***
অত্যন্ত সাধারণ ব্যাপার, কিন্তু না বলিয়া থাকিতে পারিতেছি না। ট্রামে প্রায়ই দেখি অসম্ভব ভিড়, অথচ চারিটি মহিলা চারিটি লেডিজ-বেঞ্চে আরামে বসিয়া আছেন। বসুন, আপত্তি নাই। কিন্তু যদি চারিটি মহিলা দুইখান বেঞ্চিতে বসিতেন, তবে অন্তত মহিলা না আসা পর্যন্ত চারিজন বৃদ্ধ বা ক্ষুদ্র ওই খালি দুই বেঞ্চিতে বসিতে পারেন বা পারে। কোনও কোনও মেয়ে বলেন, ট্রামে-বাসে ছেলেরা অভদ্র; ছেলেরা বলিবে মেয়েরা নির্মম।
লক্ষ করিয়াছেন যে, আজকাল ট্রামে-বাসে ছেলে-বুড়ো কমিয়া গিয়াছেন। ইহারা কলিকাতার এক স্থান হইতে অন্য স্থানে যান কী প্রকারে, এখনও বুঝিয়া উঠিতে পারি না।
[আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৫.৯.১৯৪৫]
.
০৪.
মহাত্মা গান্ধী কয়েকদিন হইল কস্তুরবা স্মৃতিরক্ষা কমিটিতে বলেন, গ্রামের কুটিরগুলিতে আলোক স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা আনিবার জন্যই কস্তুরবা স্মৃতি ভাণ্ডারের উৎপত্তি। গ্রামের স্ত্রীলোকদিগকে মানসিক, দৈহিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা দেওয়া কর্তব্য। বনিয়াদি শিক্ষা বলিতে ইহাই বুঝায়। মহাত্মাজির প্রত্যেকটি কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য।
এই উপলক্ষে আমরা একটি বিষয়ের দিকে সকলের দৃষ্টি সবিনয় আকর্ষণ করি। যদি গ্রামে উপযুক্ত শিক্ষাবিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে কোনওপ্রকার কুটিরশিল্পও প্রর্বতন করা যায় তবে গ্রামের উৎপাদনী শক্তি ও সঙ্গে সঙ্গে ক্রয় করিবার ক্ষমতা বাড়িবে। তবে প্রশ্ন এই যে, শহরের উন্নত কলকজা দিয়া যেসব জিনিস প্রস্তুত হইবে তাহার সঙ্গে কুটিরশিল্প প্রতিযোগিতা করিতে পারিবে না। জাপান এই সমস্যার সমাধান করিয়াছিল গ্রামের কুটিরশিল্পের সঙ্গে শহরের কারখানার ঘনিষ্ঠ যোগস্থাপন করিয়া। অর্থাৎ যন্ত্ৰজাত মালের অনেক ছোট ছোট অংশ এমন আছে সেগুলি গ্রামে বসিয়া অবসর সময়ে হাত দিয়া তৈয়ারি করা যায় বিশেষ বিচক্ষণতা বা অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয় না। শহরের কারখানাই কুটিরকে কাঁচামাল ও টুকিটাকি যন্ত্রপাতি দেয় ও কারখানাই কুটিরে তৈয়ারি মাল সংগ্রহ করিবার ভার নেয়। কাজেই কুটিরশিল্পী এই ধান্দা হইতেও রক্ষা পায় যে গ্রামের বাজারে তাহার তৈয়ারি মাল কিনিবে কে? রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ভূতপূর্ব ডাইরেক্টার শ্রীযুক্ত মণিলাল নানাবটী এককালে জাপানে এই সমস্যা সমাধানটি বিশেষ করিয়া পরীক্ষা করিয়া এদেশে ফিরিয়া এ সম্বন্ধে বক্তৃতা করেন। বাংলা দেশের কয়েকজন যুবাকেও আমরা চিনি যাহারা বহু কলা শিখিয়া আসিয়াছেন। হয়তো তাঁহারাও এই বিষয়টি আলোচনা করিয়াছেন।
কস্তুরবা ফাণ্ডের অর্থ ব্যয় করিয়া শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে যদি কোনও কুটিরশিল্প প্রবর্তন করা হয় তবে তাহার জন্য আলাদা খবচ করিতে হইবে না। এইটি বিশেষ সুবিধা।
[আনন্দবাজার পত্রিকা ২২.৯.১৯৪৫]
.
০৫.
