প্রথম আসিল ফরাসিস পদ্ধতিতে অরদ (hors-d’oeuvre)। নানা অংশে বিভক্ত যে বিরাট খুঞ্জা আসিয়া উপস্থিত হইল তাহাতে অন্তত দশাধিক রকমের খাদ্য। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জর্মন (ফ্রাঙ্কফুটার) সসিজ, ভর্জিত এবং অভর্জিত বেকন এবং হ্যাম, জলপাই তৈলসিক্ত টোস্টাসিন রৌপ্যবর্ণের সার্দিন মৎস্য, অতিশয় নমনীয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অমলেট খণ্ড, সিরকা-নিমজ্জিত পলা-ত্রপুষী-কোষা (প্যাঁজ-কাঁকুড়-জলপাই), রুশদেশ হইতে সদ্যাগত কাভিয়ার বা মৎস্য-ডিম্বের স্যান্ডউইচ, সেই রুশ পদ্ধতিতে মাইয়নেজ মধ্যে সুপ কুকুটু-ডিম্ব। অন্য খাদ্যবস্তুগুলির গোত্রবর্ণ অনুমান করিতে পারিলাম না।
নাদির শাহ বলিল, ক্ষুধাকে তীক্ষ্ণতর করিবার উপাদান। স্পর্শ করিবে মাত্র– অনাহারের জন্য ব্যাপকতর ব্যবস্থা।
ধন্য নাদির শাহ।
বলিল, সুপ খাইলে অনর্থক উদর পূর্ণ হইয়া যায়। অতএব সুপ সর্বথা বর্জনীয়। ডাচেস অব উইনজার নিমন্ত্রণে কদাচ সুপ পরিবেশন করেন না। অতএব এক্ষণে আসিবে তন্দুর-মৎস্য।
আমি বলিলাম, তন্দুর-মুরগি খাইয়াছি কিন্তু তন্দুর-মৎস্য?
অর্থাৎ তন্দুরে প্রস্তুত মৎস্য– ওভেন-বেকড ফিশ!
সে মৎস্য দেখিয়া মনে হইল অপকূ বস্তু। যেন মৃত মৎস্য খাইতে দিয়াছে। অথচ স্পর্শ করিবামাত্রই তিনি নমনীয় কমনীয় খণ্ডে খণ্ডে বিচ্ছিন্ন হইলেন। তন্দুরের উষ্ণতা চতুর্দিক হইতে সমভাবে মৎস্যের সংলগ্ন হইয়াছে বলিয়া তিনি অপূর্ব রসনাভিরাম রবস্তু হইতে সক্ষম হইয়াছেন।
নাদির শাহ আদেশ দিল, ইহার সঙ্গে কিঞ্চিৎ ভিয়েনিজ ক্রোয়ার্স ভক্ষণ কর।
তুর্করা যখন ভিয়েনার নগরদ্বারে পরাজিত হইয়া পলায়ন করিতে বাধ্য হয় তখন সেই ঘটনার স্মরণার্থে ভিয়েনা-বাসীরা অর্ধচন্দ্রের (ক্রোয়ার্স-ক্রিসেন্ট) আকারে এক কোমল অথচ মর্মরিত রুটি নির্মাণ করে। অতিশয় উপাদেয় লঘু খাদ্য।
অতঃপর তন্দুরি-মুরগি এবং আফগানি নান-রুটি। তাহার বর্ণনা আমার সুরসিক পাঠকদিগকে পূর্বেই নিবেদন করিয়াছি।
নাদির শাহ একাধাধিক নিষিদ্ধ পক্ষী ভক্ষণকরতঃ বলিল, এইবারে সত্য আহার আরম্ভ হউক। ওয়েটারকে বলিল, মটর-কোপ্তা-বিরিয়ানি, আলু-মটরশুটি মুরগি কারি, কিঞ্চিৎ কোপ্তা নরগিস্ (কলিকাতার ডেভিল) এবং অত্যল্প শূল্যপক মিশরি কাবাব (কলিকাতার শিক কাবাব)। আর দেখ, মুরগি-কারিতে যদি যথেষ্ট ঝোল না থাকে তবে এক পাত্র রৌগন-জুশ এবং কিঞ্চিৎ ক্রিম-লেটিস সালাড। উপস্থিত (এবং এই শব্দটি নাদির যথেষ্ট দঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ করিল) ইহাই যথেষ্ট।
আমাকে জিজ্ঞাসা করিল, বলিতে পারো, মূর্খেরা সালাড় কেন জলপাই (অলিভ) তৈল দিয়া প্রস্তুত করে? সেই তৈলে না আছে গন্ধ না আছে কোনওপ্রকারের তীব্রতা। সালাডের পক্ষে বঙ্গদেশে প্রচলিত সরিষার তৈলই প্রশস্ততম। তুমি এক কাজ কর। কিঞ্চিৎ মাস্টার্ড জলে তরল করতঃ সালাডের সঙ্গে সংমিশ্রণ করিয়া দাও।
ধন্য ধন্য নাদির শাহ; তুমি বঙ্গভূমিতে পদার্পণ না করিয়াও কী প্রকারে অবগত হইলে আমরা স্ফীততণ্ডুল সরিষার তৈল সহযোগে ভক্ষণ করি।
আহারে ক্ষান্ত দিয়া নাদির বলিল, ইহারা ঘৃতসিক্ত উত্তম পরোটা নির্মাণ করিতে জানে না। নতুবা পোলাও-কারির অন্তরালে মধ্যে মধ্যে সেই বস্তু চর্বণ রসনাকে বহ্বান্ন ভক্ষণে উৎসাহিত করে।
অতঃপর নাদির শাহ বলিল, মিষ্টান্ত সম্বন্ধে অহেতুক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হইয়ো না। আমি তাহার সুব্যবস্থা করিয়াছি।
রসগোল্লা লেডিকিনি এবং সন্দেশ!!
