অথচ সভ্যতার শিখরে উপবিষ্ট প্যারিস শহরের বাসিন্দারা নাকি দুর্দিনে কুকুর-বিড়াল। ইস্তক চড়ইপাখি পর্যন্ত সাফ হজম করিয়া ফেলিলেন।
ধর্মের গতি সূক্ষ্ম; কে সভ্য কে অসভ্য কে জানে?
[আনন্দবাজার পত্রিকা ১.৯.১৯৪৫]
.
০৩.
সেই ইন্দো-মার্কিন মজলিসের আরেক কোণে যখন ঘুরিতে ঘুরিতে পৌঁছিলাম, তখন শুনি এক মার্কিন বলিতেছেন, যাকে জিগ্যেস কর সেই বলে “টেগোর পড়–গিট্যাঞ্জলি, গাড়না, চিন্তা”; পড়েছি, সুখ পেয়েছি। কিন্তু আমি চিত্রকর, তোমাদের দেশে কেউ ছবি-টবি আঁকে না? আমি বলিলাম, কী অদ্ভুত প্রশ্ন, অবনীন্দ্রনাথ, নন্দলাল, অসিত হালদার ও নন্দলালের চেলা রমেন্দ্র চক্রবর্তী, বিনোদ মুখোপাধ্যায়, বিনায়ক শিবরাম মশোজি, রামকিঙ্কর বহিজ– এঁদের নাম শোনোনি? মার্কিন বলল, “ওই তো বিপদ, সকলেই বলে “নাম শোনোনি?” নাম তো বিস্তর শুনেছি। কিন্তু এদের ছবির অ্যালবাম কই– এক চক্রবর্তী ছাড়া! ১৫ থেকে ২০ টাকার ভিতর তুমি আমাদের যে কোনও গুণীর– দা-ভিঞ্চি, রেমব্রান্ত, সেজান্– যারি চাও উৎকৃষ্ট অ্যালবাম পাবে। ইস্তেক তোমাদের দেশের বাজার এগুলোতে ছয়লাপ করে রেখেছিল, যখন লড়াইয়ের গোড়ার দিকে এদেশে আসি। এই যে এঁদের নাম করলে, দাও না কারু “কমপ্লিট ওয়ার্কস”? বেশি দরকসর করব না– আমরা কারবারি, আদ্ধেকেই দাও না?
নতমস্তকে ঘাড় চুলকাইয়া টালবাহানা দিলাম, লড়াইয়ের বাজার; জাপানি-জর্মন প্রিন্টিং বন্ধ; লড়াইয়ের পরে। আমেরিকানটি ভদ্রলোক। লড়াইয়ের পূর্বে অ্যালবাম ছিল কি না সে বিষয়ে অতিরিক্ত অন্যায় কৌতূহল দেখাইয়া আমাকে বিপদগ্রস্ত করিলেন না।
শুনিতে পাই, সেই একমাত্র চিত্রকর যাহার অ্যালবাম পাওয়া যায়, সরকারের ব্যবহারে ত্যক্ত হইয়া অধ্যাপকের কর্ম ছাড়ি-ছাড়ি করিতেছেন। কারবারি মার্কিন চিত্রকর চিনে, কলচরড বাঙলা সরকার চিনে না।
***
যুদ্ধের ফলে নানা অপকার, নানা উপকার হইয়াছে। তাহার খতিয়ান করিবার সময় এখনও আসে নাই। তবু একটি জিনিসের কথা ভাবিলেই মন উৎফুল্ল হইয়া উঠে। আসাম হইতে চীনে মোটরে যাইতে পারিব।
হিউয়েন সাং মঙ্গোলিয়া, তুর্কিস্থান, কাবুল হইয়া ভারতবর্ষ আসেন। অসহ্য কষ্ট তাহাকে সহিতে হইয়াছিল, ত্রিশরণ তাঁহার সহায় না হইলে সে অসম্ভব দুস্তর মরুভূমি, সঙ্কটময় হিন্দুকুশ উত্তীর্ণ হইয়া তিনি তথাগতের পুণ্যভূমিতে পৌঁছিতে পারিতেন না। ভারতবর্ষে তিনি কাশ্মির, তক্ষশিলা, বিহার হইয়া বারেন্দ্রভূমি পর্যন্ত আসেন। সেখানে কামরূপের হিন্দুরাজার নিমন্ত্রণ পান। প্রথমে কিঞ্চিৎ সন্দিগ্ধচিত্তে যাওয়া না-যাওয়া সম্বন্ধে মনে মনে বিচার করিয়া শেষ পর্যন্ত লোভ সম্বররণ করিতে পারিলেন না।
