কারণ, এই জাগরণই কি সত্য নয়? এই জাগরণের পুরোভাগে থাকিয়া যাহারা প্রাণ দিলেন তাহারা কি স্বরাজ পান নাই? তাঁহাদের আত্মা অবিনশ্বর-লোকে যায় নাই? রাজার রাজা যিনি তাঁহার ক্রোড়ে কি তাহারা আসন পান; স্বরাজ যেদিন আসিবে সেদিন দুই মুষ্টি অন্ন হয়তো বেশি পাইব; হয়তো রমণীরা আরও বেশি অলঙ্কার পরিবেন; হয়তো পণ্ডিতেরা আরও বেশি পুস্তক লিখিবেন, হয়তো বিসূচিকায় কম প্রজা মরিবে, কিন্তু মুখ্য যাহা পাইব তাহা তো স্বাধীনতা; এবং নিশ্চয়ই জানি সে স্বাধীনতার প্রথম যুগে ধ্বস্ত-বিধ্বস্ত দেশকে। গড়িতে গিয়া আমাদিগকে অনেক দুঃখ অনেক দৈন্য সহ্য করিতে হইবে। কিন্তু তবুও যাহা আসিবে তাহা স্বরাজ।
সেই স্বরাজ কি তাহারা পান নাই– যাহারা প্রাণ দিলেন, যাহারা কারাগারে উৎপীড়িত হইলেনঃ জাগ্রত হইয়া মরিবার পূর্বে যে কয়দিন, যে কয় দণ্ড তাঁহারা বাঁচিয়াছিলেন, তাঁহাদের হৃদয়ে তাহাদের মনে, তাহাদের সর্ব অস্তিত্বে, সর্বচৈতন্যে তো তখন স্বরাজ। তখন তাহারা পুলিশের এ আইন মানেন নাই, কানুন ভাঙিয়াছেন, রাজাকে উপেক্ষা করিয়াছেন, রাজপুরুষের হুঙ্কারের সম্মুখে অট্টহাস্য করিয়াছেন। তাঁহারা তো তখন দেহমনে মুক্ত পুরুষ। তাঁহারা তো চলিয়াছেন, চলার পথে
নানা শ্ৰাস্তায় শ্রীরস্তি ইতি রোহিত শুশ্রুম।
পাপো নৃষদ বরো জনঃ ইন্দ্ৰ ইচ্চরতঃ সখা ॥
চরৈবেতি, চরৈবেতি।
চলিতে চলিতে যে শ্রান্ত তাহার আর শ্রীর অন্ত নাই, হে রোহিত এই কথাই চিরদিন শুনিয়াছি। যে চলে, দেবতা ইন্দ্রও সখা হইয়া তাহার সঙ্গে সঙ্গে চলেন। যে চলিতে চাহে না, সে শ্রেষ্ঠ জন হইলেও সে ক্রমে নীচ (পাপী) হইতে থাকে, অতএব অগ্রসর হও, অগ্রসর হও।
পুস্পিণৌ চরতো জজ্ঞো ভুরাআ ফলগ্রহিঃ
শেরেহস্য সর্বে পাপমানঃ শ্রমেণ প্রপথে হতাঃ ॥
চরৈবেতি, চরৈবেতি।
যে চলে, দেহের দিক হইতেও তাহার অপূর্ব শোভা পুষ্পের মতো প্রস্ফুটিত হইয়া উঠে, তাহার আত্মা দিনে দিনে বিকশিত হইতে থাকে; এই তো মস্ত ফল। তার পর তাহার চলার শ্রমে চলিবার মুক্ত পথে তাহার পাপগুলি আপনিই অবসন্ন হইয়া শুইয়া পড়ে। অতএব, অগ্রসর হও, অগ্রসর হও।
চরন বৈ মধু বিন্দতি চরন্ স্বাদুমৃদুম্বর
সূর্যস্য পশ্য শ্ৰেমাণং যো না তন্দ্রয়তে চরন ॥
চরৈবেতি, চরৈবেতি।
চলাই হইল অমৃত লাভ, চলাই তার স্বাদু ফল, চাহিয়া দেখ ওই সূর্যের আলোকসম্পদ যিনি সৃষ্টির আদি হইতে চলিতে চলিতে একদিনের জন্যও ঘুমাইয়া পড়েন নাই। অতএব অগ্রসর হও, অগ্রসর হও। (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ; ভারতের সংস্কৃতি, পৃ. ১৩। ৪)
চলা ও পৌঁছা সে মৃত্যুঞ্জয় বীরদের এক হইয়া গিয়াছিল। কে বলিবে তাঁহারা শুধু কর্মই করিয়াছিলেন, ফল পান নাই। স্বাধীন জাতি যে আনন্দ ভোগ করিবার সুযোগ কখনও পায় না– অধীনতা হইতে স্বাধীনতা অর্জনের যে আনন্দ, বিরহের পর রাধার কৃষ্ণমিলনের যে আনন্দ– সেই আনন্দ সেই অমৃত মৃত্যুক্ষণে তাঁহারা পান করিয়া অমর হইলেন।
