I. B.-র স্মরণশক্তি পৃথিবীর ইতিহাসে বিস্ময়জনক ও হৃদিত্রাস-সঞ্চারক। ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। পাছে ক্রাইস্টপন্থি কাহারও মনঃপীড়ার সঞ্চার হয়, এই ভয়ে সেনসার এন্তার দুশ্চিন্তার ভার নামাইলেন ছত্রটি গিলোটিন করিয়া।
সহৃদয় পাঠক গীতা অথবা ওই জাতীয় কোনও পুণ্যগ্রন্থে আছে না, ধর্মসংস্থাপনার্থে শ্রীকৃষ্ণ যুগে যুগে অবতীর্ণ হন?
হে biology Biography অকিরণকারী নটবর সেনসর, তোমাকে বারবার নমস্কার—
নমঃ পুরস্তাদথ পৃষ্ঠতস্তে নমোহস্তু তে সর্বত অব সর্ব
তোমাকে সম্মুখ হইতে নমস্কার, তোমার পশ্চাৎ দিকে নমস্কার তুমি যে অনন্তবীর্য অনন্তবিক্ৰম ধরো তাহাকে সন্দেহ করিবার মতো যুগ্ম-মস্তক কার স্কন্ধে?
খ্রিস্টধর্ম ওয়াজ ইন ডেঞ্জার– তুমি তারে করিলে উদ্ধার।
***
বৃথা বাক্যব্যয়। বর্তমান যুগ সাংখ্যের– অর্থাৎ Statistics-এর। তাই শুদ্ধ স্টাটিসৃটি নিবেদন করি।
১৯২০-এ অসহযোগ আন্দোলনে ভদ্রলোক যোগ দেন। ১৯২৭-এ নানাপ্রকারে প্রপীড়িত হইয়া মস্কো চলিয়া যান। ১৯২৮-এ অসুস্থ শরীর লইয়া বার্লিন। ১৯৩৩-এর কয়েক দিবস জর্মন জেল। ১৯৩৪-এ দেশে প্রত্যাবর্তন।
১৯৩৫ এখানে বৌন্ড ডাউন। ১৯৩৬-এর গ্রীষ্মে গ্রেফতার ও সাত মাসের জেল। ৩৭-৩৮ বাহিরে। সেপ্টেম্বর ৩৯-৪১ জেলে প্রায় এক বছর। ৪১-৪২ এক বৎসর বাহিরে। ৪২-এর এপ্রিল পুনরায় লক্ষ্ণৌয়ে গ্রেফতার ও বলি– তার পর ফতেহগড়– তার পর বাঙলা . দেশের জেল– সর্বকারাগারতীর্থ পরিক্রমা করিয়া এখন তিনি তথাগত- আজও তিনি জেলে। একটানা তিন বৎসর আট মাস। কত রোগশয্যা মৃত্যুদৰ্শন কত হাসপাতাল, আত্মীয়স্বজনের কত আকুলি বিকুলি কত কর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ কত প্রতিশ্রুতি কত আশানৈরাশ্যের সুখস্পর্শে পদাঘাত।
ইতোমধ্যে পত্নীর ছয় মাস কারাবাস, ভগ্নীৰ্শনাগতা শ্যালিকার তিন মাস ও নিরীহ পাঁচকের নয় মাস!
ভদ্রলোকের নাম শ্রীসৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ভগ্নস্বাস্থ্যবশত ওজন কমায় তিনি এখন ছোটলোক এবং ছোট-লোকের সঙ্গই বাঞ্ছা করেন।
[আনন্দবাজার পত্রিকা, ১.১২.১৯৪৫]
.
০৭.
সহৃদয় পত্রলেখকগণের প্রতি আমার সকরুণ নিবেদন এই যে, আমি অতি অনিচ্ছায় অনেক সময় তাহাদের পত্রের উত্তর দিতে অক্ষম হই। তাহারা যেসব বিষয় লইয়া আলোচনা চাহেন সেগুলিও সবসময় করিতে সক্ষম হই না। তাহার প্রধান কারণ আনন্দবাজার বাংলা পত্রিকা অধিকাংশ পাঠক ইংরেজি জানেন না। কাজেই তাহারা বহু বিষয়ের রস গ্রহণ করিতে পারেন না। আমি প্রধানত তাঁহাদিগের সেবা করিতে চাহি বলিয়াই আনন্দবাজারে লিখি। গুণীরা হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ডে লেখেন। আবার কোনও কোনও পাঠক শাসাইয়া বলিয়াছেন, সত্যপীর সাবান ইত্যাদি সামান্য বিষয় লইয়া আলোচনা করে কেন, সাবানের আলোচনাও তাহার নিকট হইতে শুনিতে হইবে নাকি?
