এখন হাওয়া বদলেছে অথবা দু তিন বৎসরের ভিতরই হাওয়া বদলাবে। শুনেছি, পণ্ডিতজি নাকি আপনোস করে বলেছেন, বিদেশি বিভাগের জন্য, যথেষ্ট পরিমাণে উপযুক্ত লোক পাওয়া যায়নি। বিবেচনা করি, ভাষা বাবদে ভারতীয়েরা যে অন্যান্য দেশের তুলনায় কতটা পশ্চাৎপদ, সে খবর পণ্ডিতজির কাছে অজানা নয়।
এস্থলে একটি বিষয় সবিস্তর নিবেদন করি। পররাষ্ট্র বিভাগ ও বিদেশের রাজদূতাবাসের জন্য কর্মচারী নিযুক্ত করবার সময় প্রধানত দেখা হয় প্রার্থী কয়টি ভাষা জানে। উপস্থিত একই প্রার্থী ফরাসি, জর্মন, উভয় ভাষাই জানে এরকম লোক পাওয়া যায়নি। তাই এখন কোন নীতির মাপকাঠি মেনে চাকরি দেওয়া হচ্ছে জানিনে। তার মানে নানারকম সন্দেহ আছে সেগুলো প্রকাশ করলে সরকারের বিরাগভাজন হবার সমূহ সম্ভাবনা।
তা সে যাই হোক, কিন্তু একথা নিশ্চয় জানি, বিশ-ত্রিশ বৎসর পরে সম্পূর্ণ নতুন পরিস্থিতির উদ্ভাবনা হবে। আজ যেসব ভারতীয় রাজদূত প্যারিস, জিনিভা, চিলি, মস্কোতে আছেন, তাঁদের ছেলে-মেয়েরা বিদেশি ভাষা শিখছে। এসব রাজদূতেরা আবার ঘন ঘন বদলি হন। আজ যিনি পিকিং-এ কাল তিনি ওসলোতে, তিন বৎসর পর তিনি রোমে, পাঁচ বৎসর পর তিনি হয়তো হেলসিঙ্কিতে। তাই তাঁর ছেলে-মেয়েরা দশ-বারো বৎসরের ভিতর গোটা চার-ছয় ভাষাতে সড়গড় হয়ে যায়। বিশ-ত্রিশ বত্সর পর এরা চাকরির বাজারে নামবে।
যে ছেলে সমস্ত ছাত্রজীবন কলকাতা বা বর্ধমানে কাটাল, সে ভাষা বাবদে যতই মেধাবী হোক না কেন, তার পক্ষে সম্পূর্ণ অসম্ভব উপযুক্ত রাজদূতের ছয় ভাষা জাননেওয়ালা ছোকরার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ফরেন আপিসে বা বিদেশি রাজদূতাবাসে চাকরি পাওয়া। তাই বিশ-ত্রিশ বৎসর পরে সেইসব পরিবারের ছেলেরাই এসব চাকরি পাবে, ভবিষ্যতের জন্য তাবৎ বিদেশি চাকরি এবং ফরেন আপিস সেইসব প্রদেশের একচেটিয়া হয়ে যাবে। বাঙালিরা যদি এখন এসব চাকরিতে কিছুটা না ঢুকতে পারে, তবে বিশ-ত্রিশ বৎসর পরে তার পক্ষে নাসিকাগ্র ঢোকানোও সম্পূর্ণ অসম্ভব হবে।
পরিস্থিতিটার যে বর্ণনা দিলুম সেটা কাল্পনিক নয়। অন্যান্য সব দেশের পররাষ্ট্র দপ্তরের বেলায় যা আমাদের বেলাও তাই।
তাই বলি, সাধু এখন থেকেই সাবধান। বাঙালি যদি এই বেলা কলকাতাতে বিদেশি ভাষা শেখাবার ব্যাপক ব্যবস্থা না করে, তবে আপন ঘুম ভাঙলে দেখতে পাবে, দিল্লির কৃপায় এক খানদানি চক্করের সৃষ্টি হয়েছে এবং সে চক্রব্যুহ ভেদ করা তখন আর বাঙালির পক্ষে সম্ভবপর হবে না।
পাঠক হয়তো বলবেন, এই আড়াইখানি চাকরির জন্য অত চেল্লাচেল্লি করছ কেন?
