বাসু ঠাকুরের ছবিতে প্রচেষ্টা আছে। ভদ্রলোক অনেক কিছু দেখছেন এবং ভেবেছেন তার চেয়েও বেশি। তুলির জোর তো আছেই, তার চেয়েও বেশি মূর্তি গড়ার হাত। বাসু ঠাকুরের সৃষ্টি তাই যে শুধু আনন্দ দেয় তা নয়, ছবিগুলোর সামনে অনেকক্ষণ ধরে অনেক কিছু ভাবা যায়। প্রদর্শনী বহুদিন ধরে খোলা থাকবে।
***
ক্রিকেট ম্যাচে যখন পাশের বে-রসিক নানারকম উদ্ভট প্রশ্ন শুধায় তখন উদ্ভট উত্তরও পায়।
ওগুলো কী?
বিরক্তির সঙ্গে, উইকেট।
ওগুলো দিয়ে কী হয়?
ততোধিক বিরক্তির সঙ্গে, ক্লান্ত হলে খেলোয়াড়দের বসবার জন্য।
পোলো খেলা দেখতে গিয়ে আমার সেই অবস্থা; চক্কর কী, হাফ গোল কারে কয়, ফাউল কখন হয় আর কখন হয় না তাই বুঝবার পূর্বে খেলা শেষ হয়ে গেল।
তবু, আহা, দেখবার জিনিস! এক গোল থেকে আরেক গোল অবধি (ফুটবল তিন সাইজ) ঘোড়াগুলো যা ছুট দেখাল তার জন্যই ও খেলা দেখার প্রয়োজন। রাজা-রাজড়াদের গদি যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ খেলাও ঝিমিয়ে আসছে। মরে গিয়ে ঠাণ্ডা হওয়ার পূর্বে এক দফা দেখে নেবেন।
.
১৫.
খ্রিস্টের ছ শ বছর আগে বৈশালীতে গণতন্ত্র প্রচলিত ছিল। বলা হয়, বুদ্ধদেব এই বৈশালী রাজ্যের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দেখে মুগ্ধ হন এবং আপন সদ্য নির্মাণের সময় তার অনেকখানি অনুকরণ করেন। এই বৈশালীতেই মহাবীর জীনের জন্ম।
বৈশালীর স্মরণে এখনও সেখানে প্রতি বৎসর উৎসব হয়। এবারকার উৎসবে শ্ৰীযুত কানহাইয়ালাল মুন্সী সভাপতিত্ব করেন।
শ্ৰীযুত মুন্সী বলেন, আমরা যদি ভারতের ভিতর দিয়ে বিশ্ব-ঐক্য এবং বিশ্ব-ঐক্যের ভিতর দিয়ে ভারতকে অখণ্ড রূপে চেনার চৈতন্য না জাগিয়ে তুলতে পারি তবে আমাদের স্বাধীনতা লোপ পাবে, স্বাধীনতা গেলে আমাদের আত্মার মৃত্যু হবে, আত্মার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ভারতের মহতী বিনষ্টি।
এ উক্তির সত্যতা সম্বন্ধে কারও মনে কোনওপ্রকারের সন্দেহ থাকতে পারে না। কিন্তু প্রশ্ন, ভারতীয় কিংবা বিশ্ব-ঐক্যের সাধনার সঙ্গে প্রাদেশিক বৈদগ্ধ্যের সংঘাত আছে কি নেই? আমরা যখন বাঙলা ভাষা এবং সাহিত্যের চর্চা করি, আমি যখন বৃদ্ধ বয়সে উত্তমরূপে হিন্দি শিখতে এবং লিখতে নারাজ তখন আমাকে বাঙালি কূপমণ্ডুক এবং ভারতীয় ঐক্যের পয়লা নম্বরের দুশমন বলা হবে কি না?
