ইতোমধ্যে সেই মানওয়ারি জাহাজ সাইজের পালঙ্ক এল।
আমি এ কাপড়, ও শিট দেখাই। তিনি নামঞ্জুর করেন। শেষটায় না পেরে বললুম, সিন্দুকটা নিচে রয়েছে। উপরে নিয়ে আসব কি? এক ঝলক হেসে বললেন, না, আমি নিচে যাচ্ছি। সেখানে চেয়ারে বসে শেষ রুমাল অবধি নেড়ে-চেড়ে পরখ করলেন, বাছাই করলেন। তার পর ফের উপরে এসে চেয়ারে বসে বিছানা তৈরি করা বাবদে পই পই করে বালালেন, কোন শিটটা উপরে যাবে, কোনটা নিচে ইত্যাদি ইত্যাদি। আরও মেলা মেলা বায়নাক্কা ঝামেলা। জলের কুঁজোটা কোথায় থাকবে, নাইট-টেবিলের পাশে ছোট্ট শেলফে কী কী বই থাকবে– সেসব কথা বলতে গেলে বাকি দিনটা, চাই কি রাতটাও কাবার হয়ে যেতে পারে। সংক্ষেপে সারি। হঠাৎ বললেন, চল গাঙ্গুলী, স্নানের ঘর দেখে আসি। ঢুকেই বললেন, একী কাণ্ড! সরাও এখুনি ওই জিন টাটা। নিয়ে এস আমার স্নানের ঘর থেকে পেতলের বড় গামলাটা। আর এখানেই একটা বোয়ামে আছে বেসন। নিয়ে এস একটা রুপোর কৌটোতে করে। সাবানটা সরাও। আমি বললুম, ওটা গডরেজের ভেজিটেবল সোপ। তা হোক। ফেলে দাও ওটা। আর ওই টার্কিশ টাওয়েলটাও সরাও। সিন্দুক থেকে নিয়ে এস খদ্দরের ভোয়ালে, আর একখানা সবচেয়ে সরেস গামছা। নিমের দাঁতন কই? আমি ভয়ে ভয়ে বললুম, ওঁর তো দাঁত নেই, আর্টিফিসিয়াল আছে কি না জানিনে। তা হোক, নিয়ে এস দাঁতন। আর ক্ষিতিমোহনবাবুর স্ত্রীকে বল, আজই যেন সুপরি পুড়িয়ে বাকি সব তিনি জানেন টুথ পাউডার বানিয়ে পাঠিয়ে দিতে। বুঝলুম, কোনও নবীন দশনসংস্কারচুর্ণ ক্ষিতিমোহনের স্ত্রী বদ্যি-গিন্নি তো।
করে করে সবকটা তৈরি হল। সেই ১১৪ গরমে আর ক্লান্তিতে আমি আর দাঁড়াতে পারছি না। বৃদ্ধ প্রভু কিন্তু খুট খুট করে দিব্য এ-ঘর ও-ঘর করছেন।
দম নিয়ে গাঙ্গুলীমশাই বিরাট এক তাওয়া সাজাতে সাজাতে বললেন, তোমার প্রাণ যা চায় সেই দিব্যি, কসম, কিরে আমাকে কাটতে বললে আমি এখুনি সেইটে কেটে বলব আমার দৃঢ়তম বিশ্বাস কোনও বধূ তার বরের জন্য, কোনও প্রেমিক তার প্রিয়ার জন্য কস্মিনকালেও এরকম বাসরঘর মিলনশয্যা তৈরি করেনি। আর গুর্দেবও এ কর্ম পূর্বে কখনও করেননি সে বিষয়ে আমি আদালতে তিন সত্যির দোহাই দিয়ে কসম খেতে রাজি আছি।
আরেকটা কথা শোন, সৈয়দ। গুদেবের মতো স্পর্শকাতর, সুন্দরের পূজারি যখন সব হৃদয় ঢেলে দিয়ে কোনও কিছু সুন্দর করে গড়ে তুলতে চান–এই যেমন এ বাড়িটাকে তার চরম সুন্দর রূপ দেওয়া তখন তার হাজার মাইল কাছেও আসতে পারে কোন প্রফেশনাল ডেকোরেটরের গোঁসাই।
আর সমস্ত জিনিসটা ছিল অত্যন্ত সিমপল অথচ প্রত্যেকটি জিনিস থেকে উথলে উঠছিল সৌন্দর্য।
আমি শুধালুম, তার পর?
