বলেছেন, আমি প্রবীণ বহু জনমান্য মুরুব্বি লেখক। কোনও চ্যাংড়া লেখক এ হেন বাক্য বললে তারা গায়ে মাখতেন না। মুরুব্বিজনের সামান্যতম পদস্খলন স্বচ্ছ নীরে একটি মাত্র কৃষ্ণ কুন্তলের মতো চোখে পড়ে, পক্ষান্তরে চ্যাংড়া-চিংড়ির আবিল জলে বিরাট প্রস্তরখণ্ড হর-হামেশা ঘাপটি মেরে আত্মগোপন করে থাকে।
অতএব আমাকে এখন সাফসফা বলতে হবে আমি দোষী না নির্দোষ।
ধর্মাবতার পাঠকগণ।
ইতোপূর্বে একাধিক পাঠক পাকি ওজনে, নসিকে কর্কশ কণ্ঠে আমাকে গণ্ডমূর্খ খেতাব দিয়ে আমাকে পাঠক-পঞ্চায়েতের সম্মুখে উপস্থিত হয়ে সেটা অপ্রমাণ করার জন্য হুলিয়া শমন জারি করেছেন, এ-পার গঙ্গায় আমার স্বধর্মীজন আমার বিরুদ্ধে কাফের ফতোয়া ঝেড়েছেন (তেনাদের প্রাণঘাতী ফতোয়ার চেয়ে তেনাদের বিজাংগা বিটকেল বাংলা রচনা আমাকে ঘায়েল করেছে ঢের ঢের বেশি); ওনাদের অত্যুৎসাহী জনৈক ফকিহ প্রবর ওই মর্মে প্যামফলেট ছাপিয়ে মেলাতে ফেরি করে বিলক্ষণ টুপাইস কামিয়েছেন; ওপার গঙ্গায় আমাকে হিন্দু ধর্মবিদ্বেষী, সনাতন ধর্মের অপমানকারী প্রতিপন্নার্থে দৈনিকে কঠোর মন্তব্য করেছেন জনৈক উত্তেজিত লেখক। এর কঠোরতর উত্তর অবশ্য দিয়েছেন কলকাতাবাসী পাবনার বারেন্দ্র ব্রাহ্মণদিগের এক ব্যঙ্গনিপুণ পণ্ডিত; পক্ষান্তরে আমি মুসলমানের কলঙ্ক এর প্রতিবাদ পুব বাংলার কেউ করেননি, না করে ভালোই করেছেন; আমি বঙ্গভাষা জননীকে প্যাজ-রসুন (আরবি-ফারসি যাবনিক শব্দ এস্তেমাল করে) খাইয়ে মা-জননীকে ধর্মচ্যুত করবার পাপ-প্রচেষ্টায় অষ্টা সচেষ্ট কেষ্ট-বিষ্ণুবৎ-ইত্যাকার অভিযোগ ঝাড়া সিকি শতাব্দী ধরে আমার বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে। যেসব অভিযোগ ওপার বাঙলার কোনও সম্পাদকই ছাপাতে রাজি হননি সেগুলো ব্যক্তিগত পত্ররূপে সরাসরি ডাক-মারফত, মমালয়ে হানা দিয়ে টিক্কিার দিয়েছে, আমি পাকিস্তান দরদী ইয়াহিয়া-ভুট্টোর স্পাই। পক্ষান্তরে এপার বাংলায় আমি হিন্দু মহাসভার স্পাই এ অভিযোগ কখনও শুনিনি। কিন্তু এদের তুলনায় আমার প্রতি অহেতুক মেহেরবান পাঠক বেশুমার, বিস্তরে বিস্তর। এঁদেরই নীরব দোওয়ার বরকতে এ অধম চাঁদখানা চেহারা করে মুখ বুজে সুখ-ন্দ্রিায় দিব্য কালযাপন করেছে, ভান উইন-কলকে হার মানিয়ে সিকি শতাব্দী ধরে। সর্বপ্রকারের সাফাই মাথায় থাকুন, কোনওপ্রকারে তর্কাতর্কিতেও নামেনি।
