সুইটজারল্যান্ডের নিজস্ব সুইস বলে কোনও ভাষা নেই। সুইসরা ফরাসি, জর্মন, ইতালীয় ও রোমানি ভাষায় কথা কয়। এবং শতকরা নব্বইজন একাধিক ভাষা বলতে পারে না। ফরাসি-সুইটজারল্যান্ডে অতি অল্প লোকই জর্মন জানে, ইতালীয়-সুইটজারল্যান্ডেও তাই। অথচ এই চার ভাষায় গড়ে ওঠা সুইটজারল্যান্ড একতায় জর্মনি-ইতালিকে অনায়াসে হার মানাতে পারে।
আরবদেশের ভাষা আরবি, ধর্ম ইসলাম, জাতে তারা সেমিটি। আরব মাত্রেরই এই তিন-তিনটে ঐক্যসূত্র আছে– পৃথিবীতে এরকম উদাহরণ বিরল। তবু দেখুন তারা কটা রাষ্ট্রে বিভক্ত তাদের ভিতর রেষারেষি কীরকম মারাত্মক! সউদি আরব, ইয়েমেন, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, জর্ডন, মিশর, কুওয়াইত, বাহরেন। আলজিরিয়া, তুনিসিয়া, মরক্কোর কথা আর তুললুম না– সেখানে মূররক্ত কী মেকদারে আছে জানিনে। তাই যখন করাচি বিশ্ব-মুসলিম সজ্জ গড়ার খেয়ালি-পোলাও খায় তখন হাসি পায়। আরবদের এতগুলো ঐক্যসূত্র থাকতেও তারা সম্মিলিত হতে পারছে না, তার ওপর তুর্ক, ইরানি, পাকিস্তানি, জাভার মুসলমানকে ডেকে এনে একতা স্থাপন করা!
আমার ব্যক্তিগত দৃঢ় বিশ্বাস, যে ভারতীয় বৈদগ্ধ্য ভবিষ্যতে গড়ে উঠবে তার বুনিয়াদ প্রদেশে প্রদেশে। প্রত্যেক প্রদেশ আপন নিজস্ব ভাষা এবং সাহিত্য, আপন জনপদসুলভ আচার-ব্যবহার চারুশিল্প, আপন প্রদেশপ্রসূত ধর্ম এবং সম্প্রদায় এসব তাবৎ বস্তুর চর্চা করে যে ফললাভ করবে তারই ওপর একদিন দাঁড়াবে বিরাট কলেবর, বৈচিত্র্যসুশোভিত, সর্বজনগ্রাহ্য ভারতীয় বৈদগ্ধ্য।
আমার এক কাণ্ঠরসিক বাঙালি বন্ধু এই দেহলি-প্রান্তেই বিন্দ্ৰিযামিনী যাপন করছেন হিন্দি চর্চায়– ইনি সেই ব্যক্তি যিনি কাবুলিওয়ালাদের সঙ্গে দোস্তি জমান।
তিনি বিস্তর হিন্দি পড়েছেন। ব্যাকরণ কণ্ঠস্থ করেছেন, হিন্দির, পুলিঙ-স্ত্রীলিঙ তাঁকে কণামাত্র বেকাবু করতে পারে না, হিন্দির ফাউলার শ্রীবর্মার অচ্ছি হিন্দি তাঁর নখাঘ-দর্পণে।
তিনি বলেন– আমি বলছিনে, কারণ আমার শাস্ত্রাধিকার নেই হিন্দি ভাষা বাঙলার তুলনায় এখনও এত কাঁচা এত লিউয়িড় যে, এ ভাষাতে যে কোনও উত্তর-ভারতীয় অনায়াসে উত্তম হিন্দি লিখতে পারবে। তিনি বিশ্বাস করেন, ভালো বাঙলা লিখতে হলে যে মেহনত যে খাটুনির প্রয়োজন তার অর্ধেক পরিশ্রমে অত্যুত্তম হিন্দি লেখা যায়।
তাই তিনি বলেন, বাঙালির তো সব আছে। এখন তার একমাত্র পন্থা, হিন্দি মার্কেট ক্যাপচার করা– সুহৃদ ব্যবসায়ী তাই হামেশাই কারবারি ইডিয়াম ব্যবহার করেন– অর্থাৎ অচ্ছি হিন্দি শিখে, রবীন্দ্রনাথ-শরচ্চন্দ্রের কাছ থেকে নেওয়া শৈলী এবং ভাষা হিন্দির ওপর চালিয়ে দিয়ে হিন্দি সাহিত্যে রাজত্ব করা।
হয়তো হক কথাই কয়েছেন কিন্তু আমার মন সাড়া দেয় না।
প্রথমত এই প্রস্তাবে কেমন যেন একটা উৎকট প্রাদেশিকতা রয়ে গিয়েছে, কেমন যেন একটা একদা যাহার বিজয়-সেনানী হেলায় লঙ্কা করিল জয় গোছ ইম্পিরিয়ালিজম রয়েছে এবং বাংলা সাহিত্যই-বা এমন কোন গৌরীশঙ্করের চূড়োয় পৌঁছে গিয়েছে যে তার সেবকদের হিন্দি জয় করবার জন্য ছুটি দিতে পারি?
