আবার দেখ, গাধীজি তাঁর সত্য-উপলব্ধির প্রতীক চরকা সবাইকে বিলোচ্ছেন। আমরা হাত পেতে নিচ্ছি কিন্তু আমরা কোনও প্রতিদান দিচ্ছিনে কারণ আমাদের মতো সাধারণ লোকের কীই-বা আছে যে তাঁকে দেব? কিন্তু গুদেবের বেলা তো সেকথা নয়। তিনি সুন্দরের পূজা করে অনেককিছু পেয়েছেন। কই, গাঁধী তো তার কাছ থেকে নিলেন না! এমনকি এই যে সামান্য সাজানো কামরা কটি– তার ফুল, কিছু আল্পনা কোনওকিছুই লক্ষ করলেন না– গ্রহণ করলেন না।
তাই বলি, সৈয়দ, সংসারটা চলে গিভ অ্যান্ড্র টেকের ওপর।
.
উপসংহারে নিবেদন, বলা বাহুল্য, গুরুদেবকে নিয়ে যে আমি উত্তম পুরুষে কথা বলিয়েছি তার অধিকাংশই আমার কল্পনাপ্রসূত। কারণ যদিও গাঙ্গুলীমশাই গুরুদেবের কথাবার্তার চো আনা আমাকে সে সময়ে ঠিক ঠিকই বলেছিলেন তবু ভুললে চলবে না, পূর্বেই নিবেদন করেছি, গাঙ্গুলীমশাই ছিলেন পয়লা নম্বরি কীর্তনিয়া–রাকোতর। নিশ্চয়ই তার বর্ণনায় বেশ খানিকটে রঙচঙ চড়িয়ে ছিলেন– ইচ্ছা-অনিচ্ছায়।
তদুপরি তিনি আমাকে কাহিনীটি বলেন, ১৯২৫-এ। আর আমি এ কাহিনী লিখছি ১৯৬৯-এ!! কিন্তু মূল ঘটনাগুলো যে সত্য তার গ্যারান্টি আমি দিচ্ছি (কারণ এ ঘটনা পরে আরেকবার ঘটে- তবে সেখানে পাত্র গাঁধী ও মুসসোলিনির প্রতিভূ এক জাহাজ-কাপ্তান)।
অবশ্য আমি দুই লাইনেই এ কাহিনী শেষ করতে পারতুম। যথা : গুরুদেব অতিশয় সযত্নে ঘর সাজালেন। তার সৌন্দর্য গাঁধীজির চোখে পড়ল না। কিন্তু তা হলে তো লেজেন্ডের গোড়াপত্তন হয় না–রবিপুরাণ কাহিনী নির্মিত হয় না।
আরেকটি কথা বলার খুব যে একটা প্রয়োজন আছে তা নয়। তবু বলি। সুচতুর পাঠক অতি অবশ্যই বুঝে গিয়েছেন, গুরুদেবের মুখে আমি যে ভাষা বসিয়েছি, অতি অবশ্যই গুরুদেব ওরকম কাঁচা বাংলা বলতেন না। এবং সহৃদয় পাঠক বুঝে গিয়েছেন বলেই আমাকে মাফ করে দিয়েছেন। প্রবাদ আছে- টু আন্ডারস্টেন্ড ইজ টু ফরগি।
এবং গাঙ্গুলীমশাইয়ের ভাষারও জেল্লাই জৌলুস জ্যান্ত জিন্দা করতে পারিনি আমি–দীর্ঘ চুয়াল্লিশ বছর পর।
সর্বশেষে বক্তব্য এটা লেজেন্ড, রূপকথা, পুরাণ। ইতিহাস নয়।
.
