৬. এ আলোচনার বিবরণী কখনও প্রকাশিত হয়নি। তবে এনডুজ সাহেব আশ্রমে ফিরে ঘরোয়া বৈঠকে আমাদের একটা প্রতিবেদন দেন কিন্তু আমাদের নোট নিতে মানা করেন। আমি ঘরে ফিরে যতখানি মনে ছিল গরমাগরম লিখে ফেলি। সে পাণ্ডুলিপি কাবুলে বিদ্রোহের সময় বরিয়ে যায়। তাতে করে বিশেষ ক্ষতি হয়নি। এ আলোচনার সারাংশ না হোক, বিষয়বস্তু পাঠক প্রাগুক্ত পুস্তকের ৮২-৮৩ পৃষ্ঠায় পাবেন।
৭. পিরিলি খেতাবটি নাকি মুসলমান বাদশা ঠাকুর গোষ্ঠী এবং তাঁদের আত্মীয়দের দেন। কথাটা পির এবং আলী শব্দের অশুদ্ধ সন্ধি। আমি যখন শান্তিনিকেতনে ছিলুম তখন গুরুদেবের এক পিরিলি আত্মীয় ছোকরা আমাকে বলে, ভাই তোর নাম মুজতবা আলী, আর আমার বংশের নাম পির আলী। দুজনারই পদবি আলী। আর ওই সিলেটি রাকেশ বলছিল তুই নাকি পির বংশের ছেলেও বটিস। তবেই দ্যাখ, তুই আমার কাছের কুটুম।
৮, শ্রদ্ধেয় সুশীলকুমার দের অত্যুত্তম বাংলা প্রবাদ গ্রন্থে আছে (নং ৪৯৯৯) পাঠায় কাটে, পাঠী নাচে, পাঠা বলে মগধেশ্বরী আছে। সুশীলবাবু এর টীকা লিখতে গিয়ে জে, ডি, এনডারসেন-এর ওপর বরাত দিয়ে বলেছেন, মগধেশ্বরী পুজোতে চট্টগ্রামে পাঠী বলি দেওয়া হয়।
৯. কথাটা খুবই সত্য। প্রাগুক্ত দেহলী বাড়িতে যখন কবি থাকতেন তখন দেখেছি তার ছিল (১) দু-খানা তক্তপোশ জুড়ে একটি ফরাস- তার গদি কোয়ার্টার ইঞ্চি পুরু হয় কি না হয় (২) মেসে পড়াশোনার জন্য যেরকম মিনিয়েচার টেবিল দেয় তারই এক প্রস্থ ও একখানা চেয়ার (৩) সামনে ন্যাড়া ছাতের উপর দু-একখানা বেতের কুশনহীন চেয়ার এবং (৪) বোধহয় উপাসনা করার জন্য একখানা হেলানো-হাতাহীন জলচৌকির মতো কাষ্ঠাসন। গোসলখানায় কী কী মহামূল্যবান জিনিস ছিল দেখিনি, তবে এমনই একটা সঙ্কীর্ণ করিডরের মতো ফালি জায়গায় সেটা ছিল যে সেখানে নূরজাহানের হাম্মাম থাকার কথা নয়।
ধন্য অবাঙালি!
ভিন্ন ভিন্ন জাত সম্বন্ধে পৃথিবীর লোক কতকগুলি ধারণা করে বসে আছে। যেমন স্কচ্ কিপ্টে, ফরাসি দুশ্চরিত্র, জর্মন ভোতা, ইংরেজ অবিশ্বাসী, এমনকি প্রখ্যাত ফরাসি সাংবাদিক মাদাম তাবুই-এর একখানা বই আছে যার শিরোনামা লা পেরফিড আলবিয়ে (বিশ্বাসঘাতক ইংরেজ) দিয়ে আরম্ভ। (অবশ্য তিনি তার পুস্তকে প্রমাণ করার চেষ্টা দিয়েছেন যে, এ কুসংস্কারের জন্য ইংরেজ সম্পূর্ণ দায়ী নয়, ফরাসিও অনেকখানি)।
এরকম ঢালাও জাতিবিচার থেকে ওই যে ধারকর্জ দেনেওলা আমাদের নিরীহ কলকাত্তাই পাঠানও (চলতি ভাষায় কাবুলিওয়ালা) মুক্ত নয়। আমাদের পার্ক সার্কাসের বাড়িতে আসত দুই ঈদের দিনে এক পাঠান। একবার কথায় কথায় বলল, আপকা কলকাত্তা শহমে বহুৎ আচ্ছা আলু, চান্না হোতা হৈ। আমরা তো অবাককলকাতা শহরের রাস্তার উপর যত লক্ষ লক্ষ গভীর গর্ত থাক না কেন, কোনওটাতেই তো আজ অবধি আলু বা চানা ফলতে দেখিনি সরকারের অধিক ফসল ফলাও কান ঝালাপালা-করা প্রপাগান্ডা সত্ত্বেও! পাঠান ফের বলল, ঘর ঘর মে। আমরা তো আরও সাত হাত পানিমে। শেষটায় বোঝ গেল পাঠান আলু চান্না বলতে আলোচনা বোঝাতে চেয়েছিল।