বাঙলার তরুণ সম্প্রদায় যদি আজ আদাজল খেয়ে (আর অন্য বস্তু আছেই বা কী যে খাবে?) হিন্দি চর্চায় বসে যায়, বাঙলা বর্জন করে হিন্দিতে উত্তম উত্তম কাব্য কথাসাহিত্য রচনা করে তামাম ভারতকে ভেল্কিবাজি দেখিয়ে দেয়, প্রবীণ হয়েও সুনীতি চট্টো নাকি দেখাতে পেরেছেন তা হলে আমার কণামাত্র– আপত্তি নেই (যদিও একথা বলব যে কেউ যদি হিন্দি শিখে কোনও ভালো বই বাঙলায় অনুবাদ করে তবে আমি খুশি হই বেশি। কিন্তু দয়া করে আমার মতো প্রবীণদের আর এ গর্দিশে ফেলবেন না।
একটা গল্প মনে পড়ে গেল।
গৃহিণী শুনে স্তম্ভিত যে বড়বাবুকে মাসের কুড়ি তারিখে হাওলাত দেয় তারই আপিসের এক বেনে কেরানি। বড়বাবুর মাইনে সাতশ, আর কেরানির ত্রিশ। গৃহিণী চেপে ধরলেন, তাঁকে গিয়ে দেখে আসতে হবে সে কী করে বাড়ি চালায়। কর্তা বহুবার গাইগুই করে শেষটায় না পেরে গেলেন একদিন সন্ধের পর তারাপদর বাড়িতে।
বাড়ি অন্ধকার। ডাকাডাকিতে আলো জ্বলল। তারাপদ নেবে এল হাতে পিদিম, পরনে এইটুকুন গামছা। বড়বাবুকেও ঘেঁড়া চ্যাটাইয়ে বসিয়ে শুধাল, কোনও লেখা-পড়ার কর্ম আছে কি?
না। কেন?
তা হলে পিদিমটা নিবিয়ে ফেলতে পারি আর গামছাখানা খুলে রাখতে পারি। বড়বাবু যা দেখবার জন্য এসেছিলেন তা দেখা হয়ে গেল। খানিকক্ষণ পরে বাড়ির দিকে রওনা হলেন। পাড়ার মুখে পৌঁছতে না পৌঁছতেই চিৎকার করে বলতে লাগলেন, গিন্নি, শিখে এসেছি, শিখে এসেছি কিন্তু আমার দ্বারা হবে না।
বড়বাবুর মতো আমারও জানা হয়ে গিয়েছে, হিন্দি শিখলে আমার বহুৎ ফায়দা হবে, কিন্তু ওই যে বড়বাবু বললেন, আমা দ্বারা হবে না সেই মোক্ষম কথা!
উর্দুতেও এই মর্মে একটি উত্তম কবিতা আছে। মোমিন নামক কবিকে বলা হয়েছিল, আর কেন? সমস্ত জীবন তো কাটালে পাপ কর্ম করে করে; এইবার একটু ধর্মে মন দাও!
মোমিন বললেন,
উম্র সারী তো কটী ইশকে বুতা মে
মুমিন!
আখরী ওজমে ক্যা থাক্ মুসলমাঁ
হোঙগে?
সমস্ত জীবন তো কাটল প্রেম-প্রতিমাদের
মহব্বতে, রে মুমিন,
এখন এই আখেরি সময়ে কী ছাই
মুসলমান হব।
তাই হিন্দি-উর্দু মাথায় থাকুন। যেটুকু টুটিফুটি শেখা আছে সেই করেঙ্গা, খায়েঙ্গা, হাই, হুই করে জীবনের বাকি কটা দিন প্রেমসে চালিয়ে নেব।
কিন্তু যদি বলি, বাঙলার চর্চা যে আমি আমার কট্টর বাঙালিত্বের জন্য করছি তা নয়– বাঙলার সেবার ভিতর দিয়েই আমি ভারতীয় ঐক্যের সেবা করছি; তা হলে হিন্দিপ্রেমী বাঙালিরা হয়তো আমাকে তাড়া লাগাবেন। তবু সেইটেই হক কথা, এইখানেই আঁটি জাতীয়তাবাদ।
আমাকে বিশ্বনাগরিক হতে হলে তো আর বিশ্বসংসারের ভাষা শিখতে হয় না, কিংবা এসপেরান্টোও কপচাতে হয় না। আমি মালাবারের ভাষা জানিনে তবু মালাবারের লোককে আমার বড় ভালো লাগে। আমি কিঞ্চিৎ ইংরেজি জানি এবং তার অনুপাতে ইংরেজকে অপছন্দ করি অনেক বেশি।
অতএব ভারতকে ভালোবাসা যায় হিন্দি না শিখেও। রোমাঁ রোলা হিন্দি জানতেন না তবু তিনি ভারতবর্ষকে চিনতেন ও ভালোবাসতেন অনেক দুবেজি পাড়েজির চেয়ে ঢের ঢের বেশি।