দ্বন্দপুরাণ উপরেই শেষ হল। কিন্তু গাঁধী-পুরাণের অন্য এক কাহিনীর ইঙ্গিত আমি এইমাত্র দিয়েছি। সেটি বলিনি। সে-ও মজাদার।
দ্বন্দপুরাণের ছ বছর পরের ঘটনা। ১৯৩১ রাউন্ড-টেবিল সেরে গাধীজি দেশে ফেরার জন্য বেছে নিলেন একখানা ইতালির জাহাজ। ইল দুচে বেনিতো মুসসোলিনি তো ড্যাম গাড়ি। (ওদিকে জর্মন জাত বড় নিরাশ হয়েছিল। গাধী বলেছিলেন, রাউন্ড-টেবিলে তিনি যদি সফলতা লাভ করেন তবে ইয়োরোপে যে একটিমাত্র জায়গা দেখার তার ঐকান্তিক কামনা আছে সেটিকে তিনি তীর্থযাত্রীরূপে শ্রদ্ধা জানিয়ে দেশে ফিরবেন– ভাইমার, কবি গ্যোটের লীলাভূমি ও সমাধিস্থল। কিন্তু গোলটেবিলে নিষ্ফল হলেন বলে সোজা দেশে ফেরেন।) মুসসোলিনি খবর পাওয়া মাত্র বললেন, যে জাহাজে গাঁধী যাবেন সেটা অত্যুত্তম, কিন্তু তার সেরার সেরা কাবিনা লুসোরিয়োজা (সাধু সাবধান! ইতালীয় ভাষার সঙ্গে আমার অতি সামান্য নমস্কার-প্রতিনমস্কারের পরিচয়– ভুল হতে পারে। অর্থ হচ্ছে কাবিন দ্য ল্যুকস, লাকসারি কেবিন, সবচেয়ে আক্রা ভাড়ার বিলাস কেবিন) নিশ্চয়ই রাজা মহারাজা ফিল্টারের পক্ষে যথেষ্টরও বেশি, কিন্তু গাঁধী এখানে এসে তিনি যে অলঙ্কার ব্যবহার করলেন তার ইংরেজি আছে- গাঁধী? হি ইস নট এভরিবডিজ কাপ অব্ টি– বাংলাতে মেরেকেটে বলা যেতে পারে, ভিন্ন গোয়ালের একক গোমাতা, মা ভগবতী কিংবা আমরা যেরকম বলি কানু ছাড়া গীত নেই, তার সঙ্গে মিলিয়ে গাধী ছাড়া নর নেই। আরবরা বলে, গাঁধী মহারাজের কাহিনী সব কাহিনীর মহারাজা। তার পর হুকুম দিলেন, গাঁধীকে সবসে বঢ়িয়া কেবিন দাও একটা না, সুইট অব কেবিন। বেডরুম, ড্রয়িংরুম, এন্টিরুম (ভিজিটরদের জন্য প্রতীক্ষাগৃহ), আপন খাস ডাইনিংরুম ইত্যাদি ইত্যাদি। লক্ষপতিদের বুকিং কেনসেল করে। আর তোমাদের দ্য লুকস্ কেবিনের সোফা কোচ বিছানা বাথরুম লক্ষপতিদের জন্য গুড ইনাফ, মলটো বুয়োনো (ভেরি গুড়) কিন্তু গাধীর জন্য নয়। পালাদসো ভেনেসিয়া (ভেনিস পেলেস–ইটালির প্রায় সর্বোত্তম প্রাসাদ) থেকে তাবৎ ফার্নিচার পাঠাও। সর্বশেষে বললেন, ওই অচ্ছি অচ্ছি তাগড়ি বকরি, দুধকে লিয়ে। এই ফার্নিচার পাঠানোর পিছনে হয়তোবা কিঞ্চিৎ ইতিহাস আছে। এখানে আবার গুরুদেব প্রধান পাত্র।
যারা কবিগুরুর মৃত্যুর পর তার বধূমাতা স্বর্গীয় প্রতিমা দেবীর নির্বাণ পুস্তিকা পড়েছেন, তারাই জানেন, অসুস্থাবস্থায় তিনি কিছুদিন কাটান তার এক প্রিয়া শিষ্যার বাড়িতে, দক্ষিণ আমেরিকার আরজেনটিনায়। এর নাম ভিকরিয়া (অর্থাৎ বিজয়া এবং কবি দেশে ফিরে একেই তার পরের গ্রন্থ উৎসর্গ করেন। কবির সঙ্গে তোলা এঁর ছবি পাঠক পাবেন পূরবী কাব্যে, বিশ্বভারতী সংস্করণ রবীন্দ্ররচনাবলী চতুর্দশ খণ্ড, ১০৫ পৃষ্ঠার মুখোমুখি। একে উদ্দেশ করে কবি একগুচ্ছ কবিতা লিখেছেন পূরবীতে বিদেশি ফুল অতিথি ও অন্যান্য