আমরা তো হেসেই খুন। গাধাকে পিটলে ঘোড়া হয় না, সেকথা তো সবাই জানতুম, কিন্তু ঘোড়াকে পিটলে যে সে গাধা হয়ে যায় এটা বড়বাবুর আবিষ্কার! আর জগদানন্দ দাদার সঙ্গে গাধা শব্দের মিল শুনে আমাদের খুশি দেখে কে?
জগদানন্দবাবু মনের দুঃখে সেদিন থেকে কানমলা ছেড়ে দিয়েছিলেন।
[আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৪.৯.১৯৪৫]
ভাষা সংস্কৃতি সাহিত্য
ঐতিহ্য
হটেনটট এবং ভারতবাসীতে পার্থক্য কোথায়?
শিক্ষাবিদ পণ্ডিতেরা সমস্বরে বলেন, কোনও পাথর্কই নেই। উত্তম বাতাবরণে রেখে উপযুক্ত শিক্ষা দিলে প্রাপ্তবয়স্ক হটেনটট ও ভারতীয়ে কোনও পার্থক্য থাকে না।
কিন্তু ঐতিহাসিক বলেন, পার্থক্য বিলক্ষণ আছে। হটেনটট যখন তার শিক্ষাদীক্ষা সমাজ এবং রাষ্ট্রনির্মাণে নিয়োগ করে, তখন পদে পদে তার কাছে ধরা পড়ে, যে ঐতিহ্য যে সংস্কৃতির ওপর নির্ভর করে উন্নত সমাজ আগুয়ান হয়, তার সে ঐশ্বর্য নেই। এবং নেই বলে তাকে যে প্রতি সমস্যায় অন্য সংস্কৃতি থেকে ধারই শুধু করতে হয় তা নয়, তার সম্পূর্ণ ক্ষমতার সর্বাঙ্গীণ বিকাশ দিতেও সে তখন অসমর্থ হয়।
দৃষ্টান্ত দিলেই কথাটা সরল হয়ে যায়। বেদ উপনিষদের ঐতিহ্য না থাকলে রবীন্দ্রনাথের পক্ষে বিশ্বকবি হওয়া সম্ভবপর হত না, যোগচর্চার ঐতিহ্য না থাকলে শ্রীঅরবিন্দ সাধনার সর্বোচ্চ স্তরে উঠতে পারতেন না। শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ধ্যানৈশ্বর্য না পেলে বিবেকানন্দ বিশ্বজনকে মোহিত করতে পারতেন না। বৈষ্ণবধর্মের বিশ্বপ্রেম এদেশে না থাকলে মহাত্মাজি যুযুৎসু-ইংরেজকে অহিংস পদ্ধতিতে পরাজিত করতে পারতেন না।
যুগ যুগ সঞ্চিত আমাদের এই যে ঐতিহ্য, একে অবহেলা করেই ইংরেজ তার আপন শিক্ষাপদ্ধতির বিকৃত অনুকরণ এদেশে বিস্তার করেছিল। যে সম্পদে আমাদের গৌরব, ইংরেজ সে সম্পদ আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেনি, ধরলে আজ আমরা এতদূর আত্মবিস্মৃত হতুম না।
শুধু তাই নয়, সংস্কৃত-চর্চা যদি শুধু ইংরেজের স্কুল-কলেজেই সীমাবদ্ধ থাকত, তা হলে আমাদের ঐতিহ্যের পনেরো আনা এতদিন লোপ পেয়ে যেত। কলিকাতা, মাদ্রাজ, বোম্বাই বিশ্ববিদ্যালয় আজ পর্যন্ত কয়খানা সংস্কৃত বই প্রকাশ করেছে, তার সঙ্গে এক নির্ণয়সাগর প্রেসের তুলনা করলেই ইংরেজ স্থাপিত বিদ্যায়তনের দৈন্য ধরা পড়ে। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে ইংরেজের অবহেলা, ইংরেজ রাজত্বের অর্থনৈতিক নিপীড়ন সত্ত্বেও আমাদের ভট্টপল্লি, কাশী, পুণা, মাদুরা এখনও লোপ পায়নি।
হটেনটটের সঙ্গে এখানেই আমাদের পার্থক্য। আমরা ভারতবর্ষে যে নবীন রাষ্ট্র নির্মাণ করতে যাচ্ছি, তার জন্য আমাদের ভাণ্ডারে আছে ঐতিহ্যগত অফুরন্ত সম্পদ। কিন্তু এই সম্পদ কাজে লাগাবার কোনও লক্ষণ তো কোথাও দেখতে পাচ্ছি না। রাষ্ট্রভাষা কী হবে, শিক্ষার মাধ্যম কী হবে সে নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের সংস্কৃতি এবং সে সংস্কৃতির প্রধান বাহন টোল-চতুম্পাঠী কী প্রকারে আমাদের প্রধান প্রধান শিক্ষায়তনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে আমাদের শিক্ষাকে ঐতিহ্যলোকমণ্ডিত সর্বাঙ্গসুন্দর করবে, তার তো কোনও লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি না।
