সেকথা বুঝতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন খাঁটি হিন্দি এবং খাঁটি উর্দুর স্বরূপ চেনা। হিন্দি ভাষা বাঙলারই মতো প্রাকৃত ভাষার ক্রমবিকাশের ফল– উর্দু তাই। অর্থাৎ অতি সাধারণ হিন্দি এবং উর্দুতে কোনও পার্থক্য নেই। তুম কব আয়োগে? মে কল কানপুর জাঙ্গা ইত্যাদি সরল সাধারণ কথায় হিন্দি-উর্দুতে কোনও পার্থক্য নেই। কিন্তু চিন্তা এবং অনুভূতির জগতে প্রবেশ করে যখন বলি, ভারতবর্ষের রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য অর্থনৈতিক উন্নতির প্রয়োজন তখন হিন্দি বাঙলার মতো প্রধানত সংস্কৃতের স্মরণ নিয়ে বলে, ভারতবর্ষ কি রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে লিয়ে অর্থনৈতিক উনতিকি প্রয়োজন হৈ এবং উর্দু সেস্থলে আরবি-ফারসির শরণ নিয়ে বলে হিন্দুস্থান কি সিয়াসতি আজাদিকে লিয়ে ফিসকি তরকিকি জরুরৎ হৈ।
ভাষার দিক দিয়ে এই হল প্রধান পার্থক্য।
বাঙলার সঙ্গে এই আলোচনাটা মিলিয়ে নিয়ে তাকালে দেখি বিদ্যাসাগরি বাঙলা হিন্দিরই মতো, আর আলালের ঘরের দুলাল অনেকটা উর্দুর কাছে চলে যায়। কিন্তু বাঙলার সুবিধা হচ্ছে এই যে, আমরা আজ বিদ্যাসাগরি এবং আলালি উভয় ভাষাই বর্জন করেছি অথবা বলতে পারি আমরা দুটোই গ্রহণ করেছি। পরশুরাম প্রয়োজন মতো কখনও সংস্কৃত ঘেঁষা কখনও ফারসি ঘেঁষা বাঙলা লিখে যে অপূর্ব রস সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছেন, সে রস বাঙলা ভাষার ঐতিহ্যের অঙ্গীভূত হয়ে গিয়েছে। আমরা বাঙলা লিখতে এখন আর এ বিচার করিনে, কোন শব্দ আসলে ফরাসি আর কোন শব্দ সংস্কৃত।
দিল্লি এবং যুক্তপ্রদেশে এক কালে উর্দুর প্রাধান্য ছিল বলে হিন্দিতে বিস্তর আরবি-ফারসি শব্দ ঢুকতে পেরেছে বাঙলার তুলনায় অনেক অনেক বেশি। কিন্তু বাঙলায় বঙ্কিম রবীন্দ্রনাথ ভাষা বাবদে যে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে গিয়েছেন, হিন্দিতে সেরকম কোনও নিষ্পত্তি হয়নি। তাই হিন্দি ভাষা-ভাষীদের মধ্যে কিছুদিন হল এক ছুবাই বা puritan আন্দোলন আরম্ভ হয়েছে।
এ আন্দোলনের অন্যতম নেতা শ্রীযুক্ত অমরনাথ ঝা। শান্তিনিকেতন সমাবর্তন উৎসব উপলক্ষে তিনি গত ডিসেম্বর মাসে শান্তিনিকেতনের প্রাক্তন ছাত্রদের সম্মুখে রাষ্ট্রভাষা সম্বন্ধে হিন্দিতে এক ভাষণ দেন। ওঝাজি আধ ঘণ্টাটাক বক্তৃতা দেন– আমি অবিহিতচিত্তে সে বক্তৃতা শুনি। লক্ষ করলুম যে, সেই বক্তৃতাতে তিনি একটি মাত্র অসংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করলেন না। যেসব আরবি-ফারসি শব্দ, হিন্দির সঙ্গে মিশে গিয়ে বহুকাল হল এক হয়ে গিয়েছে (বাঙলাতে যেরকম অকুস্থানের অকু, ময়না-তদন্তের ময়না, সবুজ সবজি, গরিব ইত্যাদি শব্দের জাত-বিচার আজ আর কেউ করে না) শ্ৰীযুক্ত অমরনাথ সেগুলো পর্যন্ত বর্জন করে বক্তৃতা দিলেন। এমনকি ইসকে বাদ না বলে ইসকে পশ্চাৎ সে বললেন!
