পাঠানের গল্প যেরকম জাতিবিচারের ব্যাপারে পরখ করা গেল, এখানে তো তা করা যাচ্ছে না। তবে কি সত্যিই হুদো হুদো ফরাসি ত্রিশ-চল্লিশ-পঞ্চাশ বৎসর সহবাস করার পর বিয়ে করে প্রধানত জারজ সন্তানদের আইনত সন্তানরূপে স্বীকৃতি দেবার জন্যে?
কিন্তু এ বিষয়ে ফরাসিদের নিয়েই এ গল্পটা তৈরি হল কেন? আমরা একটি সত্য ঘটনা জানি, এবং সেটা অস্ট্রিয়া দেশের ব্যাপার।
জনৈক অস্ট্রিয়ার লোক, যোহান গেও হিটলার যখন একটি কুমারীকে বিয়ে করলেন, তখন সেই কুমারীর একটি পাঁচ বছর বয়সের ছেলে ছিল। বিয়ের পাঁচ বছর পর ওই মহিলার মৃত্যু হয়। সঙ্গে সঙ্গে য়োহান হিটলার অস্ট্রিয়া থেকে অন্তর্ধান করলেন। তার সুদীর্ঘ ত্রিশ বৎসর পর তিনি আবার ফিরে এলেন মাতৃভূমিতে এবং একজন উকিল ও দুজন সাক্ষীর সামনে শপথ নিয়ে বললেন, তার বিয়ের পাঁচ বছর পূর্বে ওই যে সন্তান জন্মেছিল সে তারই ঔরসের সন্তান।
এই লোকটি জর্মনির ফুরার আডলফ হিটলারের পিতা।*[* W. Shirer; Aufsteg unid Fall in S. W. TOT 91]
.
এতক্ষণ ধরে আমি শুধু পটভূমি নির্মাণ করেছিলুম। এইবারে দেখি, সেয়ানা পাঠক, তোমার পেটে এলেম কতখানি।
মার্কিনরা চাঁদে গেছে শুনে আমাদের কেন্দ্রীয় সরকারের আত্মসম্মানবোধ হুঙ্কার দিয়ে বলল, ভারতীয়েরাও যাবে। কিন্তু শ্ৰীযুত সত্যেন বসু এ বাবদে উদাসীন। তাই কাগজে কাগজে বিজ্ঞাপন বেরুল, চাদে যারা যেতে চান তারা আবেদন করুন। বিস্তর দরখাস্ত এল। শেষ পর্যন্ত মাত্র তিনজনকে ইন্টারভুর জন্য ডাকা হল, একজন বাঙালি, বাকি দুজন ভিন্ন প্রদেশের।
যে কর্তা ইন্টারভ নিচ্ছিলেন তিনি প্রথম ডেকে পাঠালেন বাঙালিকে। শুধোলেন, চাদে যাওয়ার জন্য কত টাকা চান?
পাঁচ লাখ।
অত কেন?
এজ্ঞে, বুড়ো মা-বাপ রয়েছে। বোনটির বিয়ে দিতে হবে। দুটো ছোট ভাই ইস্কুলে যায়। বিধবা পিসিও রয়েছেন। চাঁদ থেকে ফিরে না আসতে পারলে ওই টাকাতেই তাদের চলে যাবে।
কর্তা : আচ্ছা, পরে জানাব।
তার পর ডাকা হল দ্বিতীয় জনকে। সে প্রদেশের লোক, একটু ফুর্তিফার্তি করতে ভালোবাসে। বলল, দশ লাখ।
কর্তা : অত কেন?
হানজি পাঁচ লাখ দিয়ে মদ্যপানাদি, কাবারে গমন, হে হে রমণীসঙ্গ ইত্যাদি ইত্যাদি। ফিরে তো না-ও আসতে পারি; তাই সর্বশেষ শখটখ। বাকি পাঁচ লাখ রেখে যাব বুড়ো মা, বাপ, অবিবাহিত ভগ্নী, দুই ভাই, বিধবা পিসির জন্য
কর্তা : আচ্ছা, পরে জানাব।
এর পর এলেন তৃতীয় এক প্রদেশের লোক। ইনি চাইলেন পনেরো লাখ।
কর্তা তাজ্জব মেনে বললেন, অত বেশি কেন?