জানি, শুধু টোল-চতুম্পাঠীর শাস্ত্রচর্চা নিয়ে বিংশ শতাব্দীর বিদ্যাচর্চা সম্পূর্ণ হয় না; কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা জানি, দেশের সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন শিক্ষা বৃহত্তর ভারতের ভবিষ্যৎ নাগরিক প্রস্তুত করতে পারবে না।
তথাকথিত প্রগতিপন্থিরা হয়তো বলবেন, অতীতের “জঞ্জাল” বাদ দিয়ে “মুক্ত মনে” অগ্রসর হও।
উত্তরে নিবেদন করি, ১৯১৯ সালে রুশও এই কথাই বলেছিল। অতীতের জঞ্জালকে বিসর্জন দিতে গিয়ে তখন সে যে শুধু ধর্মকে নিষ্পেষিত করেছিল তা নয়, টলস্টয় পুশকিন টুর্গেনিভের মতো লেখকের ঐতিহ্যও বাদ দিয়ে সে নতুন সংসার পেতেছিল। কিন্তু যেদিন জমনি তার সে সংসারে আগুন ধরাল তখন দেখা গেল, সে সংসার বাঁচাবার জন্য আগ্রহের বড়ই অভাব। তখন আবার খোলা হল গির্জাঘর, আবার ডাক হল অনাদৃত ঐতিহ্য-পন্থিদের, আবার চিৎকার করা হল পবিত্র রাশিয়ার (Holy Russia) নামে, আবার আহ্বান প্রচারিত হল টলস্টয়, পুশকিনের দেশকে বাঁচাবার জন্য।
রুশ সেদিন হুঙ্কার দিয়ে বলেছিল, জয়তু ইভান দি টেরিবল্। জয়তু ঐতিহ্যঘন মার্কস বলেনি।
ভারতবর্ষকে ঐক্যসূত্রে আবদ্ধ করবে কে? ভারতীয় ইতিহাসের সে ধারার সন্ধান কোথায়– যে ধারা বহু জাতি, বহু বর্ণ, বহু আর্য, বহু অনার্যকে এক করে নিয়ে বিশাল থেকে বিশালতর হয়ে বিশ্বমানবকল্যাণের সাগরসঙ্গমের দিকে বিজয়গর্জনে অগ্রসর হয়েছিল?
ঐতিহ্যগত সে সংস্কৃতিধারার সঙ্গে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি সংযুক্ত না হয়, তবে হটেনটটে-ভারতীয়ে কোনও পার্থক্য থাকবে না।
[দৈনিক বসুমতী]
.
’৪২-’৪৫
কেহ বলেন বিয়াল্লিশের আন্দোলন ফলপ্রসূ হয় নাই; কেহ বলেন আন্দোলন কংগ্রেসের ছিল না, ফলপ্রসূ হইল কি না তাহাতে কংগ্রেসের লজ্জিত বা মর্মাহত হইবার কিছুই নাই; কেহ বলেন,, আন্দোলন কংগ্রেসেরই এবং বহু দেশপ্রেমিক তাহার সর্ব দায়িত্ব লইতে প্রস্তুত আছেন।
এসব তো তৈলাধার পাত্র ও পাত্ৰাধার তৈল লইয়া হাতিবাগানের নৈয়ায়িকদের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তর্ক। জিজ্ঞাসা করি, আগস্ট মাসে সমস্ত দেশব্যাপী জাগরণে যাহারা উদ্বুদ্ধ হইয়াছিলেন তাঁহারা কি উকিল ডাকিয়া আইন মিলাইয়া আন্দোলনে যোগ দিয়াছিলেন? মনে পড়ে বোম্বাই শহরের স্কুল-কলেজের ছেলেরা সেদিন উৎসাহের আবেগে কী কাণ্ডটাই না করিয়াছিল। যাহা কিছু করিয়াছিল, তাহার কোনওটাই হয়তো স্বরাজের পথ সুগম করিয়া দেয় নাই, পক্ষান্তরে হয়তো স্বরাজ সাধনার পথে অন্তরায় ছিল, কিন্তু সেই রাসায়নিক বিশ্লেষণই তো শেষ কথা নয়। গরুড়ের ক্ষুধা লইয়া মানুষ যখন জাগে, তখন কি তার খাদ্যাখাদ্য বিবেচনা বোধ থাকে। কিন্তু ক্ষুধাকে নমস্কার করি, সেই জাগরণকে দেশের চরম মোক্ষ বলিয়া জানি, স্বরাজ আজ পাইলাম অথবা দশ বৎসর পরেই পাইলাম। ভুলিলে চলিবে না যে কংগ্রেস পূর্ণ অখণ্ড ভারতবর্ষের মুখপাত্র। কংগ্রেসের আন্দোলন দেশের আন্দোলন, ও স্বরাজ লাভের জন্য দেশের জনসাধারণের ব্যাপক আন্দোলন মাত্রই কংগ্রেসের আন্দোলন সে স্বতঃস্ফূর্তই হউক আর ধৈর্যচ্যুতিবশতই হউক।
