ফারাক এইটুকু, বাঙলা ছবিতে তখন ডুয়েট গান আরম্ভ হয়ে যায়, কেন গো বাঁচালে মোরে নিঠুর বঁধুয়া, এখানে তা হয়নি। (চীনা ছবি হোয়াইট হেয়ার্ড গার্ল কিন্তু গান বাবদে বাঙলা ছবিকেই ছক্কা-পাঞ্জা-বোম্ দিতে পারে)।
নীলনদসন্তান নিরেস ছবি বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। এ ছবি উন্নাসিকের (অর্থাৎ আপনার-আমার) জন্য বানানো হয়নি। সদর এবং মহকুমা শহরে এ ছবি বিস্তর কদর পাবে। তাই আমি হন্টরওয়ালি, মিস্ ফ্রন্টিয়ার মেল, ডাকু কি দিলরুবা, জাম্বু কা বেটার নিন্দেও কস্মিনকালে করিনি।
বুদ্ধের জীবনী জাপানি ছবি। অতি নবীন কায়দায় কার্টুন দিয়ে সিলুয়েট দিয়ে ছবিখানা তৈরি। তা-ও আবার স্টিলিসাইজড—তাই ভারতীয় নারকোল অশথ গাছ ঠিক ওত্রালো কি না, তাই নিয়ে কোনও শিরঃপীড়া হয় না। সঙ্গীত অত্যুত্তম, সবকিছু নিয়ে ছবিখানা সত্যই উপাদেয়।
***
বুদ্ধের জীবনের সবচেয়ে যে জিনিস চীনা-জাপানিদের আকৃষ্ট করে, সে হচ্ছে মারের বিভীষিকা এবং প্রলোভন! চীন দেশের গুহাতে বুদ্ধ-জীবনীর এ অধ্যায়টি বিস্তর রঙ ফলিয়ে বহু প্রকারে আঁকা হয়েছে। জাপানি বুদ্ধের জীবনী ছবিতেও দর্শক মারপর্ব অনেকক্ষণ ধরে দেখতে পাবেন। সেখানে নাচগানও চমৎকার।
আমাদের বিশ্বাস কার্টুনে ছবি বানালে ডিসৃনিকে নকল না করে উপায় নেই। ফরাসি ছবি সাহসী জন দেখে সে বিশ্বাস দৃঢ়তর হয়। যেখানেই চিত্রকার নতুন কিছু করতে গিয়েছেন, সেখানেই তিনি মার খেয়েছেন বেধড়ক, আর যেখানে ডিসৃনিকে নকল করেছেন, সেখানে তিনি পানসে– নকল করলে যা হয়।
বুদ্ধের জীবনী ডিসনিকে নকল না করে সার্থক সৃষ্টি।
মিসেস ডেরি সম্বন্ধে হিন্দুস্থানে আলোচনা করেছি। ভাষা এবং তার চতুর্দিকে গড়ে ওঠা বৈদগ্ধ্য যে জোর করে কোনও জাতের ঘাড়ে চাপানো যায় না, তার অত্যুত্তম প্রমাণ পাওয়া যায় মিস ডেরিতে। গান, অভিনয়, সবকিছুই এ ছবিতে ভালো হয়েছে।
***
আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে মিরাকল ইন মিলান। অলৌকিক ঘটনা নিয়ে যে সূক্ষ্ম ব্যঙ্গ এ ছবিতে করা হয়েছে, সেটি ধরা পড়ে শেষমুহূর্তে। এ ছবি দেখলে বিরিঞ্চি বাবাদের প্রতি ভক্তি একটুখানি কমতে পারে।
***
জনৈক লেখক এক খ্যাতনামা কাগজে রবীন্দ্রনাথ যে দ্বিতীয় শ্রেণির কবি, ঔপন্যাসিক এবং দার্শনিক সেকথা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। লেখক স্বীকার করেছেন, তিনি বাঙলায় রবীন্দ্রনাথ পড়েননি।
বিভারলি নিকলসও এই ধরনের বই লিখেছিল। মিস মেয়ের কথা আর বললুম না, কারণ দু একজনকে বলতে শুনেছি, মেয়োর উদ্দেশ্য হয়তো খারাপ ছিল না কিন্তু রবীন্দ্র-সমালোচকটার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে তাদের মনে প্রচুর সন্দেহ রয়ে গিয়েছে।
নিকলসের বই যখন হুশ হুশ করে বিক্রি হচ্ছে তখন খ্যাতনামা প্রকাশক আমাকে বইখানার উত্তর লিখতে অনুরোধ করেন। বেশ দু পয়সা যে পাব সে লোভটাও দেখালেন।
আমি উত্তরে সবিনয়ে বললুম, মনে করুন এক হটেনটট লন্ডনে তিন মাস থাকার পর যদি শেক্সপিয়র, রাফায়েল, এঞ্জেলো, বেটোফেন, পাভলোভাকে কটুকাটব্য করে বই লেখে তবে কি কোনও সুস্থ ইয়োরোপীয় তার উত্তর লিখবে?
