কাপতান পালিয়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচায়। বংশরক্ষার জন্য সঙ্গে সঙ্গে জাহাজের মিস্ত্রিকে পাঠিয়ে দেয়।
হয়তো এ ঘটনা মুসসোলিনির কানে পৌঁছয়। হয়তো তাই এ ঘটনার ছ বছর পর গাঁধীজি যখন তার জাহাজে চড়লেন তখন তিনি পালাসো ভেনেসিয়া থেকে সেরা সেরা আসবাবপত্র পাঠান।
যে জাহাজে করে গাঁধী দেশে ফেরেন তার এক ইতালীয় স্টুয়ার্ড আমাকে এ কাহিনীটি বলে। আমি তার সবিস্তর বর্ণনা আমার বড়বাবু গ্রন্থে গান্ধীজির দেশে ফেরা নাম দিয়ে লিখেছি। এস্থলে সংক্ষেপে সারি।
গাঁধীজি জাহাজে উঠলেন। ভয়ে আধমরা (কারণ নির্মম ডিকটেটর মুসসোলিনির কানে যদি খবর পৌঁছয়– গুজব হোক আর না-হোক, লেজেন্ড হোক আর সত্য ইতিহাসই হোক যে– গাঁধীর পরিচর্যায় ক্রটি-জখম ছিল তা হলে বারোটা রাইফেলের গুলি খেয়ে তাকে যে ওপারে যেতে হবে সে বিষয়ে তিনি স্থির নিশ্চয়) তথাপি সগর্বে সদম্ভে গাঁধীজিকে দেখালেন তার জন্য স্পেশালি রিজার্ভড় প্রাসাদসজ্জায় গৌরবদীপ্ত আরাম-আয়েসের ইন্দ্রপুরী সদৃশ্য কেবিনগুলো। গাঁধীজির অনুরোধে তার পর তিনি তাকে দেখালেন বাদবাকি তাবৎ জাহাজ।
সর্বশেষে গাঁধী শুধোলেন, সবচেয়ে উপরে খোলা ডেক-এ (ছাতে যাওয়া যায় কি না?
কাপ্তান সানন্দে তাকে সেখানে নিয়ে গেলেন। উন্মুক্ত আকাশের নিচে বিরাট বিস্তীর্ণ ডেক।
গাঁধী বললেন, আমি এখানে তাবু খাঁটিয়ে বাস করব।
কাপ্তান বদ্ধ পাগলের মতো হাত-পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে গোঙরাতে গোঙরাতে বলল, অসম্ভব, অসম্ভব, সম্পূর্ণ অসম্ভব। এই ভূমধ্যসাগরে রাত্রে তাপমাত্রা নামবে শূন্যে। সুয়েজ খাল আর লোহিত সাগরে দুপুরের গরমি উঠবে ১১৪ তক। এমন কর্ম থেকে আপনাকে ঈশ্বর রক্ষতু।
গাঁধী ঝাড়া তেরোটি দিনরাত্রি কাটিয়েছিলেন উপরে। প্রতি সকালে মাত্র একবার নেমে আসতেন নিচে। প্রার্থনা করতে। সর্বশ্রেণির প্যাসেনজার নিমন্ত্রিত হতেন। শুনেছি খালাসিরাও বাদ যায়নি।
কিন্তু গাঁধীজির এই দুই প্রত্যাখ্যানের ভিতর অতলস্পর্শী পাতাল এবং গগনচুম্বী আকাশের পার্থক্য রয়েছে।
মুসসোলিনির ভেট ছিল আরাম-আয়েস বিশাল-ঐশ্বর্য। গাঁধী যে সেগুলো সবিনয় প্রত্যাখ্যান করবেন সেটা কিছু বিচিত্র নয়। কিন্তু রবি কবি গাঁধীর সামনে ধরেছিলেন সরল, অনাড়ম্বর সৌন্দর্য। কবিরই ভাষায় বলি,
দুয়ারে এঁকেছি
রক্তরেখায়
পদ্ম-আসন,
সে তোমারে কিছু বলে?
হায়, বলেনি।
———
১. ১৯২১-২২ রবীন্দ্রনাথ বাস করতেন দেহলী বাড়ির উপরের তলায়, নিচের তলায় সস্ত্রীক দিনেন্দ্রনাথ। তার সঙ্গে একেবারে লাগোয়া নতুন বাড়ি হসটেল ঘর। সেখানে শ্রীযুক্ত ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ, বিনোদবিহারী ইত্যাদিরা বাস করতেন। শেষ কামরায় স্বর্গত অনাথনাথ বসু এবং আপনাদের স্নেহধন্য এ অধম। সর্বশেষ কামরা রবীন্দ্রনাথের পেরিরূপে ব্যবহৃত হত। অর্থাৎ প্রতিমা দেবী, মীরা দেবী, কমলাদি (দিনুবাবুর স্ত্রী) রবীন্দ্রনাথের যে দৈনন্দিন আহার্য পানীয় পাঠাতেন সেগুলো প্রথম এ পেরিতে জড়ো করে (চাকরের নাম ছিল সাধু; বনমালী পরে আসে) রবীন্দ্রনাথকে সার্ভ করা হত। ওই ঘর পেরুবার সময় সবসময়ই চোখে পড়ত আহারাদি কী কী। আমার জানার কথা।
২. এই কবিতাটি নিয়ে আমার মনে ধন্দ আছে। এ দু লাইন থেকে বোঝা যায় কবি ব্যস্ত, চাষের নেমন্তন্নের জন্য এখনও সাজ করা হয়নি; অথচ তার ঠিক ষোল লাইন পরেই বলেছেন, বিশেষ কারণে তিনি যে বৃদ্ধ নন সেটা তিনি বুঝতে পেরেছেন। (তখন তার বয়েস ৬২) এবং বলেছেন,
এই ভাবনায় সেই হতে মন এমনিতরো খুশ আছে,
ডাকছে ভোলা খাবার এল আমার কী তার হুঁশ আছে?