আর যাঁহারা অধর্ম অন্যায়ের স্বহস্তনির্মিত কারাগারের পাষাণ-প্রাচীরের অন্তরালে সঙ্গীহীন বন্ধুহীন কর্মহীন জীবনযাপন করিলেন, তাহারা তো আরও নমস্য। স্বরাজ তাহারা কারারুদ্ধাবস্থায় অন্তরে অন্তরে হারাইলেন না তাহাদের আত্মত্যাগ রুদ্ধগতি অন্তর্মুখী হইয়া পর্বতকরে আবব্ধ বর্ষার স্রোতের মতো ফুলিয়া ফুলিয়া স্ফীত হইয়া তাঁহাদিগকে ভবিষ্যৎ সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করিল, তাহা অন্তর্যামীই জানেন। এই মাত্র বলিতে পারি, কর্তব্যকর্ম উপেক্ষা না করার যে বিবেকানন্দ, তাহা তাঁহারা সকলেই পাইয়াছেন– আজ যাঁহারা নষ্ট স্বাস্থ্য, ভগ্নোৎসাহ, হৃতআদর্শ হইয়াও নিষ্কৃতি পাইয়াছেন, তাঁহারাও তো কিয়ঙ্কালের জন্যও পরমহংস হইয়াছিলেন। আজ যদি তাহাদের কেহ কেহ নির্জীব, প্রাণহীন হইয়া থাকেন, তবে তাহার জন্য দায়ী কে? দায়ী আমরা। আমরা যাহারা তখন উঠিয়া দাঁড়াই নাই, সে রাজাধিরাজদের হাত ধরিয়া সম্মুখে চলি নাই, আমরা যাহারা ক্ষুদ্র স্বার্থের লোভে, ক্ষুদ্র ভয়ের ভকুটিতে গৃহকোণে আশ্রয় লইয়াছিলাম। শ্যামল নির্মল কোমল উত্তরীয় বিছাইয়া নিদ্রালস নয়নে দেখিলাম প্রসারিত হস্ত আমাদিগকে স্পর্শ করিয়া চলিয়া গেল, শুনিলাম চরৈবেতি, চরৈবেতি, কিন্তু উঠিলাম না। তবু জানি, সে হস্ত আমাদের আশীর্বাদ করিয়াছিল– তাহারা তো স্বরাজ পাইয়াছেন; এই পাপীদের জন্যই তো তাঁহাদের আত্মদান, বলিদান।
কারাগারে কি প্রতিদিন প্রতিক্ষণ তাঁহারা অপেক্ষা করেন নাই, আশা করেন নাই যে, আমরা, তাঁহাদের ভ্রাতা-বন্ধুরা তাহাদের দেবত্বের এক কণাও অন্তত পাইয়াছি? বিদেশি রাজের দয়ায় যেন একদিন তাঁহাদের নিষ্কৃতি পাইতে না হয়। তাঁহারা কি আশা করেন নাই যে, একদিন আমরা তাঁহাদিগকে মাথার মণি করিয়া বাহিরে লইয়া আসিব? এখনও যাহারা মুক্তি পান নাই, তাঁহাদের জন্যই বা আমরা কী করিতেছি।
তার পর আসিল দুর্ভিক্ষ। তাঁহাদের অভাব আমরা যে তখন কী নিদারুণভাবে বুঝিয়াছিলাম, তাহা বাংলা দেশ কখনও ভুলিবে না। অন্নাভাবে মরিল বহু লোক, কিন্তু তাহারও বেশি লোক মরিল প্রয়োজনীয়, উপযুক্ত সংগঠনের অভাবে। এক বিদেশি তখন আমাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, কোটি কোটি জনগণের মধ্যে সামান্য যে কয়টি দেশসেবক জেলে আছেন, তাঁহারা ছাড়া দেশে কি অন্য কর্মী নাই? শিরে করাঘাত করিয়া বলিয়াছিলাম, নাই, এই হতভাগা দেশে ভগবান যে-কয়টি মানুষ নির্মাণ করেন, তাহাদিগকে তিনি সর্বগুণই অকৃপণভাবে ঢালিয়া দেন। তাহাদের কেহ কবি, কেহ চিত্রকর, কেহ দার্শনিক, কিন্তু সকলেই সেসব গুণ উপেক্ষা করিয়া দেশসেবাকে প্রধান স্থান দেন। কবিকে কবি বলিলে কবি লজ্জিত হন, দার্শনিককে দার্শনিক বলিলে তিনি আর বন্ধুর মুখদর্শন পর্যন্ত করিতে চাহেন না; তিনি হয় হইতে চান স্বাধীনতা জেহাদের সিপাহি নতুবা শহিদ। কাব্যে-দর্শনে যেসব কৃতিত্ব পূর্বে দেখাইয়াছিলেন, সেগুলিকে অবান্তর, অপরিপক্ক বালসুলভ চপলতা বলিয়া ধিক্কার দেন, বিদেশিকে বলিয়াছিলাম, ইঁহারাই আমাদের সাত রাজার ধন মানিক, সর্পের মণি! মণি অপেক্ষা সর্প অনেক বৃহৎ, কিন্তু মণিহারা ফণী, আর আমাদের দেশপ্রেমী কর্মী ব্যতীত দেশ একই অভিসম্পাত।
