তাই বলি, অটোপ্রমোশন বা স্বতঃ উন্নয়ন অত্যুত্তম প্রস্তাব।
তবে হ্যাঁ; আমার একটা শর্ত আছে।
অধ্যাপক রোল কল করে (না করলেও খয়র!) একটু জিরোবেন। আমরা যে যার খুশিমতো ক্লাস থেকে বেরিয়ে হেথা হোথা ঘুরে বেড়াব, জেবে রেস্ত থাকলে অবশ্যই মরহুম মধুর মধ্বালয়ে; যে কটা মূর্খ নিতান্তই পড়াশোনা করতে চায়, তারা তাঁর লেকচার শুনবে, পরীক্ষা দেবে, পাস করবে। যারা ফেল মারবে তারা পাবে আমাদের মতো অটোপ্রমোশন। কিন্তু চাকরির বেলা কি অটো, কি খেটো (খেটে যারা পাস করেছে) সবাই পাবে সমান চান্স। যে মহাপুরুষ সর্ব প্রথম অটোপ্রমোশনের প্রস্তাব করেছেন তিনি সাতিশয় হক কথা বলেছেন যে, চাকরি-দেবার বেলা যে চাকরি দেয় সে তো বাজিয়েই নেয়। সে তো পরীক্ষা নেবেই। তবে দু দু-বার পরীক্ষা কেন, বাওয়া? একটা লোকের ফাঁসি হয় কবার? একই অপরাধে তো দু দু-বার সাজা হয় না। আমার কথায় পেত্যয় না মানলে শুধোন গে পাকিস্তানের প্যারা ব্যারিস্টার ভুট্টোকে! সে জানে বলে তার দেশে আটক বাঙালিদের প্রথম ডিসমিস করে, পরে জেলে পোরে।
আর কে সে গুণরাজ খান আপনাকে ভাচর ভ্যাচর করে আপ্তবাক্য শুনিয়েছে যে, সে পরীক্ষায় খেটোরা ত্রিং বিং করে পয়লা দোসরা হবে আর অটোরা গুঁড়ি গুঁড়ি হামাগুড়ি দিয়ে বাড়ি ফিরে তৌবা-তিল্লা করবে? আমি কথা দিচ্ছি, বিস্তর খেটো ভেটোতে না-মঞ্জুর হবেন আর এন্তের অটোর ফটো তুলবে প্রেস ফটোগ্রাফার।
এ বাবদে প্রকৃত সত্যটা এই বেলা শুনে নিন :
পরীক্ষার জন্যে সর্বোত্তম প্রস্তুত ক্যানডিডেটের কাছেও পরীক্ষা হিমালয় পর্বতবৎ। ইহসংসারে গাড়লস্য গাড়লও এমন সব প্রশ্ন শুধোতে পারে যার উত্তর পণ্ডিতস্য পণ্ডিতও দিতে পারেন না।
Examinations are formidable even to the best prepared for the greatest FOOL may ask more than the wisest man can answer, CORLTON.
পরীক্ষা মাত্রই লটারি বাংলা কথা।
[বেতার বাংলা, ঈদ সংখ্যা ১৪ কার্তিক ১৩৭৯]
.