নাদির বলিল, শুনিয়াছি, কলিকাতার তুলনায় নিকৃষ্ট। তুমি অপরাধ নিয়ো না।
ধন্য নাদির। নাদির ভারত জয় করিয়াছিল; তুমি খাদ্যব্রহ্মাণ্ড জয় করিয়াছ।
আশা করি, এই খাদ্যনির্ঘণ্ট দেহলি প্রান্তাগত বঙ্গবাসী স্মরণ রাখিবেন। আমাকেও।
.
১৩.
ভারতীয় জ্ঞানবিজ্ঞানের বহু বহু পুস্তক এদেশে লোপ পেয়েছে, কিন্তু অনুবাদ তিব্বত, চীন, মধ্য এশিয়া, মঙ্গোলিয়া এবং পূর্ব তুর্কিস্থানের নানা ভাষাতে এখনও পাওয়া যায়। শুধু বৌদ্ধ মঠেই যে এদের সন্ধান মেলে তা নয়, মধ্য এশিয়ার বালির নিচ থেকেও এসব অনুবাদের বই এখন বেরুচ্ছে।
ভারতবর্ষীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশ এবং তার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নির্মাণের জন্য এসব অনুবাদ গ্রন্থ অবর্জনীয়। কিন্তু প্রশ্ন এই বিরাট কর্মভার গ্রহণ করতে যাবে কে?
কিছুকাল পূর্বে নাগপুরে শ্রীযুক্ত রঘুবীর ভারতীয় সংস্কৃতির আন্তর্জাতিক পরিষদ (ইন্টারন্যাশনাল একাডেমি অব্ ইন্ডিয়ান কালচার) প্রতিষ্ঠা করেন। এ পরিষদের কাজ যাতে করে দেশ-বিদেশের গুণী-জ্ঞানীদের সাহায্যে ভালো করে গড়ে ওঠে, তার জন্য পরিষদ জাপান, ইন্দোচীন, ইন্দোনেশিয়া, বৰ্মা, সিংহল, ভারতবর্ষ, ফ্রান্স, ইতালি, জর্মনি, ইংলন্ড, হল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্যের পণ্ডিতদের সহায়তা চেয়ে আহ্বান জানান এবং ইতোমধ্যেই সহৃদয় উত্তর পেয়েছেন।
দিল্লিতে এসে শ্রীযুক্ত রঘুবীর বললেন, পশ্চিম জার্মানির মারবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শ্ৰীযুত নোবেল মহাযান বৌদ্ধধর্মের সুবর্ণ প্রভাসসূত্র পুস্তকখানা সর্বপ্রথম প্রকাশ করবেন। পরিষদ ক্রমশ কী কী পুস্তক বের করবেন তার একটি খসড়াও অধ্যাপক নোবেল তৈরি করেছেন।
এ অতি উত্তম প্রস্তাব কোনও সন্দেহ নেই। ভারতের বৈদগ্ধ্যগত ইতিহাসের প্রতি যাঁরই কণামাত্র মমতা আছে, তিনিই এ কর্মে সহায়তা করবেন এ বিশ্বাস আমাদের মনে আছে। আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, একমাত্র ভারতীয় পণ্ডিতেরাই যদি একাজে সহায়তা করেন, তা হলেই অল্পদিনের ভিতর বিস্তর উন্নতি দেখানো সম্ভবপর হবে।
