বিশাল ভারত, বৃহত্তর ভারতবর্ষের স্বপ্ন যারা দেখতে চান, একমাত্র তারাই মহাত্মাজির বাণী, পণ্ডিতজির আবেগ বুঝতে পারবেন।
.
অটোপ্রমোশন
বহুকাল ধরে আমি স্বদেশবাসীর সঙ্গে গলা মিলিয়ে সাহিত্যাচার্য বঙ্কিমচন্দ্রের নামের পূর্বে ঋষি অভিধা যোগ করতে পারতুম না বলে কেমন যেন ঈষৎ সংকোচ অনুভব করতুম। তার পর হঠাৎ (ঢাকাতে এদানির রংদারি ভাষায় হঠাৎ করে) এক শুভপ্রাতে আমার জনৈক মুরুব্বি পথে যেতে যেতে শুনতে পেলেন আমি তারস্বরে পরীক্ষার জিওমিট্রি মুখস্থ করছি। এক লহমার তরে থমকে দাঁড়িয়ে শুনলেন, পরক্ষণেই কণ্ঠস্থ করছি এলজেব্রার ফরমুলা, তার পর আরবি টেক্সটের ইংরেজি অনুবাদ, তার পর সূর্যগ্রহণের শুভঙ্করী– ক্ষণে এটা, ক্ষণে ওটা, ক্ষণে সেটা। সমুচা বছরটি কাটিয়েছি হেথা হোথা সর্বত্র গ্যাংজাম করার মোকা পেলেই তার ন্যায্য, হকসম্মত হিস্যেটি উপভোগ করে– এ তত্ত্বটি আমার মজবুর মুরুব্বিটি বিলক্ষণ অবগত ছিলেন। এখন যে আসন্ন পরীক্ষার সামনে দিশেহারা হয়ে ক্ষণে এ সবজেক্ট ক্ষণে ও সবজেক্ট খামচাচ্ছি সেটা হৃদয়ঙ্গম করতেও তাঁর রত্তিভর তকলিফ বরদাস্ত করতে হল না। জানালা দিয়ে খোঁচা খোঁচা দাড়ি-ভর্তি কদম্ববদনখানা গলিয়ে বাঁকা হাসি হেসে বললেন, ওরে ভালুক, তোর সর্বাঙ্গে যে চুল। তেড়ি কাটবি কোথায়?
হঃ!–দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে সেই খাট্টা হরূহ তত্ত্বটা গিলে নিয়ে ভাবলুম, হায়, দু একটা সবজেক্ট হেথা হোথা নেগলেক্ট করে থাকলে মামেলা এনা ঝামেলাময় হোত। হয় টুকলি মেরে, নয় গুডবয় মেজদাকে খুঁচিয়ে তার মদৎ-কাকুই দিয়ে না হয় ডবল তেড়ি কেটে পরীক্ষার হল সমুদ্র পেরিয়ে যেতুম ড্যাং ড্যাং করে। কিন্তু ওই যে পাড়ার ভেটকি-লোচন, বদনা-বদন, গাড়-গঠন মুরুব্বিটা যে উপমাটা দিয়ে তত্ত্বকথা বলল তার দাওয়াই কই? হ্যাঁ– সব্বাঙ্গে যখন ঘা তখন মলম লাগাই কোথায়?
কাটা ঘায়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে, দিলদরাজ মেকদারে আইডিন ছিটিয়ে যাবার বেলা মুরুব্বি বললেন, জানিস, বঙ্কিমচন্দ্র কী বলেছেন?
ছাত্রজীবন ছিল
সুখের জীবন
যদি না থাকিত, রে,
এ-গ-জা-মি-নে-শ-ন!