কবিতা দ্রষ্টব্য) ও কাম্পো। কবি দেশে ফেরেন ইটালিয়ান জুলিয়ো চেজারে (জুলিয়াস সিজারের ইতালির উচ্চারণ) জাহাজে করে। জাহাজে বিদায় দিতে এসে ভিকরিয়া দেখেন (পূরবীর বদল ও গীতবিতানের তার হাতে ছিল গান দ্রষ্টব্য শ্ৰেতব্য) যে, যদিও কবিকে সর্বোত্তম দ্য লুকস্ কেবিন দেওয়া হয়েছে তবু সদ্য রোগমুক্ত জনের জন্য হেলান দিয়ে বসার আরামকেদারা সেখানে নেই। তিনি তদণ্ডেই লোক পাঠালেন বাড়িতে; যে আরাম কেদারায় অসুস্থ কবি বসতে ভালোবাসতেন সেইটে নিয়ে আসতে। বিরাট সে কেদারা, তাই কেবিনের ছোট দরজা দিয়ে ঢোকে না। ভিকরিয়া ডেকে পাঠালেন জাহাজের কাপ্তানকে। বিরাট জাহাজের কাঁপতেন হেজিপেজি লোক নয়– তাকে ডেকে পাঠানো যে সে লোকের কর্ম নয়। তাই এস্থলে বলে রাখা ভালো, তার অর্থসম্পত্তি ছিল প্রচুরতম এবং তাৰং আর্জেন্টাইনের রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপর তার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারিত। তিনি সুসাহিত্যিক, প্রভাবশালী মাসিকের সম্পাদিকা এবং পরবর্তীকালে তিনি ইউনাইটেড নেশনসের একাধিক বিভাগে তার দেশের প্রতিভূ হয়ে খ্যাতি অর্জন করেন। টাইম সাপ্তাহিকে আমি সে বিবরণী পড়েছি ও তার ছবি সেখানে দেখতে পেয়েছি। রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিক উত্সবে আরজেনটাইন ডাকবিভাগ কবির ছবিসহ বিশেষ স্ট্যাম্প প্রকাশ করে ভিকরিয়ারই জোরদার প্রস্তাবে। এবং তিনি নির্দেশ দেন, ডাকবিভাগ যেন কবির কোন ছবি ছাপা হবে তাই নিয়ে মাথা না ঘামায়। ভারত যে ছবি ছাপাবে সেটা তিনি কবিপুলের কাছ থেকে আনিয়ে ডাকবিভাগকে দেবেন। ডাকবিভাগ মাতার সুপুত্রের মতো তাবৎ নির্দেশ মেনে নেয়। এই স্ট্যাম্প খামে সেঁটে ভিকরিয়া কবিপুত্রকে একখানা চিঠি লেখেন; আমি সেটি দেখেছি। যা বলছিলুম : কাপতানকে ভিকরিয়া হুকুম দিল কেবিনের দরজা কেটে কেদারা ঢোকাও।* [** এ কেদারার শেষ ইতিহাস পাঠক পাবেন, কবির সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ শেষলেখাতে। এ ঘটনার দীর্ঘ ষোল বৎসর পরে, কবি তার মৃত্যুর পাঁচ মাস পূর্বে রোগশয্যায় সেই কেদারাখানা খুঁজে নিয়ে (ছাপাতে আছে খুঁজে দেব– হবে খুঁজে নেব) তার উদ্দেশে একটি মধুর কবিতা লেখেন। শেষলে কাব্যের ৫ নং কবিতা পণ্য।] বলে কী? দ্য লস কেবিনের দেয়াল করাত দিয়ে কেটে তার অঙ্গহানি করা। কাপতান গাইগুই করছে দেখে জাতে দজ্জাল সেই স্পেনিশ রমণী আরম্ভ করলেন ভর্ৎসনা, অভিসম্পাত, কাপতানের আসন্ন পতনের ভবিষ্যদ্বাণী-মুষলধারার বাক্যবাণে তাকে জর্জরিত করতে। এ ঘটনা স্বয়ং কবি কনফার্ম করেছেন। তিনি পুরো ঘটনাটির বর্ণনা দিতে গিয়ে এস্থলে, বলেন, আমি স্পেনিশ ভাষা জানিনে। কিন্তু তিকরিয়ার সেই জ্বালাময়ী ভাষার কটুবাক্যের রসগ্রহণে আমার কণামাত্র অসুবিধা হয়নি।
