পূর্বেই নিবেদন করেছি, পাওনাদারদের তাড়নায় অতিষ্ঠ হয়ে কলকাতা ছেড়েছি। এখানেও আমার লেখা যদি শুণিনদের বিরাগভাজন হয় তবে সম্পাদক আমার লেখা ছাপবেন কোন দুঃখে, আব ও দানার কড়ি ঢালবেন কোন গরজে? এবং অতি অবশ্যই হেথাকার পাওনাদার গুষ্টিও আমার হালটা চটসে মালুম করে নিয়ে লাগাবে হুনো। তখন হয় ভুট্টো সাহেবের মতো চুপসে পলায়ন, নয় খাক-ই-গোরই আব ও দানার সঙ্গে টাগ-অব-উয়োরে জিতবেন। আমিও, বিনাপত্যে সুড় সুড় করে সীতা দেবীর মতো ধরণী গো মা, স্থান দাও কোলে ও সঙ্গে সঙ্গে নিজেই নিজের ইন্নালিল্লাহি-যাক গে, বাকিটা থাক। কিন্তু একটা পরম পরিতৃপ্তি নিয়ে আমি পুল-সিরাতের দিকে রওয়ানা হব– যেসব গুণিনকে আমি অজানতে পীড়া দিয়েছি তাঁরা আদল-ইনসাফসহ ফি নারি পড়তে পারবেন।
কিন্তু সর্বসাকুল্যে যে দু পাঁচটি উটকো পাঠক এই আষাঢ়ের সজল ছায়ায় মেঘে ভরা বৃষ্টি ঝিল্লিমন্ত্রে মুখরিত সন্ধ্যায় আমার প্রতি অহেতুক সদয় হয়ে এ লেখাটি পড়ছেন তারা হয়তো এতক্ষণ বেসবুর হয়ে বলতে আরম্ভ করেছেন, এত্তা ধানাই-পানাই কী ঝামেলা নিয়ে সেইটে খুলেই কও না, মাইরি। মেঘে মেঘে যে বেলা হয়ে গেল।
তাই কইচি, গুরু, তাই কইচি। তোমরাই বিচার কর।
গবিতা, অর্থাৎ মডার্ন কবিতা, গদ্যকবিতা যার নাম। গদ্যকবিতার বেশভূষাতে চোখে পড়ে, এতে মিল নাই, অনেক ক্ষেত্রে ক্লাসিক কবিতাসুলভ ছন্দও থাকে না, ততোধিক ক্ষেত্রে ছত্রগুলোও একই দৈর্ঘ্যের নয়। বাইরের বেশভূষা অর্থাৎ বাহ্যরূপ পেরিয়ে ভিতরে ঢুকলে প্রথমেই মনের চোখে ধরা পড়ে, ক্লাসিক বা প্রাক গবিতাতে যেরকম প্রতি ছত্র এবং সম্পূর্ণ কবিতাটির সামঞ্জস্যপূর্ণ একটা অর্থ পাওয়া যায় গবিতাতে তা নেই। এক-একটা ছত্রের অর্থ হয়তো পরিষ্কার কিন্তু গোটা কবিতার মূল অর্থ, লাইট মোতিফ যে কী সেটা অধিকাংশ স্থলে বিলকুল ধরা যায় না, হয়তো আদৌ নেই। গবিতা পড়ে সনাতনপন্থিরা সোজাসুজি বলেন, এর তো মানে বুঝতে পারলুম না আদৌ। এর তো মাথামুণ্ডু কিছুই নেই। যদ্যপি আমি খাক-ই-গোরের প্রত্যন্ত প্রদেশে দণ্ডায়মান তথাপি আমি এ সম্প্রদায়ের সদস্য নই।
গবিতা কথাটা উভয় বাঙলায়ই চাউর হয়ে গিয়েছে। অবশ্য গবিতা যারা রচনা করেন, পড়ে আনন্দ পান, প্রশংসা করেন তারা এ শব্দটা ব্যবহার করেন না। তাঁরা মনে করেন, শব্দটা তাচ্ছিল্যজাত ব্যঙ্গসূচক। কিন্তু ইতিহাসে এমন উদাহরণও আছে যেখানে পরদেশি দত্ত অবজ্ঞাসূচক নাম বা পদবি পরে ওই দেশের লোক গ্রহণ করেছে। কবিগুরু রচিত ভারতের জাতীয় সঙ্গীতে মাত্র তিনটি নিতান্তই অবর্জনীয় বিদেশি শব্দ আছে– মুসলমান ও খ্রিস্টানি এবং আরেকটি শব্দ পরে আসছে। প্রথমটি আরবি দ্বিতীয়টি গ্রিক। কিন্তু এহ বাহ্য। আসল রগড় জাতীয় সঙ্গীতের হিন্দু