জানি, কেহ কেহ সস্তায় দেশের জনসাধারণের মন কাড়িবার জন্য কাজের ভান করিয়াছিলেন, অথবা যেখানে ভান করিতে সক্ষম হন নাই, সেখানে ঈষৎ কাজ করিয়াছিলেন। কিন্তু এ-ও জানি, তাঁহাদের বিরুদ্ধ-আন্দোলনের ফলেই বহু দেশপ্রেমিককে বহু কষ্ট সহ্য করিতে হইয়াছিল– সেকথা ভুলি নাই, ভুলিবার ইচ্ছাও রাখি না। তবে সে বিচারের দিন এখনও আসে নাই।
তার পর ছিন্নভিন্ন কর্মীদের মধ্যে অবসাদের যুগ আসিল। পলায়িত, পুলিশতাড়িত হঁহারা এই গৃহে ওই গৃহে আশ্রয় খুঁজিলেন। আমরা অধঃপাতের শেষ সীমায় পৌঁছাই নাই বলিয়া ইঁহারা আশ্রয় পাইলেন। কিন্তু তখন তাঁহাদের উদ্যমহীন ভগ্ন জীবন দেখিয়া অন্তরে অন্তরে কী যাতনাই না ভোগ করিয়াছি। এক বন্ধুকে বলিয়াছিলাম, তুমি তো এককালে ভালো কবিতা লিখিতে, লেখো না দুই-একটি; আমার বাড়িতে কি অমনি অনুধ্বংস করিবে? মনে আছে আমার রুগুণ বন্ধু ঈষৎ হাসিয়া বলিয়াছিলেন, তোর বাড়ি দেখি জেলের চেয়েও খারাপ। জেলেও তো সরকার বিনা পয়সায় খাইতে দেয়, তুই যে কবিতা চাস। না হয় তার বাগানে জল ঢালিয়া দিব। আশ্চর্য হইলাম, মাসের পর মাস গ্রাম হইতে গ্রাম অনশনে, পথশ্রান্তিতে, মানসিক উদ্বেগে কাটাইয়াও তাহার সেই বিমল রসিকতা করিবার ক্ষমতাটি যায় নাই। আশা আছে; তাহা হইলে আশা আছে–ইহাদের মেরুদণ্ড কোনও রাজদণ্ড খণ্ড খণ্ড করিতে পারিবে না। ইহাদের অবসাদ ক্ষণিক, ইঁহাদের স্থিতি মায়া, মিথ্যা। ইঁহারা আবার অগ্রসর হইবেন।
এখনও আমাদের আত্মজনরা কারাগারে আছেন। নিষ্কৃতি তাহারা পাইবেন কিন্তু তাহা মুক্তি নহে। তাহাদিগের মুক্তি দানের সম্মান আমাদের হাতে ছিল; আমরা খোয়াইয়াছি।
বোম্বায়ের সম্মেলনে ইহাদের অশরীরী সত্তা উপস্থিত থাকিবে। আমরা যেন এমন কিছু না বলি বা করি যাহাতে তাঁহাদের মনে আঘাত লাগে অথবা তাহাদের কর্তব্যবোধের বিপক্ষে যায়। নিষ্কৃতিপ্রাপ্ত কর্মীরা হঁহাদের সঙ্গে এতদিন কারাগারে কাটাইয়াছেন। তাহাদের কপালে কারাগারের লাঞ্ছনা-লাঞ্ছন অঙ্কিত, তাহারাই ইহাদের চিনেন; তাহারাই যেন সেখানে প্রধান হোতা প্রধান বক্তা হন।
আর যাহারা অগ্রদানী হইয়াছিল, তাহারা যেন সে সভায় প্রবেশাধিকার না পায়।
আর যাঁহারা পুণ্যলোকে চলিয়া গিয়াছেন, যেখানে রাজায়-প্রজায় ভেদ নাই, যেখানে আলিপুর, দমদম নাই, যেখানে পূজার থালাতে ভাইয়ের রক্ত ছিটাইবার লোক নাই, সেখানে হইতে তাঁহাদের আত্মা এই সম্মেলনের কর্মকর্তাগণকে শুভবুদ্ধি দান করুন।
[দেশ পত্রিকা, ২২.৯.১৯৪৫]
.
