এ কাজের জন্য টাকা কোথা থেকে আসবে সে প্রশ্ন অবান্তর।
এ কাজ যখন সম্পূর্ণ করতেই হবে, তখন টাকা যোগাড় করতেই হবে।
কিন্তু প্রধান প্রশ্ন এসব বই পড়বে কে?
সংস্কৃত ভাষার (পালি ও প্রাকৃতের কথা থাক) চর্চা বাংলা দেশে এখন কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে, সেকথা যারা আনন্দবাজারে চিঠিপত্রে জনমত পড়ে থাকেন তারাই জানেন। কেউ কেউ স্কুল-কলেজে সংস্কৃত চর্চার জন্য যে ব্যবস্থা করতে চান, সেটা বাচ্চাকে ক্রমে ক্রমে মায়ের দুধ ছাড়ানোর মতনই। অন্যেরা বাচ্চাটাকে বাকি জীবন আধমরার মতো করে রাখতে চান। যারা ভালো করে সংস্কৃত পড়াশোনার ব্যবস্থা করতে চান, তারা যেন কল্কে পাচ্ছেন না বলে মনে হচ্ছে। বাংলার বাইরেও অবস্থা প্রায় একই। টোল-পাঠশালা বাঁচিয়ে রাখবার জন্য পণ্ডিতদের দু মুঠো অন্ন দেবার প্রস্তাব কেউ করেছেন বলে জানিনে।
শেষটায় কী হবে বলা শক্ত। তবে আশা করি, পাঠক আমার ওপর চটে যাবেন না, যদি নিবেদন করি যে, এ দেশে সংস্কৃতচর্চা ব্যাপকভাবে হওয়ার আশা দুরাশা। অক্সফোর্ড-কেম্ব্রিজ, যেখানে ক্লাসিস্ পড়ানোর জন্য গণ্ডা গণ্ডা জলপানি রয়েছে, সেখানেই যখন বিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাজনীতির মোহে পড়ে ছাত্রেরা ক্লাসিক বর্জন করেছে, তখন এ গরিব দেশ সংস্কৃতের জন্য কাকে কী প্রলোভন দেখাতে পারে?
অথচ স্বরাজ পাওয়ার পরও ভারতীয় তরুণ যদি আপন সংস্কৃতিচর্চা না করে, তবে সে এদেশে গড়ে তুলবে কী বস্তু? জলের বাঁধ, বিজলির প্রসার, কারখানার ছয়লাপ করে করেই তো একটা জাত বেঁচে থাকতে পারে না। আত্মার ক্ষুধাও তো রয়েছে– আজ না হয় পেটের ক্ষুধায় সেটাকে অস্বীকার কিংবা অবহেলা করে যাচ্ছি।
অতএব আমি মনে করি, ভারতীয় সংস্কৃতি সহজবোধ্য করে তুলতে হবে।
অর্থাৎ তিব্বতি চীনা থেকে যেসব বই অনুবাদ করা হবে, সেগুলো যেন হিন্দি, বাংলা ইত্যাদি ভাষাতে সঙ্গে সঙ্গে অনুবাদ করার ব্যবস্থা করা হয়। ইংরেজিতে অনুবাদ না করলেও ক্ষতি নেই আজকের দিনের ছেলে-ছোকরারা যখন দাশগুপ্তের ভারতীয় দর্শনের ইতিহাস ইংরেজিতে পড়ে না, কিংবা পড়তে পারে না, তখন আর চীনা বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ করে কী লাভ।
আমার মতো পাঁচজন বুড়ো মাথা চাপড়ে হয়তো জিগ্যেস করবেন, আমাদের এ অবস্থা হল কেন? সংস্কৃত কি তবে এদেশ থেকে লোপ পেয়ে যাবে? উত্তরে বলি, কালধর্ম।
.
১৪.