কামরূপের রাজা তাহাকে উচ্চ পাহাড়ে তুলিয়া পূর্বদিকে হস্তপ্রসারণ করিয়া বলিলেন, ওই তো আপনার দেশ। আমার কতবার মনে হয়, আপনার দেশ একবার দেখিয়া আসি কিন্তু এদিকে কোনও পথ এখন নির্মিত নাই।
দেশের দিকে তাকাইয়া ভিক্ষু হিউয়েন সাংয়ের হৃদয় বিকল হইয়া গিয়াছিল। এত কাছে, অথচ এত দূরে! দুঃখ করিয়া ভাবিয়াছিলেন পথটি যদি থাকিত, তবে কত শীঘ্র কত অল্প কষ্টে তিনি আত্মজনের কাছে উপস্থিত হইতে পারিতেন।
বর্ষার নির্মম বৃষ্টির অবিশ্রান্ত আঘাতে এই রাস্তার মেরুদণ্ড ভাঙিয়া দেয়। তৈয়ারি হইয়াছে বটে, কিন্তু সরকার সেটিকে চালু রাখিবেন কি না বলিতে পারি না। যদি থাকে, নানা সুবিধার মধ্যে ভারত-চীনে মধ্যস্থতাবিহীন সরল (পথ কুটিল হওয়া সত্ত্বেও) যোগসূত্র অবিচ্ছিন্ন রহিবে। আমরা মনের আনন্দে চীন ঘুরিয়া আসিব। হিউয়েন সাংয়ের আত্মা সন্তোষ লাভ করিবে।
***
স্থলপথ দিয়া বন্ধ ভারত হইতে আরেকটি জায়গায় অল্পায়াসে যাওয়া যায়– সে কাবুল। শরৎকাল আসিয়াছে, তাই মনে পড়িল। এখন সেখানে ফল পচিতেছে, খাইবার লোক নাই।
ধনীরা শিলং যান, মুসৌরি-সিমলা যান, কাশির পর্যন্ত অনেকে ধাওয়া করেন, কিন্তু কাহাকেও কাবুল যাইতে দেখি না। অথচ যাওয়া যে খুব কষ্টকর তাহা নহে। পেশাওয়ার হইতে কাবুল মাত্র দুই শত মাইল মোটরপথ। প্রথম কুড়ি মাইল, খাইবার পাশের ভিতর দিয়া– সে কী অপূর্ব, রুদ্র দৃশ্য! দুই দিকে হাজার ফুট উচ্চ প্রস্তর গিরি দুশমনের মতো দাঁড়াইয়া নিচে সরু আঁকাবাঁকা রাস্তার উপর দিয়া কত চিত্র-বিচিত্র পোশাক, পাগড়ি পরিয়া কাফেলা-ক্যারেভান কাবুল চলিয়াছে, মাজার-ই-শরিফ চলিয়াছে, আমুদরিয়া পার হইয়া বোখারা যাইবে-আসিবে। এদিকে গজনি-কান্দাহার হইয়া হয়তো হিরাত পর্যন্ত যাইবে আসিবে। ঘোড়া-গাধা-উটের পিঠে কত রঙয়ের কার্পেট, কত ঝকঝকে সামোভার, কত কারাকুলি পশম। সন্ধ্যায় নিমলা পৌঁছিবেন সেখানে শাহজাহান বাদশার তৈয়ারি চিনার (সাইপ্রেস জাতীয়) বাগানের মাঝখানে নয়ানজুলির পাশে চারপাইর উপর না-গরম-না-ঠাণ্ডায় রাত কাটাইবেন– জলের কুলকুল শুনিয়া। ব্রাহ্মমুহূর্তে হাজার হাজার নরগিস (নারসিসস) ফোঁটার সঙ্গে সঙ্গে সুগন্ধে সঞ্জীবিত হইয়া চেতনালোকে ফিরিয়া আসিবেন।
সেইদিন বিকালে কাবুল। পথের বর্ণনাটা আর দিলাম না। যে একবার দেখিয়াছে ভুলিবে না। শরতের কাবুল কোনও হিল স্টেশনের নূন তো নহেই– অনেকাংশে উত্তম। প্রচুর ফল, উক্তৃষ্ট দুম্বার মাংস, হজমি পানীয় জল, রুদ্র-মধুর দৃশ্য ও কাবুলির সরল সহৃদয় বন্ধুত্ব। ঐতিহাসিক চিন্তার খোরাক পাইবেন বিপুল ঐশ্বর্যের অধিকারী মোগল রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা, বাবুর বাদশাহের দীন স্নান কবর কাবুলের পর্বতগাত্রে দেখিয়া।