একদা যাহার বিজয় সেনানী
দিল্লি যে অত্যন্ত দূর অস্ত সে খবর প্রবাদবাক্যের ভিতর দিয়ে আমরা বহুকাল পূর্বেই জানতুম। সে খবর নতুন করে হৃদয়ঙ্গম করলুম যখন সেদিন শুনতে পেলুম দিল্লিতে ভারতীয় পররাষ্ট্র বিভাগ এবং বিদেশে ভারতীয় রাজদূতাবাসের কর্মচারীদের জন্য ব্যাপক শিক্ষাব্যবস্থা হয়েছে এবং হচ্ছে। দিল্লি দূর অস্তৃ বলেই খবরটা এত দেরিতে পৌঁছল।
দিল্লি, বোম্বাই, মাদ্রাজ সব বিষয়েই কলকাতাকে ছাড়িয়ে যাক, তাতে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। কিন্তু শিক্ষাদীক্ষায় ভারতবর্ষের কোনও শহর কলকাতাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে বা শিগগিরই যাবে, এ সংবাদ শুনলে আমার চিত্ত অধীর হয়ে ওঠে। এই ব্যাকুলতাকে অবাঙালিরা নাম দিয়েছেন প্রাদেশিক সংকীর্ণতা, দেমাক মবারি। হবেও বা। কোনও গুণ নাই লেখকের কর্ণে যে এসব কটুকাটব্য মধু বর্ষণ করে, সেকথা বসুমতীর পাঠক নিশ্চয়ই এতদিনে ধরে ফেলতে পেরেছেন। জিন্দাবাদ ইস কিসমকি সংকীর্ণতা।
অর্ধশিক্ষিত কাবুলিরা বলে, কাবুল বে-জর শওদ, লেকি বে-ব ন বাশদ অর্থাৎ কাবুল স্বার্থহীন হোক আপত্তি নেই, কিন্তু বরফহীন যেন না হয়। কারণ কাবুলিরা জানে, বরফ-গলা জল না পেলে গম ফসল ফলবে না, আর শুধু সোনা চিবিয়ে মানুষ বাঁচতে পারে না। কলিকাতা শিক্ষাদীক্ষায় অন্তত কাবুলের চেয়ে শ্রেয়ঃ, তাই বলি কলকাত্তা বে-জর শওদ, লেকিন বে-ইলম ন বাশদ। কলকাতা স্বর্ণহীন হোক আপত্তি নেই (যেটুকু স্বর্ণ আছে তা-ও তো বাঙালির হাতে নয়), কিন্তু বিদ্যাহীন যেন না হয়।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বীজমন্ত্র Advancement of learning। শুনেছি, ভারতের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের অন্ধানুকরণ করতে চান না বলে Learning কথাটার এল হরফটি বাদ দিয়ে মৌলিকতা এবং নিজস্বতা বজায় রেখেছেন। তাঁদের Earning-ও জিন্দাবাদ!
দিল্লিতে যে নতুন শিক্ষার ব্যবস্থা হয়েছে তার প্রধান অঙ্গ নানা বিদেশি ভাষা শিক্ষা দেওয়া। বিবেচনা করি, এই শিক্ষার ফলে একদিন দিল্লিতে বহু ভাষা শিক্ষার আবহাওয়া নির্মিত হবে এবং ফলে চাকরি পাবার পরীক্ষায় বাঙালি ছেলেরা হেরে যাবে।
অথচ এই কলকাতাতেই বহুবার বহু চেষ্টা হয়েছে ফরাসি জর্মন ইত্যাদি ভাষাকে ব্যাপকভাবে চালু করবার। বিশ্ববিদ্যালয়, Y.M.C.A., সিনজেভিয়ার আমারই জানা মতে বহুবার ফরাসি জর্মনের নৈশ বিদ্যালয় খুলেছেন, ততোধিকবার বন্ধ করেছেন। বাঙালি ছেলের মন পাননি বলে।
আর সবাই তাই নিয়ে বাঙালি ছেলেকে বিস্তর কড়া কথা বলেছেন কিন্তু আমরা বলিনি। কারণ বাঙালি ছেলে যদিও আর পাঁচটি ছেলের তুলনায় জ্ঞানান্বেষণ করে বেশি, তবু তারও তো একটা সীমা আছে। তার ওপর আরেকটি তত্ত্বও ভুললে চলবে না। বাঙালি ছেড়ে স্বর্ণলোভী নয়, কিন্তু অন্নবস্ত্রের প্রয়োজন তারও আছে। ফরাসি, জর্মন তাকে এতদিন চাকরির পথে কোনও সুবিধা করে দিতে পারতেন না।