নট গিলটি
সদ্য-সম্প্রতি কিয়জ্জনের কৃপাধন্য মশকুর এ অধমের ছোট্ট একটি রচনা কলকাতার অন্যতম সাপ্তাহিক প্রকাশ করেন। আমি স্ফীতমুণ্ড ন্যাজমোটা লেখক নই; তাই বিবেচনা করি সেদিন সে পত্রিকার চরম দুর্দিন ছিল। কথায় বলে, “অভাবে স্বয়ং শয়তানও মাছি ধরে ধরে খায়। রচনা-বাড়ন্তের সে কুগ্রহে প্রাগুক্ত পত্রিকার সম্পাদক প্রবাদটি স্মরণে এনে অধমের নাকিস লেখাটি প্রকাশার্থে প্রেস বাগে চিড়িয়াপারা উড়িয়ে দিলেন, অর্থাৎ দুগগা বলে ঝুলে পড়লেন।
কলকাতার নাগরিকসুলভ বিদগ্ধজন আমার লেখা বড় একটা পড়েন না। পণ্ডিতজন আদৌ না, অর্থাৎ উল্কট সংকটেও মাছি ধরে ধরে খান না। যে দু একজন ভিন্ন গোয়ালে বাস করেন। তেনারা দু চার ছত্র পড়ে তাচ্ছিল্যিভরে সুনিন্দিত রায় দেন আস্ত একটা ভাঁড়।
আমি শ্রীরাধার ন্যায় সে নিন্দা
চন্দন মানিয়া অঙ্গেতে লেপিনু
চরম আনন্দ ভরে।
কেন? সেকথা আরেকদিন হবে।
অপিচ, মহানগরীতে পাওনাদারদের তাড়ায় হেথায় পালিয়ে এসে শুনি, সে খাকছার ধূলির ধূলি ভাঁড়ামিটা এতদ্দেশীয় অপর্যাপ্ত গুণি তথা কবিকুল পড়েছেন এবং মর্মাহত হয়েছেন তবে আমার যে আত্মজন এ সন্দেশটি পরিবেশন করলেন তিনি তিল ব্যাজ না সয়ে তড়িঘড়ি যোগ দিলেন সে মর্মবেদনা উম্মাসহ নয়, অতিশয় সবিনয়।
শোনা মাত্রই আমার মন-বন-উপবনের ভিতর দিনে যেন কোনও অভিসারিণী হাওয়া হাওয়ায় ভেসে গেল। আমার রক্তে তার নূপুরের রিনিরিনি যেন ঝিল্লির ঝিনিঝিনি হয়ে বেজে উঠল।
মুর্শিদের দিব্যি গিলে বলছি, আমি পীড়া-সন্তোষী নই। এই খানদানি ঢাকা শহরে আমার লেখা পড়ে যদি একটি মাত্র গুণি ক্ষণতরে রত্তিভর পীড়া অনুভব করেন তবে তাই নিয়ে আমি উল্লাস অনুভব করব, এমনতরো বিঘ্ন-সন্তোষী পিচেশ আমি নই। আমি উল্লাস বোধ করেছি দশরথের ন্যায়। পুত্র হবে রে, পুত্রসন্তান হবে আমার–এই একটি বাক্য পুনঃ পুনঃ চিৎকার করতে করতে মুক্তকচ্ছ হয়ে সোল্লাসে তিনি নৃত্য জুড়ে দিয়েছিলেন। পুত্র-বিরহের শোকে যে তাঁর মৃত্যু হবে সে শাপটি তিনি তখন বেবাক ভুলে গিয়েছিলেন। আম্মা তাই নৃত্য জুড়েছি আর চিৎকার করে পাড়ার পাঁচজন রক-এর পাঁচো ইয়ারকে শোনাচ্ছি, পড়ে হে পড়ে; এখনও লোকে আমার লেখা পড়ে। সমুচা ভুলে গিয়েছি, আমার লেখা তাদের মর্মবেদনার কারণ হয়েছে।
কিন্তু হায় সব নেশারই একটা অবসান আছে। তার পর আসে খুম্মারের খোয়ারি। তখন মাথাটা করে তাজ্জিম মাজ্জিম; উডহাউসের নায়ক উস্টার দেখতে পেত সারি সারি গোলাপি হাতি তার বেডরুমের মধ্যিখান দিয়ে সবুজ শুড় নাচাতে নাচাতে পিল পিল করে জিভস্-এর প্যানট্রি বাগে এগোচ্ছে। আমারও ফাপানো, মোটা ন্যাজটা যখন ধীরে ধীরে চুপকে যেতে লাগল তখন খোয়ারির শিকার খৈয়ামের মতো দহিল হৃদয়বন তীব্র ক্ষোভানলৈ। মনে মনে আন্দেসা করলুম, এ তো বড় আশ্চর্য! ভাড় আমি। আমার ভঁড়ামি পানসে হতে পারে কিন্তু বেদনা দেবে কোন তাগতে? তা হলে যে মারা যাবে তার আব ও দানা,
দুইটি বস্তু প্রতি মানুষেরে
টানিতেছে জোর জোর।
দানা-পানি টানে একদিকে আর
আর দিকে টানে গোর ॥
দো চিজ আদ মরা
কশদ জোর জোর
এক-ই আব-দানা
দিগর খাক-ই গোর