এই খোলা মাঠের সিনেমা বানাতে আমাদের এতদিন লাগল কেন? ইয়োরোপে ঠাণ্ডা, কুয়াশা, গ্রীষ্মকালে সন্ধ্যা হতে হতে দশটা বেজে যায়– তা-ও ভালো করে অন্ধকার হয় না। সেখানে আকাশের তলায় সিনেমা বানানোর কথাই ওঠে না। আবার কাইরো শহরে বছরে আড়াই ইঞ্চি বৃষ্টি হয় কি না হয়, কুয়াশা সেখানে অজানা, আবহাওয়া না-গরম-না-ঠাণ্ডা, সেখানে তাই ভোলা সিনেমার খোলতাই। দিল্লি এ দুটোর মধ্যিখানে, বরঞ্চ বলব কাইরোর গাঁ ঘেঁষে, তবু ভোলা সিনেমা খোলা হল মাত্র গত সপ্তাহে।
ব্যবস্থা কিন্তু উত্তমই হয়েছে। যে জায়গাটি বেছে নেওয়া হয়েছে, সেটিও পুরনো দিল্লি আর নয়াদিল্লির মাঝখানে ফিরোজ শাহ কোটলার পিঠে পিঠ লাগিয়ে। সিনেমার পর্দাখানা বানানো হয়েছে মামুলি পর্দার ডবল সাইজে বেশ শক্ত করে বাঁধা হয়েছে, যাতে করে হাওয়ায় না দোলে, তবে চতুর্দিকে কালো বর্ডার লাগানো হয়নি বলে চোখ অস্বস্তি অস্বস্তি বোধ করে।
বিরাট ব্যবস্থা, তাই টিকিটের জন্য মারামারি কাটাকাটি করতে হয় না। ভিতরে গিয়ে যে কোনও এক কোণে আপন আসন বেছে নিয়ে দিব্য বায়স্কোপ দেখা যায়, কেউ এসে ধাক্কা লাগায় না, মশাই আমার সিটে বসেছেন যে মাইরি, সিগারেটের ধুয়োর উৎপাত নেই। মোলায়েম ঠাণ্ডায় অনায়াসে দু দণ্ড ঘুমিয়ে নেওয়া যায়।
এখনও অবশ্য তাবৎ কাইরোর মতো সর্বাঙ্গসুন্দর হয়নি। সেখানে ভালো টিকিট কাটলে একখানি ছোট টেবিল পাওয়া যায়, পছন্দমতো কটলিস-সসেজ, কব-কোপ্তা খেতে খেতে ইয়ার-বক্সিদের সঙ্গে শুষ্টিসুখ অনুভব করতে করতে বায়স্কোপ দেখা যায়।
হবে, হবে, সে-ও হবে।
এক নরওয়েবাসী তার বন্ধুকে বলল, এই গরমিকালে আফ্রিকায় বেড়াতে যাচ্ছি।
বন্ধু তাজ্জব মেনে বলেন, গরমিকালটাই বাছলে। সেখানে যে ও সময়ে শেড-টেম্পারেচার ১১২ ডিগ্রি।
প্রথম বন্ধু ভুরু কুঁচকে বলল, তা আমাকে ছায়ায় বসতে বাধ্য করবে কে?
ওপন অ্যার সিনেমাতেও তাই। টিকিটের দাম যখন কুল্লে এক টাকা, তখন ছবি ভালো না লাগলে সেখানে আপনাকে বসতে বাধ্য করবে কে?
বিশ্বাস করবেন না এই কদিনে নখানা ছবি দেখেছি। বাঙ্গালায় যাকে বলে গোগ্রাসে গোস্ত গিলেছি। এখনও ঢেকুর উঠছে।
দু একখানার পরিচয় ইতোমধ্যেই আনন্দবাজার এবং হিন্দুস্থান স্টান্ডার্ড-এ নিবেদন করেছি। যেগুলো দেখেছি তার মধ্যে মিরা ই মিলান সবচেয়ে উত্তম, আর যেসব ছবি দেখার সুযোগ হয়নি, তার মধ্যে গুণীদের মতে, বাইসাইল থিফ ইউঁকিয়ারিসু নাকি একেবারে রঙের টেক্কা।
***
মিশরি ছবি ছিল ইবন উন-নীল (অর্থাৎ নীলনদসম্ভান)। এ ছবি দেখে সত্যি মনে হয়, একদম ভারতীয় ছবি, শুধু তারকারা কুর্তা-পাজামা, ধুতি-পাঞ্জাবি না পরে আলখাল্লা আর জাব্বাজোব্বা পরেছে। নায়িকা ভিমরি গিয়েছেন, তার মাথা রেললাইনের উপরে পড়ে আছে, দূর থেকে পাঞ্জাব মেল (থুড়ি, আলেকজেন্ড্রিয়া মেল) গুম গুম করে ছুটে আসছে, নায়ক তার সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছেন— এই গেল এই গেল অবস্থায় শেষ মুহূর্তে নায়িকার উদ্ধার।