এখন প্রশ্ন, কবি এই বললেন তিনি চায়ের নিমন্ত্রণে যাচ্ছেন এবং তার পরই নাকি ভোলা খাবার নিয়ে এসেছে। তবে কি লখনৌওলাদের মতো বাড়ি থেকে উত্তমরূপে খেয়ে নিয়ে দাওয়াতে যেতেন যাতে করে সেখানে খানদানি কায়দায় কম-সে-কম খাবেন। কিংবা ফরেসডাঙার এক বিশেষ সম্প্রদায়ের মতো যেখানে নিমন্ত্রিত মাত্র ভোজ্যবস্তুর প্রতি নজর বুলিয়ে জলস্পর্শ না করে বাড়ি ফিরে যান। বিশ্বাস না হয়, অবধূত রচিত নীলকণ্ঠ হিমালয়ে মল্লিখিত মুখবন্ধে এ বাবদে সবিস্তর বর্ণনা পড়ন।
৩, সিলেট ও খাসিয়া সীমান্তে একরকম অতুলনীয় মধু পাওয়া যায়। এ মধু মৌমাছিরা সুদ্ধমাত্র কমলালেবুর ফুল থেকে সংগ্রহ করে (সিলেটি কমলালেবুও পৃথিবীতে সবচেয়ে মিষ্ট এবং সবচেয়ে সুগন্ধি, যদিও জাফার নেবুর চেয়ে সাইজে ছোট)। ছুটিতে দেশে যাবার সময় গুরুদেব আমাকে বললেন, পারিস যদি আমার জন্য কিছু কমলামধু নিয়ে আসিস। আমি খুশি হয়ে বললুম, নিশ্চয়ই আনব কিন্তু কাশ্মিরের পদ্মমধু কি এর চেয়ে আরও ভালো নয়। শুরুদেব স্মিত হাস্য করলেন। ভাবখানা কিসে আর কিসে।
৪. শ্ৰীযুক্ত প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় তার রবীন্দ্রজীবনীর দ্বিতীয় খণ্ডে (পরিবর্ধিত সংস্করণ ১৩৫৫) লিখছেন : দুই মহাপুরুষের প্রথম সাক্ষাক্তার হইল (৬ মার্চ ১৯১৮)। পৃ. ৩৭৭। এটা বোধহয় ছাপার তুল। হবে ১৯১৫।
৫. রবীন্দ্রনাথের সর্বগ্রজ দ্বিজেন্দ্রনাথ (একুশ বছরের বড়। কিন্তু গোড়ার থেকেই সত্যাগ্রহ আন্দোলন সমর্থন করে গাঁধীকে পত্র লেখেন। গান্ধীজির ভক্তেরা, আশা করি অপরাধ নেবেন না, যদি বলি, হিন্দু শাস্ত্র গ্রন্থরাজির সঙ্গে গান্ধীজির খুব নিবিড় পরিচয় ছিল না। ওদিকে দ্বিজেন্দ্রনাথ ছিলেন সর্বশাস্ত্ৰ তথা সর্বদর্শন বিশারদ। তাই গান্ধীজি খুব একটা বল পেয়েছিলেন যে তার আন্দোলন শাস্ত্রসম্মত এবং হিন্দু-ঐতিহ্যপন্থী। দ্বিজেন্দ্রনাথকে গাধী ডাকতেন বড়দাদা বলে। ১৬ জুলাই (অর্থাৎ গাঁধী ভেটের প্রায় মাস দেড়েক পূর্বে ১৯২১-এ) রবীন্দ্রনাথ ইয়োরোমেরিকা ভ্রমণের পর আশ্রমে ঢুকেই দ্বিজেন্দ্রনাথকে প্রণাম করতে যান। কুশলাদি জিগ্যেস করার পর তিনি একাধিকবার রবীন্দ্ৰনাথের সঙ্গে অসহযোগ আন্দোলন নিয়ে আলোচনা করবার চেষ্টা দেন– কারণ তিনি জানতেন, রবীন্দ্রনাথ এ আন্দোলনের বিরোধী কিন্তু অতিশয় তার সঙ্গে এবং দৃঢ়ভাবে রবীন্দ্রনাথ সে আলোচনার গোড়াপত্তন করতে দিলেন না। অন্যান্য ছাত্রদের সঙ্গে আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলুম।