প্রশ্ন হচ্ছে নিকলস্ এবং আমাদের রবীন্দ্র-সমালোচক এ ধরনের বই বা প্রবন্ধ লেখে কেন?
এরা চায় পয়সা, কিন্তু জানে ভারতবর্ষ তথা রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে প্রামাণিক রচনা লেখবার মতো মুরোদ এদের নেই। এদের বই কেউ কিনবে না। কিন্তু যদি গালাগাল দিয়ে লেখে তবে বহু লোক সেসব বইয়ের তীব্র প্রতিবাদ করবে, ফলে হট্টগোলের সৃষ্টি হবে এবং সেই ডামাডোলে বিস্তর বই বিক্রি হবে। অশ্লীল বইও এই পদ্ধতিতে বাজারে কাটে।
অতএব আমাদের উচিত কী?
চুপ করে থাকা।
তবে আমি আলোচনাটা উত্থাপন করলুম কেন? তার কারণ বহু সরল পাঠক এই দুচোমিটা না ধরতে পেরে হট্টগোলের সৃষ্টি করে বই বিক্রির সহায়তা করেন। আমার বক্তব্য, সবাই যেন এ বাবদে একদম নিপ ডেড় সাইলিন্ট পন্থা অবলম্বন করেন। আলোচনা উত্থাপিত হলেই নাক সিঁটকে বলবেন, মাপ করবেন, স্যার, এ বিষয়ে আমার কণামাত্র উৎসাহ নেই। বলেই অন্য কথা পাড়বেন। বলবেন, দেখো দিকিনি, রায় পিথৌরা কী চমৎকার লেখে কিংবা উল্টোটা। যাই করুন না কেন, রায় পিথৌরার তাতে করে দু পয়সা আমদানি বাড়বে না।
***
ইংরেজ বড় হুঁশিয়ার জাত। তারা এই পদ্ধতিতে ভালো বইও খুন করতে জানে।
লায়োনেল ফিলডেন নামক এক ব্যক্তি এদেশে কয়েক বৎসর অল ইন্ডিয়া রেডিয়োর বড় কর্তা ছিলেন। এদেশে ইংরেজের কীর্তিকারখানা দেখে ভদ্রলোক বিলেত গিয়ে সে সম্বন্ধে একখানা চটি বই লেখেন– একদা ডিগবি যেরকম এসপারাস ব্রিটিশ ইন্ডিয়া লিখেছিলেন।
ইংরেজ বইখানা সম্বন্ধে এমনি ঠোঁট সেলাই করল যে বইখানা অতি অল্প লোকই পড়েছেন।
ঋষিরা তাই বলেছেন, নীরবতা হিরণয়, সাইলিনস্ ইজ গোল্ডেন!
***
দিল্লির ওপর দিয়ে বড় গর্দিশ গেল। বিস্তর ফিল্ম দেখানো হল, তারকাদের মিছিল হল, হাইফেল্স বেয়ালা বাজালেন, পণ্ডিতজি নেশনাল ট্রেজার্স ফান্ড খুললেন, সবচেয়ে বড় পোলো ফাইনাল হল, এলেনর রুজভেল্ট এলেন, তার ওপর গোটা তিনেক চিত্রপ্রদর্শনী। মানুষ কদিক সামলায়? সব সামলাতে গেলে রায় পিথৌরার কুইনটুপ্লেটের প্রয়োজন।
বাসু ঠাকুর যে বাড়ির খুশ-নাম ষোল আনা রাখতে পেরেছেন তা নয়। অবশ্য তিনি অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ, দু জনার কাছ থেকে যা শিখেছেন তার অনেকখানি কাজে লাগাতে পেরেছেন।