কিন্তু আমি উভয় বঙ্গের নিরীহতম পাঠকের ও মর্মদাহের নিমিত্ত হতে পারি– সম্মানিত মডার্ন কবিদের তো কথাই ওঠে না– আমার বিরুদ্ধে এহেন বেদরদ, বেইনসাফ অকরুণ ফরিয়াদ কস্মিনকালেও ক্ষীণতম কণ্ঠেও মর্মরিত হয়নি। নগণ্যতম পত্রিকার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অক্ষরেও ছাপা হয়নি।
আমি মর্মবেদনায় অভিভূত, মোহ্যমান।
কারণ কাজী কবি কতৃক অনূদিত ওমর খৈয়াম রচিত রুবাইয়াতের ভূমিকা লেখবার জন্য কবির আত্মজন তথা প্রকাশক পরিবেশক আমাকে যখন অনুরোধ করে আমার অকিঞ্চন জীবনের সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করেন তখন নতমস্তকে সে অবতরণিকার সর্বশেষে সে যে-রুবাঈটি সর্বান্তঃকরণে সসম্মানে তুলে ধরে সেটি সংসারের যাত্রাপথে তার প্রিয় সহচর;
কারুর প্রাণে দুখ দিও না,
করো বরং হাজার পাপ,
পরের মনে শান্তি নাশি
বাড়িও না তার মনস্তাপ।
অতএব, ধর্মাবতারগণ, পুনরায় সম্বিতস্থ হয়ে আমি আত্মপক্ষ সমর্থনার্থে কিয়দ্দিনের মহলাৎ কামনা করে মোকদ্দমা মুলতুবি রাখার হুকুম ভিক্ষা করি।
মুচলিকাবদ্ধ হচ্ছি, গুণরাজ খান নিক্সনের মতো হালফিল তুষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করত, নানাবিধ কৌটিল্যসুলভ সুচতুর মুষ্টিযোগ (ডিপ্লোমেটিক কূ) প্রসাদাৎ মোকদ্দমাটা প্রলম্বিত করে করে জনগণের দিলচন্সি একদিন যখন ঔদাসীন্যে পরিণত হবে তখন তারই ফায়দা উঠিয়ে চুপসে বেমালুম কেটে পড়ার মতো এলেম আমার পিতৃপিতামহের উদরে কিস্মিনশ্চিত সত্যযুগস্য শুভলগ্নেও ছিল না, বর্তমান বা ভবিষ্যে আমার পেটে এটম বোমা মারলেও বেরুবে না।
[বিচিত্রা পত্রিকা, ঢাকা।]
.
অবনীন্দ্রনাথ
ঊনবিংশ শতকের বাঙালি অন্তত এই সত্য জানিত যে সংস্কৃত-সাহিত্য শ্লাঘার বস্তু। সেই যুগে ভারতীয়ের আত্মমর্যাদাকে ইংরেজ নানাপ্রকারে ক্ষুণ্ণ করা সত্ত্বেও পৃথিবী তখন স্বীকার করিয়া নিয়াছে যে সংস্কৃত সাহিত্য পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্য যে গ্রিক সাহিত্য লইয়া ইউরোপ এত গর্ব করে, তাহার সঙ্গে সংস্কৃত অনায়াসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিতে পারে এবং লাতিন অপেক্ষা সে বহুলাংশে বিত্তবান।
বাঙ্গালার অনুপ্রেরণা সংস্কৃত হইতে আসে; সুতরাং বাঙ্গালা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে বাঙালির অল্পবিস্তর আশ্বাস ছিল। তদুপরি বহু ভাষায় সুপণ্ডিত মধুসূদন যখন সর্বভাষা বর্জন করিয়া বঙ্গভাষায় সার্থক রস সৃষ্টি করিলেন, তখন বাঙালির আত্মবিশ্বাস দৃঢ়তর হইল।