শব্দটি নিয়ে। চলন্তিকার মতো অতি সংক্ষিপ্ত অভিধানও বলছেন, হিন্দু শব্দটি ফারসি। এ শব্দটি সংস্কৃতে নেই, যদিও আসলে সিন্ধু থেকে এসেছে। ফারসিতে হিন্দ বলতে কালো বোঝায় এবং বিলক্ষণ তুচ্ছার্থে। অর্থাৎ ইরানিদের মতে ভারতীয়রা আর্যেতর, কারণ ব্যাটারা কেলে কেলে। কিন্তু এই হিনদু এবং তৎনির্গত একাধিক শব্দ তসাময়িক আন্তর্জাতিক জগতে এমনই ছড়িয়ে পড়ল যে শেষটায় ভারতীয়রাই নিজেদের হিন্দু নামে পরিচয় দিতে আরম্ভ করল। ওদিকে অবশ্য ফারসিতে মূল তুচ্ছার্থটা লোপ পেল। কিন্তু অতদূরে যাই কেন? মরহুম মুহম্মদ আলি ভাই ঝিড়া ভাইয়ের ঝিড়া শব্দের গুজরাতিতে অর্থ ক্ষুদে (যেমন ক্রিকেটার বিনু মাকড়ের মাকড় শব্দের অর্থ পিঁপড়ে) এবং কিঞ্চিৎ তুচ্ছার্থে। ঝিড়া নাম দেবার উদ্দেশ্য সরল। এত ক্ষুদে ঝিড়া, যে মৃত্যুদূত তাকে দেখতেই পাবে না। আমাদের ক্ষুদিরাম, নফর চট্টো, এককড়ি, তিনকড়ি এসব একই ঝোঁপের চিড়িয়া। আকছারই কিন্তু এককড়ে, ক্ষুদে বা কেষ্টা কেউই নামটা তুচ্ছার্থে না অন্যার্থে সে নিয়ে মাথা ঘামায় না। কিন্তু ঝিড়াভাই যখন মুসলিম লীগের সর্বাধিকারী হয়ে আত্মপ্রকাশ করলেন তখন আরবি-ফারসির বিস্তর কদরদানরা বড়ই সংকোচ অনুভব করলেন। ঝিড়াকে তখন জিন্নাহ-এ রূপান্তরিত করেন। অর্থাৎ পাড়ার মেধো ও-পাড়ার মধু না হয়ে স্বপাড়াতেই মধুসূদন হয়ে গেলেন। পাছে লোক জিন্নাহ শব্দটির গাইয়া মূলরূপটি ধরে ফেলে তাই জিন্নাহ শব্দের হ-টি হে দুত্তি দিয়ে লেখা হল দো-চশমি সাদামাটা হে দিয়ে নয়। কারণ প্রথম হে-টি শুধুমাত্র একদম খাঁটি নসিকে আরবি শব্দেই ব্যবহার করা হয়। ওই একই সময় লীগের আরেক মহাজন আবদুর রহমান সিন্ধি রাতারাতি হয়ে গেলেন আবদুর রহমান স্বিদ্দিকি!… তা সে যাক গে– এইসি গতি সংসারমে। প্রভু খ্রিস্টর প্রধান শাকরেদ (সেন্ট) পিটার গ্রিক নামের অর্থ পাথর– প্রাণহীন (ইংরেজি পেট্রিফাইড শব্দ তুলনীয়)। তার প্রাণ হরণ করবে কোন শয়তানের যুবরাজ বিয়েলজবা বা তার খাস প্যারা ডিয়াবলস (ডেভিল)। অথচ পিটারকে পাষাণহৃদয় বা সনগৃদিল রূপে ভাবলে নিশ্চয়ই সেটা সম্মানসূচক নয়। ইনজিল গ্রন্থে আছে, প্রভু ইসা মসিহ পিটারকে বলেছিলেন, তুমি পিতর, আর এই পাথরের উপরে আমি আপন মণ্ডলী (গির্জা) গাঁথিব। এরপর কোন খ্রিস্ট-ভক্ত পিটার নামকে হেনস্তা করবে? প্রস্তর, পিটারকে ফরাসিতে বলে পিয়ের এবং ওই দেশে সে নামটি যে কতখানি জনপ্রিয় সবাই জানেন। বোমা রোলা তাঁর সবচেয়ে রোমান্টিক প্রেমের কাহিনী পিয়ের এ স-এর নায়কের নাম বেছে নিয়েছেন পিয়ের– যে নাম আমাদের ফিরোজ বা কেষ্টার ন্যায় প্রতি গ্রামে বর্ষায় ব্যাঙচির মতো কিলবিল করে।… আর শেক্সপিয়র, খাতিম উল ইসম রূপে বলেই গিয়েছেন,
