যতদূর মনে পড়িতেছে, হৃতগর্ব মোগল সম্রাট রফি-উদ্-দরজাতের সময় পর্যন্ত বৎসর বৎসর মির উল হাজ সরকারের পক্ষ হইতে অর্থ লইয়া মক্কা যাইতেছেন। মিরাত-ই-অহমদি নামক ফারসিতে লিখিত গুজরাতের ইতিহাসে এই সম্বন্ধে অতি চিত্তাকর্ষক বর্ণনা আছে। পুস্তকখানির লেখক আলি মহম্মদ খান গুজরাত সুবার দেওয়ান বা রাজস্বসচিব ছিলেন। তখনকার দিনে রাজনীতি ও ধর্মনীতি অঙ্গাঙ্গীভাবে বিজড়িত ছিল বলিয়া এই অর্থব্যয়কে অপব্যয় মনে করা হইত না। আজও পৃথিবীর যেকোনো এম্বেসি বিদেশে ইহা অপেক্ষা বেশি অর্থের অপব্যয় করেন।
ভারত যদি আজ স্বাধীন হইত তবে আকরম খাঁ সাহেবের মতো মৌলানার ধর্মেচ্ছা সরকার সানন্দে পূর্ণ করিতেন। মৌলানা সাহেবকে মুখ খুলিয়া বলিবার প্রয়োজনই হইত না।
[আনন্দবাজার পত্রিকা ৬.১.১৯৪৫]
.
০৬.
লিখিতে মন চায় না। যেসব বন্ধুরা জেল হইতে খালাস পাইয়া আসিয়াছেন, তাঁহাদের অবস্থা দেখিয়া ও তাহাদের কারাকাহিনী শুনিয়া নিজের প্রতি ধিক্কার জন্মে, মনে হয় এই অর্থহীন প্রলাপের কী প্রয়োজন? জানি, সহৃদয় পাঠকবৃন্দ অধমের লেখা সহ্য করেন, কেহ কেহ পত্র লিখিয়া তাহাকে উৎসাহিত করেন, কিন্তু যেসব কাহিনী শুনি, নিষ্কৃতদের যে ভগ্নস্বাস্থ্য দেখি তখন সে কাহিনী, সে অবস্থা সত্যের লেখনী সংযোগে পাঠকের হৃদয়মনে সঞ্চারিত করিতে পারি না বলিয়া বহু বত্সরে যে সামান্য সাধনা-অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করিয়াছি, তাহা পণ্ডশ্রম বলিয়া ধিক্কার দিই।
নিষ্কতদের অভিজ্ঞতা এতই সহজ, এতই সরল যে, তাহা প্রকাশ করিতে গিয়া বাক্যালঙ্কার বিড়ম্বিত, মার্জিত লিখনশৈলী অপমানিত।
সহৃদয় পাঠক এই ক্ষুদ্র হৃদয়দৌর্বল্য মার্জনা করিবেন।
***
আমার এক বন্ধু যাহাকে বলে উন্নাসিক। অতি সদর্থে। তাঁহার জ্ঞানপিপাসা এতই প্রবল, দেশের মঙ্গলেচ্ছা এতই অনাবিল যে, বিদেশীয় কয়েকটি সাহিত্যসম্পদে গৌরবান্বিত ভাষা জানা সত্ত্বেও সেসব সাহিত্যের উত্তম উত্তম কাব্য-দর্শন পড়িবার তাঁহার সময় হইত না– নাটক-নভেল মাথায় থাকুন। তুলনামূলক রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি– তাহাদের ইতিহাস ইত্যাদি পড়িতে পড়িতে তাঁহার সময় ফুরাইয়া যাইত।
কারাপীড়নে অধুনা তিনি আর কিছুতেই চিত্তসংযোগ করিতে পরিতেছিলেন না বলিয়া (সেতারখানাও ফেরত পাঠাইয়াছিলেন) আমার কাছে True Story, Detective Story জাতীয় তরল বস্তু চাহিয়া পাঠাইয়াছিলেন। দুঃখে-সুখে মিশ্রিত হৃদয় লইয়া পাঠাই। খবর পাইলাম সদাশয়, I. B, সেগুলি এ যাবৎ তাঁহাকে দেন নাই। সরকারের এই কি ভয় যে, তিনি ডিকেটটিভ গল্প হইতে আণবিক বোমা বানাইবার কায়দা রপ্ত করিয়া সর্বজনীন দাঁতব্য কারাগার প্রতিষ্ঠান লণ্ডভণ্ড করিয়া দিবেন–না টু স্টরি হইতে আদিরসাত্মক গল্প পড়িয়া তাহার চরিত্রদোষ হইবে। সরকারের হেফাজতে যখন আছেন, তখন তাঁহার চরিত্র রক্ষা করা তো সরকার-গার্জেনেরই কর্ম!