আড়াইখানা চাকরির কথাই শেষ কথা নয়। ফরেন আপিস ও বিদেশে স্থাপিত অগুনতি রাজদূতাবাস যে কী বিশাল শক্তি ধারণ করে, তার খবর বেশির ভাগ লোকই জানে না। কারণ এদের ক্রিয়াকলাপ আইনত গোপনীয় –স্ট্রিক্টলি কফিডেনশিয়াল। যখন এদের নীতি এবং কর্মপদ্ধতি অত্যন্ত ন্যক্কারজনক হয়ে যায়, তখন হঠাৎ কোনও কোনও সময় কেলেঙ্কারি কেচ্ছা ছড়িয়ে পড়ে। কেটোর গিল্টিমেন যারা পড়েছেন তাঁরা জানেন, একমাত্র লন্ডন ফরেন আপিস গত যুদ্ধের জন্য কতটা দায়ী।
বাঙালি যদি গবেট না হত ফরেন আপিসে তাদের স্থান করার জন্য আমাদের এত কান্নাকাটি করার প্রয়োজন হত না।
তাছাড়া, ভারতীয় সভ্যতা বৈদগ্ধ্যের প্রতিভূ হওয়ার জন্য বাঙালির হক অনেকের চেয়েও বেশি। ভারতবর্ষ মহাত্মা গান্ধীর দেশ, রবীন্দ্রনাথের দেশ। এঁদের বাণী বিদেশে প্রচার করার হক এঁদের মাতৃভাষার সঙ্গে যারা সুপরিচিত তাঁদের কিছুটা আছে বৈকি! তাই প্রশ্ন, দিল্লির ফরেন আপিসে আমরা এ যাবৎ কটি স্থান পেয়েছি? এবং ভবিষ্যতে যাতে পাই, তার জন্য কলকাতার কী ব্যবস্থা করেছি? বিশ্ববিদ্যালয় কী করছেন?
[মাসিক বসুমতী]
.
জাতীয় মহাশঙ্খের স্বরূপ
ভারতবর্ষের রাষ্ট্রভাষা হিন্দি অথবা হিন্দুস্থানি (অথবা অন্য যে কোনও নামেই ডাক না কেন। হবে একথা পণ্ডিত জওয়াহরলাল নেহরু (এস্থলে বাঙালি পাঠককে জানিয়ে দেওয়া প্রয়োজন মনে করি যে, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নাম আমরা এখনও ঠিক বানান করতে শিখিনি। এ বড় পরিতাপের বিষয়। পণ্ডিতজির নাম জওহর নহে– যদিও তাঁর নাম এই শব্দেরই রূপান্তর। পণ্ডিতজির নাম জওয়াহির_ দেবনাগরী অক্ষরে জবাহির বা জবাহর লেখা হয় এবং এই শব্দটি প্রাচীন পত্নবি শব্দ জওহরের বহু বচন। কথাটা আসলে গওহর কিন্তু আরবি ভাষাতে গ অক্ষর নেই বলে আরবরা তৎপরিবর্তে জ অক্ষর ব্যবহার করে। জওহর শব্দের অর্থ মূল্যবান প্রস্তর কিন্তু আসল অর্থ essence অথবা নির্যাস। পণ্ডিতজির নাম জওয়াহির বলেই ইংরেজিতে Jawahar লেখা হয়– Jawhar লেখা হয় না। এস্থলে অবশ্য প্রশ্ন উঠতে পারে যে, যদি হিন্দিতে জবাহির লেখা হয়, তবে ইংরেজিতে পণ্ডিতজি Jawahar না লিখে Jawahir লেখেন কেন? তার কারণ, সর্বশেষ স্বরবর্ণটি এতই হ্রস্ব যে, তার উচ্চারণ ঠিক না a শোনা যায় না বলে a ব্যবহার করা হয়েছে– অবশ্য আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী i হরফটি ব্যবহার করাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত) বহু উপলক্ষে প্রকাশ করেছেন এবং এ সম্পর্কে যেসব মূল্যবান অভিমত প্রকাশ করেছেন, সেগুলো আমাদের সকলেরই ভেবে দেখা উচিত।
কিন্তু আমাদের অর্থাৎ সাধারণ বাঙালির প্রধান বিপদ এই যে, হিন্দি, হিন্দুস্থানি এবং উর্দু– এই তিন ভাষার ভিন্ন ভিন্ন রূপ কী, সে সম্বন্ধে আমাদের স্পষ্ট ধারণা নেই। মোটামুটি জানি যে, হিন্দি দেবনাগরী অক্ষরে লেখা হয়, আর উর্দু আরবি বা ফারসি অক্ষরে। কিন্তু এই হিন্দুস্থানি বস্তুটি কী, এবং সেটি লেখা হয় কোন অক্ষরে?