.
১৬.
এককালে এদেশে বিস্তর ফারসি চর্চা হত। সরকার, মুন্সি, বখশি, কানুনগো, এসব যাদের পদবি তাদের বাপ-পিতেমো উমদাসে উমদা ফারসি শিখে এককালে মোগল রাজত্ব চালিয়েছেন। সরকার তো চিফ সেক্রেটারি, বখশি মানে চিফ পে মাস্টার অর্থাৎ একাউন্টেন্ট জেনারেল! বাপ– এসব আপিসারদের সঙ্গে দেখা হওয়া মানে তো বাঘের সামনে দাঁড়ানো। কান দিয়ে ধুয়ে বেরুতে থাকে। আর ওনারা রেগে গেলে তো হাড্ডি বিলকুল পিলপিলিয়ে যায়।
যাক্ মোদ্দা কথায় ফিরে আসি। এইসব বখশি-মুন্সিরা কিন্তু আজকের দিনের সেক্রেটারি-একাউন্টেন্টের মতো ছিলেন না– অর্থাৎ ফারসি সাহিত্যেরও চর্চা করতেন, মুশায়েরায় (কবি-সম্মেলন) কবিতা পড়তেন, বয়াজিতে (কবির লড়াই) মাথায় গামছা বেঁধে নেমে যেতেন।
স্বৰ্গত কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার এই ঐতিহ্যের ভিতর আপন কবিতৃপ্রতিভার বিকাশ করেছিলেন। কিন্তু তার আসল দরদ ছিল বাঙলা সাহিত্যের প্রতি। তাই তিনি হাফিজ-সাদির উত্তম উত্তম কবিতা অতি সরল বাঙলায় অনুবাদ করেন। এ কবিতাগুলো পড়ে হিন্দুরাই যে শুধু গুলিস্তানের শুলের খুশবো আর বুলবুলের মিঠি বোলি শুনতে পেতেন তাই নয়, উনবিংশ শতকের শেষের দিকের বাঙালি মুসলমান যখন বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের জোর চর্চা আরম্ভ করলেন, তখন তারা কৃষ্ণচন্দ্রের সম্ভাবশতক অতিশয় ভক্তি ও ভালোবাসার সঙ্গে মুখস্থ করলেন। আমার বাল্য বয়সে আমি বৃদ্ধদের (হিন্দু- মুসলমান উভয় শ্রেণিরই) গদগদ হয়ে আবৃত্তি করতে শুনেছি–
নেত্র নাই বাঞ্ছা হেরি বিধুর বদন
কর্ণ নাই চাই শুনি ভ্রমর গুঞ্জন।
এবং সর্বশেষে
প্রেম নাই প্রিয়লাভ আশা করি মনে।
হাফেজের মতো ভ্রান্ত কে ভব-ভবনে?
কিন্তু এসব গাজন আজ কেন?
গেল সপ্তায় বারোটি ইরানি দিল্লি এসেছিলেন, তার মধ্যে আটজন ছাত্র, দু জন শিক্ষক। এরা এসেছেন পশুচিকিৎসার শিক্ষাদান এবং গবেষণা দেখতে। এদের ভেতর দেড়জন জানেন ইংরেজি আর একজন ফরাসি।
কাজেই ফরেন-আপিসের দাওয়াতে গিয়ে দেখি ছেলেরা নিজেদের ভিতর গুজুর গুজুর করছে। কী আর করি আমার মুরুব্বি ফারসির বাঘা মৌলবি স্বৰ্গত জয়রাম মুন্সির নাম স্মরণ করে চালালুম হাস্ত হুস্ত। ফারসি ভাষাটা কঠিন নয় আর ইরানিরা ভদ্রতোয় লক্ষৌ কিংবা চীনদেশীয়কে হার মানাতে পারে। সুতরাং তারা আমার ফারসি শুনে মার তো লাগালেনই না বরঞ্চ উৎসাহের সঙ্গে গাল-গল্প জুড়ে দিলেন।