ছেলেবেলার একটি কবিতা মনে পড়িল, প্রাকশরতের বর্ণনা–
অনিচ্ছায় ভিক্ষা দেয় কৃপণ যেমতি
পড়ে জল সুবিরল সূক্ষ্মধার অতি।
সদাশয় সরকার যে কায়দায় রাজবন্দিদিগকে মুক্তি দিতেছেন, তাহাতেই কবিতাটি মনে পড়িল। সেদিন একজন অধুনা-নিষ্কৃতিপ্রাপ্ত রাজনৈতিক বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করিলাম, জেলে কীরকম দিন কাটিল? বলিলেন, প্রথম তিন বৎসর ভালই, কারণ মন স্থির করিয়া লইয়াছিলাম যে, সরকার যখন আর কখনও ছাড়িবেই না, তখন দুঃখে সুখে এইখানেই বাকি জীবনটা কাটাই। হঠাৎ দেখি সরকার ইহাকে ছাড়ে, উঁহাকে ছাড়ে। বন্ধু-বান্ধবীদিগের সঙ্গসুখ হইতে বঞ্চিত করিয়া সরকার একবার জেলে পুরিল, তার পর জেলের ভিতরে যাহাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হইল (তাহারাই তো প্রকৃত বন্ধু চাণক্য বলিয়াছেন, রাজদ্বারে যে সঙ্গে তিষ্ঠে সে বান্ধব, এ তো তারও বাড়া একেবারে ভিতরে, কারাগারে) তাহারাও একে একে চলিয়া যাইতে লাগিলেন। তখন দ্বিতীয়বার বন্ধুবিচ্ছেদ– ডবল জেল। খালাস পাইবার সময় আবার অনেক বন্ধুকে ফেলিয়া আসিয়াছি। এখন তেহারা জেলের সুখ পাইতেছি।
সরকারের অবৈতনিক মুখপাত্র হিসাবে বলিলাম, মেলা বন্ধুত্ব করা ভালো নয়। তোমাদের শঙ্কারাচার্যই বলিয়াছেন।
বন্ধু বলিলেন, বাড়ি গিয়া দেখি, মা একেবারে ভাঙিয়া পড়িয়াছেন। শয্যাগ্রহণ করিয়াছেন। শুনিলাম, প্রথম তিন বৎসর ঠিক পাড়া ছিলেন, কিন্তু শেষের একমাস আশা-নিরাশায় দুলিয়া, অপেক্ষা করার ক্লান্তিতে, কে কে খালাস পাইয়াছে, কে কে পায় নাই, তাহাদের সঙ্গে মিলাইয়া আমার মুক্তির সম্ভাবনা কতটুকু হিসাব করিতে করিতে একদিন শয্যাগ্রহণ করিলেন। সংস্কৃত প্রবাদটি বুঝিলাম যে, অধমের নিকট হইতে নিষ্কৃতি পাইয়াও সুখ নাই।
শুনিতে পাই বড় কর্তাদের কেহ কেহ নাকি বলিয়াছেন। পূজার পূর্বে অথবা পরে সকলেই খালাস পাইবেন। পূজার বিশেষ করিয়া পূজার পূর্বে ও পরে নিষ্কৃতিতে যে কী নিদারুণ পার্থক্য তাহা বুঝিবার মতো বাঙালি কি বড় দপ্তরে কেহই নাই।
***
মৌলানা আকরম খাঁ সাহেব সরকারকে হজযাত্রীদের সুবিধা করিয়া দিবার জন্য অনুরোধ করিয়াছেন।
মোগল বাদশাহ আকবর গুজরাট জয় করিলে পর মোগলরা প্রথম সন্দ্র দর্শন করে, প্রথম সমুদ্রবন্দর তাহাদের হাতে আসে। সেই বৎসরই হুমায়ুনের বিধবা মহিষী ও হারেম মহিলারা সুরট বন্দর হইতে নৌকাযোগে মক্কা যান। স্থলপথে যাওয়া বিপদসঙ্কুল ছিল বলিয়া ইতোপূর্বে মোগল মহিলারা কখনও হজ যাইতে পারেন নাই। কিছুদিন পরেই আকবর একজন মির উল হাজ অর্থাৎ হজ অফিসার (ইংরেজ সরকার যেন না ভাবেন যে তাহারাই সর্বপ্রথম এই সকর্মটি করিয়াছেন) নিযুক্ত করেন। আহমদাবাদবাসী সম্ভ্রান্ত পীর বংশীয় মির আবু তুরাব বহু হজযাত্রী ও ভারত সরকারের তরফ হইতে দশ লক্ষ টাকা সঙ্গে লইয়া সুরটের বন্দর-ই-হজ (তাপ্তি নদীতে একটা ঘাট এখনও এই নামে গুজরাতে সুপরিচিত) হইতে পাল তুলিয়া মক্কা পৌঁছোন। ভারত সরকারের পক্ষ হইতে ওই অর্থ মক্কার শরিফ (গভর্নর), আলিম উলেমা (পণ্ডিত-শাস্ত্রী) ও দীনদুঃখীদিগকে অতি আড়ম্বরে ও বদান্যতার সহিত বন্টন করা হয়। মক্কায় ভারতের জয়ধ্বনি উঠে; ভারতের হাজিরা সর্বত্র রাজার আদর পান। ফিরিবার সময় আবু তুরা পয়গম্বরের পদচিহ্নিত একখানা পবিত্র প্রস্তর আনয়ন করেন। আকবর নামায় বর্ণিত আছে বাদশাহ আকবর সেই প্রস্তরকে সম্মান প্রদর্শন করিবার জন্য আপন স্কন্ধে বহন করিয়াছিলেন। প্রস্তরখানি অদ্যাপি আহমদাবাদে আছে।