আমার বক্তব্য, আমি অত্যন্ত সাধারণ রাস্তার লোক, ম্যান ইন দি স্ট্রিট। দুর্বলতাবশত মাঝে মাঝে পণ্ডিতি করিবার বাসনার উদ্রেক হয়। এবং করিতে গিয়া ধরা পড়িয়া লাঞ্ছিত হই। সহৃদয় পাঠক, আপনার কি সত্য সত্যই এই অভিলাষ যে, অধম প্রতি শুক্র শনি সিন্নি (শিরনি) ও পূজার পরিবর্তে বিদ্বজ্জনমণ্ডলী কর্তৃক তিরস্কৃত হউক?
অতঃপর বক্তব্য সাবান বস্তুটি বুদ্বুদসমষ্টি বলিয়া কি সে সম্বন্ধে আলোচনা বুদ্বুদেরই ন্যায় অসার? গুরুজন, জর্মন পণ্ডিত ও যোগীকে এক সাবানে সম্মিলিত করিতে সমর্থ হইলাম সে কি কম কেরানি? হায় পাণ্ডিত্য করিতে গিয়া বিড়ম্বিত হই, সাবানের মতো নশ্বর বস্তু লইয়া আলোচনা করিতে গিয়াও পণ্ডিতের যষ্টিতাড়না হইতে নিষ্কৃতি নাই। উপায় কী?
ভাবিয়াছিলাম অদ্য ইলিশ মাছ কী প্রকারে দম পোত রান্না করিতে হয় তাহা সবিশদ বর্ণনা করিব। সে অতি অদ্ভুত রান্না। আস্ত মাছখানা হাঁড়িতে রাখিবেন, আস্ত মাছখানা রান্না হইয়া বাহির হইবে। অনভিজ্ঞের কণ্ঠত্রাসসঞ্চারক ক্ষুদ্র কাঁটাগুলি গলিয়া গিয়াছে, বৃহৎ কাঁটাগুলোর তীক্ষ্ণতা লোপ পাইয়াছে।
পূর্ববঙ্গে কোনও কোনও অঞ্চলে এইপ্রকার রান্নার কায়দা এত গোপন রাখা হয় যে, মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি যাইবার সময় শপথ করিয়া যাইতে হয় যে, সে শ্বশুরবাড়ির কাহাকেও পঞ্চম মকারের বাঙালি বল্লভ এই ম কারটার গভীর গুহ্য তত্ত্বটি শিখাইবেন না।
সেই গোপন তত্ত্বটি আজ যবনিকান্তরাল হইতে প্রকাশ্য দিবালোকে বাহির করিব মনস্থির করিয়াছিলাম। সর্বরহস্য সর্বকালের জন্য সমাধান করিয়া বহু মধুর নির্যাতন, পরিবারে পরিবারে দ্বন্দ্ব-কলহের অবসান করিব ভাবিয়াছিলাম কিন্তু গম্ভীর পাঠকের তাড়নায় মনস্কামনা পূর্ণ হইল না।
ফলে ইলিশের কাঁটা আরও এক শত বৎসর বহু অনভিজ্ঞের গলায় বিধিবে–কিন্তু আমার তাহাতে পাপ নাই।
বাঙালদের কথাই হউক।
এক বাঙাল বেগুন চাহিতে গিয়া বাইগন বলিয়াছিল; তাহাতে ঘটির রসোদ্রেক হয় ও বারবার ব্যঙ্গ করিয়া জিজ্ঞাসা করিতে থাকে, কী বলিলে হে? কী কথা বলিলে? বাঙাল লজ্জিত হইয়া কিছুক্ষণ নিজের উচ্চারণ লুকাইবার চেষ্টা করিয়া শেষে বিরক্ত হইয়া বলিল, বেশ কইছি, বাইগন কইছি, দোষ কী হইল? ঘটি আত্মপ্রসাদজাত মৃদুহাস্য করিয়া বলিল, “বাইগন”! ছোঃ! কী অদ্ভুত উচ্চারণ। আর শোনো তো আমরা কীরকম মিষ্টি উচ্চারণ করি, “বেগুন”! বাঙাল চটিয়া বলিল, মিষ্টি নামই যদি রাখবা তবে “প্রাণনাথ” নাম দেও না ক্যান? চাইর পইসার প্রাণনাথ” দেও। একসের “প্রাণনাথ” দেও। হইল?