পাঠানের এই ঢালাও জাতিবিচার কিন্তু এস্থলে ভুল নয়। রকবাজি আড্ডাবাজিতে কলকাত্তাইয়া এখনও অলিম্পিকের গোল্ড মেডেল ধারণ করে। এই যে হালে আমরা নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ক্রিকেট খেললুম ঠিক তার উল্টোটি। ক্রিকেটের সঙ্গে তুলনা দিয়ে বলতে হলে আমাদের রক-আড্ডাবাজির টিমে আছেন চারটে রণজি, তিনটে ব্রাডম্যান, দুটো লারউড, একটা নিসার আর গুগলির জন্য ওই একটা বসাকে। তা সে-কথা থাক। পাঠান বাস করে খাঁটি বাঙালিপাড়ায়– সাম্-বাজারে। রাস্তার পর রাস্তা পেরুতে পেরুতে সুবোম নিতি নিত্যি দু-পাশে দেখে রকের পর রক–মহাসভা, কানে যায় আলু চান্না।
কিন্তু পাঠানের দ্বিতীয় জাতবিচারটা একদম ভুল বেরুল। বলল, কলকত্তেমে বহুত অচ্ছি ফারসি বোলি জাতি– হর রাস্তে পর। বলে কী? আলু আর চানা তবু না হয় বুঝি, হয়তো-বা পাঠান কলকাতার মুদির দোকানে ওই দুই বস্তু অত্যুত্তম সরেস জাতের পেয়েছিল। কিন্তু কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় অচ্ছি ফারসি বলা হয় এটা কেমনতরঃ পাঠান বোঝাল, দিনে অন্তত একশোবার সে শুনতে পায় বহু কণ্ঠে, কিন্তু সর্বদাই অনবদ্য ফারসি উচ্চারণে বৃ-তালাশে বক্রি। এস্থলে বাঙালি পাঠককে বোঝাই বৃ = with এবং for (যেমন বৃ কলমে বকলমে শেখ ফিরোজ, বা বহাল = বহাল তবিয়ং, বমল = বমাল গ্রেফতার তালাশ = তল্লাসি; এবং বক্রি = ছাগল। অর্থাৎ কোনও লোক বক্রির তল্লাসিতে (for বক্রি) বেরিয়েছে।
এ কী কথা! আমরা তো কখনও শুনিনি।
এমন সময় বাইরে ফেরিওয়ালার হাক শোনা গেল। পাঠান লম্ফ দিয়ে সোল্লাসে বলল, ওই তো বলছে বৃ-তালাশে বক্রি।
ওমা! ইয়াল্লা! ও হরি? ফেরিওলা চেঁচাচ্ছে বোতল আছে বিক্রি!
তাই বলছিলুম, এস্থলে পাঠানের জাতবিচারে ভুল হয়ে গেল।
এগুলোর নিষ্পত্তি তত সহজেই হয়ে গেল কিন্তু অন্যগুলোর বেলা? যেমন মনে করুন, লোকে বলে ফ্রান্সের লোক অসচ্চরিত্র। এবং সেই সূত্রে বহু বহু চুটকিলা প্রচলিত আছে। তারই একটি :
এক ফরাসি নিমন্ত্রিত হয়েছে এক মার্কিন পরিবারে। বিস্তর হইহুল্লোড়। ফরাসি সঠিক বুঝতে পারেনি পরবটা কিসের। পাশে বসেছিল এক মার্কিন। তাকে কানে কানে শুধোল, ব্যাপারটা কী? মার্কিন বুঝিয়ে বলল, ওই যে দেখতে পাচ্ছেন বুড়ো-বুড়িএরা পঞ্চাশ বত্সর সুখে সহবাস করার পর আজ তাদের বিবাহের সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছেন। ফরাসি বলল, অ বুঝেছি। এরা পঞ্চাশ বছর সহবাস করার পরই এই এখন বিয়ে করতে যাচ্ছেন। তার পর খানিকক্ষণ ঘাড় চুলকে বলল, তা– তা ওই নিয়ে এত তুলকালাম কাণ্ড কেন? আমরা তো আকছারই করে থাকি।