উপসংহারে শ্রীযুক্ত অমরনাথ বললেন, হমলোগোঁকি রাষ্ট্রভাষা সংস্কৃতময়ী” হিন্দি হোগি অর্থাৎ হিন্দি-উর্দুর দ্বন্দ্বের আর কোনও প্রশ্নই ওঠে না। হিন্দুস্থানিও না, এমনকি আমাদের রাষ্ট্রভাষা হিন্দি থেকেও অসংস্কৃত সর্বপ্রকার শব্দ বাদ দিয়ে তাকে সংস্কৃতের পর্যায়ে তুলতে হবে।
বাঙলার সঙ্গে মিলিয়ে এই তত্ত্বটি প্রকাশ করতে হলে বলতে হবে, পরশুরামি সুকুমার রায়ি বাঙলা তো নয়ই, বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথি বাঙলাও না, আমরা এখন সবকিছু বলব এবং লিখব বিদ্যাসাগরি বাঙলায়।
মহাত্মাজি এ জাতীয় অতিশুদ্ধ, কট্টর হিন্দির নিন্দা করেছেন, অতিশুদ্ধ উর্দুকেও ঠিক তেমনি নিন্দা করেছেন। মহাত্মাজি চেয়েছিলেন, এই দুইয়ের সংশ্রিণে গড়ে-ওঠা, নবীন নবীন চিন্তা ও অনুভূতি প্রকাশে সক্ষম, তার জন্য নতুন শব্দ গ্রহণে অকুণ্ঠিত, প্রাণবন্ত সজীব ভাষা। সে ভাষা শেষ পর্যন্ত কী রূপ নেবে সে সম্বন্ধে মহাত্মাজি কিছু বলেননি, কিন্তু উপস্থিত সে ভাষার শব্দসম্পদ দেখাবার জন্য তিনি স্বয়ং একটি অভিধান নির্মাণ করেছিলেন ও সপ্তাহে সপ্তাহে আপন সাপ্তাহিকে সেটি প্রকাশ করেছিলেন।
এই ভাষার নাম হিন্দুস্থানি। এ ভাষা তেজবাহাদুর সপরুর অতিশুদ্ধ উর্দু নয়, পণ্ডিত মালবিয়ের (মালব্য নয়) অতিশুদ্ধ হিন্দি নয়– হিন্দু-বৌদ্ধ-শিখ-জৈন-পারসি-মুসলমান খ্রিস্টানির মহাশঙ্খ রাষ্ট্রভাষা।
পণ্ডিত জওয়াহিরলাল এই জাতীয় ভাষাই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চান। পণ্ডিতজি ভাষাবিদ অথবা শব্দতাত্ত্বিক নন, কিন্তু তৎসত্ত্বেও তিনি এই তত্ত্বটি হৃদয়ঙ্গম করতে সমর্থ হয়েছেন যে, আমাদের রাষ্ট্রভাষা যখন শেষ পর্যন্ত তার জন্মভূমি যুক্তপ্রদেশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ সৌরাষ্ট্র মগধ সর্বত্রই সে ভাষা ব্যবহৃত হবে তখন সে ভাষা ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশ থেকে বিভিন্ন প্রকারের শব্দ গ্রহণ করতে বাধ্য। ইংরেজি ভাষা ভারতবর্ষে এসে Dawk, Juggernant, Choroot প্রভৃতি কত শব্দ গ্রহণ করেছে তার হিসাব নেই– যে দেশে গিয়েছে সেখানেই নতুন নতুন শব্দ গ্রহণ করে আপন ভাষাকে সমৃদ্ধিশালী করেছে।
তাই আজ ইংরেজির সঙ্গে শব্দ-সম্পদে পাল্লা দিতে পারে এমন ভাষা পৃথিবীতে নেই। ফরাসি ভাষা বিদেশি শব্দ গ্রহণে অত্যন্ত বিমুখ, তাই ফরাসি ভাষা ইংরেজির তুলনায় গরিব। পণ্ডিতজি উদারচিত্ত, গভীর দৃষ্টি দিয়ে হৃদয়ঙ্গম করেছেন ভারতবর্ষের আদর্শ কী, সে আদর্শে পৌঁছতে হলে কী প্রকারের ভাষার প্রয়োজন।