তদ্দশ্যেই চড়াকসে আমার মাথায় খেলে গেল, কেন আর সব্বাই বঙ্কিমের নামের পূর্বে ঋষি খেতাব এস্তেমাল করেছেন। তিনি নাকি বিএ না কী যেন কোন পরীক্ষায় ফার্স্ট না সেকেন্ড হয়েছিলেন। আমি ম্যাট্রিকের সামনেই মুক্তক, বে-এক্তেয়ার। হাড়ে হাড়ে বুঝলুম, কী গব্বযন্তনার ভিতর দিয়ে বিএর বাচ্চা তিনি বিইয়ে ছিলেন- নইলে এমনতরো একখানি টালমাটাল গর্দিশের বয়ান জুৎসই চারটি পদে প্রকাশ করা তো চাট্টিখানি কথা নয়, মাইরি।
সেই অবধি আমো বঙ্কিমকে ঋষি নামে ডাকি– বিশেষ করে অগুনতি যেসব পরীক্ষায় দফে দফে ফেল মেরেছি তার পূর্বে এবং পরে।
বস্তৃত ওই কন্মে গত অর্ধ শতাব্দী ধরে আমাকে পয়লা নম্বরি স্পেশালিস্ট বলে গণ্য করা হয়েছে।
তাই বলে বিদ্যা-তন্দুর পাঠক মোটেই ভেব না, টুকলি মারা বা টুকলি মেরেও ফেল করাটা খুবই একটা ফ্যালনার ব্যাপার। কথাটা বুঝিয়ে বলতে হয়।
বহু যুগ হয়ে গেছে, যাত্রাগান বা থিয়েটার দেখতে যাইনি। তাই বলতে পারব না এখনও নাট্যজগতে এনকোর একোর অর্থাৎ ফিসে-র রেওয়াজ আছে, না উঠে গেছে। কথাটা ফরাসি আঁকোর-এর বিদেশি শব্দের উচ্চারণ বিগড়ানো বাবদে অলিপিক-শিকারি ইংরেজি উচ্চারণ– না, বলা উচিত ছিল দুরুশ্চারণ। কোনও একটা সিন নাট্যামোদীগণকে বেহদ খুশ করে দিলে তারা ঘন ঘন করতালি দিতে দিতে চিৎকার করতেন এনকোর, এনকোর, আবার অভিনয় করো, ফিসে বালাও। এমনকি ভীষণ গদাযুদ্ধের শেষে দুর্যোধন পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হওয়ার পর এনকোর এনকোর পড়লে তাকেও ফের আকাশছোঁয়া লক্ষ মেরে ফিসে ষষ্ঠত্ব পেতে হত– একবার মরেছে তো কী হয়েছে।
আমি যথারীতি একবার ফেল মেরেছি। পাড়ার হাড়েটক সেই জ্যাঠার সঙ্গে আচানক দেখা। বিটকেল হাসি হেসে বললেন, কিরে! ফেল মেরেছিস তো?
আমি ভিট-কিলিমির একখানা সরেস হাস্যে তাঁকে ঘায়েল করে বললুম, বলেন কী, স্যার! অ্যামন খাসা খাসা অ্যানসার ছেড়েছিলুম যে এগজামিনার বলল, এনকোর। তাইতে ফের আসছে বছর ম্যাট্রিক দিচ্ছি।
কিন্তু কী দরকার এসব বখেড়ার? আমি তাই অটোপ্রমোশনের দারুণ চ্যাম্পিয়ান। প্রথমেই দেখুন অটো দিয়ে যেসব জিনিস তৈরি হয় তার সবকটাই অত্যুত্তম। গ্রিক অটো (আসলে আউটো) আর সংস্কৃত স্বতঃ একদম একই শব্দ। কবিগুরুর সর্বাগ্রজ তাই অটোমবিল কার (মোটরগাড়ির) অনুবাদ করেছিলেন স্বতঃচল = স্বতশ্চল শকট। এখন, পাঠক, তুমিই বল নিজের থেকে চলে স্বতশ্চল শকট ভালো, না ঠেলাগাড়ি ভালো! এই যে তুমি ন মাস ধরে লড়াই লড়লে সে সময় লাখ খানেক অটোমেটিক স্বতঃক্রিয় রাইফেল পেলে। আল্লাকে পাঁচ শুকরিয়া জানাতে বেশি, না লাখ মাজল লোডার, গাদা বন্দুক? এই যে তুমি স্বাধীনতা পেয়েছ, তোমার প্রধান লক্ষ্য কী? নিশ্চয়ই অটো+আর্কেইন অর্থাৎ অটার্কি, অর্থাৎ স্বতঃ সম্পূর্ণ অর্থনীতি– যাতে করে তামাম দুনিয়াটা চষে হাতির দরে ছাগল কিনতে না হয়। কিংবা ধরো অটোবায়োগ্রাফি। আমার সে ক্ষ্যামতা থাকলে আমি কি আমার অটোজীবনী লিখতুম না? নিজেকে আসমানে চড়িয়ে নিদেন তখৎ-ই-তাউসে বসিয়ে একটি ছবি যা আঁকতুম, মাইরি। চেহারায় উত্তমকুমার, গানে হেমন্ত মুখো, নৃত্যে উদয়শঙ্কর, সংগ্রামে ওসমানী! অবশ্য আমার জীবনী কেউ লিখবে না। কিন্তু পাপিষ্টের অপমৃত্যু নাম দিয়ে আর পাঁচজনকে হুঁশিয়ার করার জন্য আমার উদাহরণ দেখিয়ে কেউ যদিস্যাৎ লিখে ফেলে? তবেই তো চিত্তির! টুকলি মারতে গিয়ে কবার যে টার্ন আউট হয়েছি সেটাও ফাস করে দেবে যে।