সঙ্গে সঙ্গে লোকটি ডাইনে-বাঁয়ে দরজার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে টেবিলের উপর বুকে ফিসফিস করে বলল–
বাবুজি, পনেরো লাখের পাঁচ লাখ তো তোমার। পাঁচ লাখ আমার। আর বাকি পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে ওই ব্যাটা বাঙালিকে চাঁদে পাঠিয়ে দেব।
এইবারে পাঠক, বের কর তো, দোসরা আর তেসরা ওমেদার কোন কোন প্রদেশের লোক? কিন্তু সাবধান! প্রকাশককে এ বাবদে চিঠি দেবে না। তিনি ছাপাবেন না। আমাকেও লিখবে না। আম্মো উত্তর দেব না।
নট গিলটি
সর্বপ্রথম যেদিন আমার লেখা ছাপাতে বেরুল তার কয়েক দিন পরই আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক মহাশয় আমাকে একখানি চিঠি রিডাইরেক্ট করে পাঠালেন। চিঠিখানা আমার উদ্দেশে লেখা। পত্রলেখক আমার ঠিকানা জানেন না বলে সেটি সম্পাদকের C/o করে লিখেছেন। এইটেই বিচক্ষণের লক্ষণ। এবং বহু বত্সরের অভিজ্ঞতা-সঞ্চিত আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিবলে, যেসব স্পর্শকাতর পাঠকপাঠিকা কারও লেখা পড়ে মুগ্ধ হন, বিরক্ত হন বা বিচলিত হন তারা যেন তাদের মানসিক, হার্দিক প্রতিক্রিয়া সম্পাদকের মারফতে লেখকের কাছে পাঠান। এবারে বাকিটা বলছি।
প্রথম গোটা পাঁচেক চিঠি তো আমাকে অভিনন্দন জানাল। তার ধরন অবশ্য ভিন্ন ভিন্ন। কোনও কোনও পত্ৰলেখক আমাকে সবিনয়, সসম্মান, সশ্রদ্ধ আনন্দভিবাদন জানাল, আর কোনও কোনও লেখক আমার পিঠ চাপড়ে মুরুব্বিয়ানা মোগলাই কণ্ঠে বললেন, বেশ লিখেছিস ছোঁড়া, খাসা লিখেছিস। লেগে থাক। আখেরে টু-পাইস কামাতেও পারবি।
দ্বিতীয় পক্ষের মুরুব্বিয়ানা আমাকে ঈষৎ বিরক্ত করেছিল, সেকথা আমি অস্বীকার করব না। কিন্তু সেটা ক্ষণতরে। কারণ, আমি কাগজে লেখা আরম্ভ করি, বিয়াল্লিশ বছর বয়সে। ততদিনে বাস্তব জীবনে নানা প্রকারের চড়-চাপাটি খেয়ে খেয়ে আমার দেহে তখন দিব্য একখানা গণ্ডারের চামড়া তৈরি হয়ে গিয়েছে। বিস্তর মুরুব্বি এতদিন ধরে, আমার কর্মজীবনে আমার পিঠ চাপড়ে আমাকে এন্তের সদুপদেশ দিয়েছেন। কই? আমি তো তখন চটিনি। অবশ্য এনারা উপদেশ দিয়েছিলেন বাচনিক; উপস্থিত যেসব এই জাতীয় মুরুব্বিয়ানার চিঠি আসছে সেগুলো লেখনিক।
তাতে কীই-বা যায়-আসে!
কিন্তু আমার মনে তখন প্রশ্ন জাগল, এসব তাবৎ ব্যক্তিগত চিঠির প্রত্যেকটির উত্তর আমাকে স্বহস্তে লিখতে হবে কি না?
তা হলেই তো হয়েছে! কতখানি সময়, শক্তিক্ষয়, ডাকটিকিটের ব্যয়, কে জানে?
আমার টাইপরাইটার আছে। আমি অবশ্যই আধঘন্টার ভিতর খান তিরিশেক কার্বন কপি তৈরি করতে পারি। তার বক্তব্য হবে Many Thanks for your good wishes.
.
উঁহু! হল না।
যারা চিঠি লিখেছেন তারা সাহিত্যরসিক-রসিকা। তারা চান, সাহিত্যিক উত্তর। লড্রির চিঠিতে প্রশ্ন, আপনার অত অত নম্বরের জামাকাপড় ছাড়াচ্ছেন না কেন? আপনি তখনই ওই গদ্যময় বেরসিক ভাষায়ই উত্তর দেবেন। কিন্তু এনারা তো সাহিত্যিক উত্তর চান।