***
আরেক বন্দি ছিলেন অরসিক। তিনি একখানা biology-র প্রামাণিক পাঠ্যপুস্তক চাহিয়া পাঠান। নামঞ্জুর। কয়েকজন রাজবন্দি একযোগে কারণটি অতি বিনয় সহযোগে জানিতে চাহিলেন। উত্তরটি অক্ষরে অক্ষরে তুলিয়া দিতেছি।
মশাই, আপনারা যে কখন কী চেয়ে বসেন, তার তো ঠিক-ঠিকানা নেই। আজ এ biology, কাল ও biology পরশু সে biology!
রাজবন্দিদের কেহ দার্শনিক, কেহ ঐতিহাসিক, কেহ নৃতত্ত্ববিদ। সকলেই হতবুদ্ধি; ব্যাপারটা না বুঝিতে পারিয়া একে অন্যের মুখের দিকে তাকান। Biology যে আবার পঁচিশ কেতার হয় তাহা তো তাঁহারা কখনও শুনেন নাই!
রহস্য সমাধান হইল; I. B. নৈরাশ্যের দরদীয়া সুরে বলিলেন, কোনদিন যে শেষটার গান্ধীর biology চেয়ে বসবেন না তারই বা ভরসা কোথায়? তখন আমি কোথায় যাই বলুন তো?
I. B. বিদ্যাসাগর biology ও biography-তে মিশাইয়া ফেলিয়াছেন।
গুরু সাক্ষী, ধর্ম সাক্ষী, দোষ দিতেছি না। অত পাণ্ডিত্য না ধরিলে বড়কর্তা I. B.-র সেনসর হইবেন কেন? ইহার চেয়ে অল্প বিদ্যায়ও আইনস্টাইনকে রিলেটিভিটি শিখানো যায়, অফিসারটিকে আমরা সবিনয় সাবধান করিয়া দিতেছি। তিনি যদি হুঁশিয়ার হইয়া না চলেন, তবে একদিন দেখিবেন যে, তাহার গভীর পাণ্ডিত্যের সম্মান রক্ষার্থে অক্সফোর্ডের বড়কর্তারা তাহাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টরের তখতে বসাইয়া দিয়াছেন।
আরেক বন্দি অতি সুপুরুষ। কাঁচা সোনার বর্ণ, ঢেউ খেলানো বড় বড় কালো চুল, খগের মতো নাক, আর দরাজি কপাল। যতদিন বাহিরে ছিলেন মাতা ও স্ত্রীর উৎপাতে মাঝে মাঝে দাড়ি কামাইতেন– অর্থাৎ মুখমণ্ডল ঘন-বর্ষার কদম্ব-পুষ্পের সৌন্দর্য ধারণ করিলে পর। জেলে গিয়া পরমানন্দে তিনি দাড়ি গজাইতে আরম্ভ করিলেন। সময় বিস্তর বাঁচিল, রাগ করিলে উৎপাটন করিবার সুলভ সহজ বস্তু জুটি–আর চিন্তা-বিক্ষোভের কারণ তো হামেশাই উপস্থিত হইবে।
জেলে যে অতি আরামে আছেন এই বুঝাইবার জন্য তিনি সর্বদাই পত্নীকে রসে টইটম্বুর পত্র লিখিতেন। তাহারই একখানাতে নিজের তরুণ দাড়ির বর্ণনা দিয়া বলিলেন, চেহারাটা এখন অনেকটা ক্রাইস্টের মতো হইয়াছে।
মহারানি ভিক্টোরিয়ার ইস্তেহারের কথা আমরা আর পাঁচজন প্রায় ভুলিয়া গিয়াছিলাম। সর্ব ধর্মে সকলের সমান অধিকার অথবা এইরকম কিছু একটা ঠিক মনে নাই।