গাঙ্গুলীমশাই শান্তকণ্ঠে বললেন, এবানেই কাহিনীটি শেষ করতে পারলে ভালো হত। কিন্তু তুমি যখন আদ্যন্ত শুনতে চাও তবে কী আর করি বলি।
গাঁধীজিকে উপরের তলায় নিয়ে গেলেন স্বয়ং গুর্দেব। আমি তার ধরা-ছোঁওয়ার ভিতরে– যদি-বা কোনও কিছুর দরকার হয়। তাই সব দেখেছিলুম, সব শুনেছিলুম। দুই হিমালয়ের সাক্ষাৎ উভয়ের মধ্যে গভীরতম প্রীতি– এমনকি সংঘাত। সেই মোকা ছাড়ব আমি! হে!
বেশ পরিষ্কার স্পষ্ট লক্ষ করলুম, গাধী যেন দু-চারটে জিনিস দেখলেন, কিন্তু কোনও কিছুই লক্ষ করলেন না। আল্পনা, মাথার উপরে ফুলের ডালি, তাজমহলের মতো খাটবিছানা, বেডকভারের ঠিক মাঝখানে বাটিকে কাজ করা নিটোল গোল মেডালিয়নের ভিতর সেই অজন্তার ছবি, যেখানে একটি তরুণী দু-ভাজ হয়ে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রভু বুদ্ধের পদতলে পদ্মফুলের অঞ্জলি দিচ্ছে।
কোনও কিছুই যেন তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারল না।
তার পর তিনি আস্তে আস্তে উত্তরের খোলা জানালার কাছে এসে দাঁড়ালেন। তার দৃষ্টি যেন মন্দির পেরিয়ে টাটা বিলডিং ছাড়িয়ে কোন সুদূরে চলে গেছে। হঠাৎ গুদেবের দিকে ফিরে বললেন, এরই কাছে ছাতে যাবার সিঁড়ি আছে না? চলুন।ছাতে গিয়ে দুজনাতে অল্প একটু পাইচারি করার পর গাধী একগাল হেসে বললেন, আমি এই ছাতেই বাসা বাঁধব। ভারি চমৎকার!
আমি অবাক হয়ে বললুম, তার মানে?
মানে আর কী? পড়ে রইল সব নিচে। আমি তাকে কখনও ওই বেডরুমের একটিমাত্র জিনিস ব্যবহার করতে দেখিনি। অবশ্য একথা ঠিক, যে দুটি দিন এখানে ছিলেন তার অধিকাংশ সময়ই কাটিয়েছেন উত্তরায়ণে, ঋর্দেবের সঙ্গে আর বড়বাবুর (দ্বিজেন্দ্রনাথের) সান্নিধ্যে। বড়বাবুর কাছ থেকে বুড়ো ফিরছিলেন হাসিখুশি ভরা ডগমগ মুখে, আর গুদেবের কাছ থেকে চিন্তাকুল বদনে। রাত্রি কাটাতেন ছাতে। গাঙ্গুলীমশাই থামলেন।
অনেকক্ষণ গভীর চিন্তা করার পর বললেন, আমি পলিটিক্স একবর্ণও বুঝিনে। গাধীর লেখা এক ছত্রও পড়িনি আর গুদেবের সামান্য যেটুকু পড়েছি সেটা ধর্তব্যের মধ্যে নয়। আমার মতামতের কোনও মূল্য নেই। তবু বলি, এবারও গাঁধী-গুর্দেবে মনের মিল হল না। কিন্তু আমার মনে হয় এবারেই ছিল বেস্ট চান্স। আমার মনে হয়, গাধী যদি ওই আল্পনা, পদ্মফুলের আলো এবং সুদেবের আরও পাঁচটা সযত্নে সাজানো নেড়েচেড়ে দেখতেন, একটুখানি কদর দেখাতেন তা হলে গুদেবের দিলটা একটু মোলায়েম হত। লোকে বলে গাধী সত্যের পূজারি আর শুর্দেব নাকি সুন্দরের পূজারি! কিন্তু গুর্দেব যে সত্যেরও পূজারী সে-ও তো জানা কথা। গাধীও নিশ্চয়ই সুন্দর জিনিস ভালোবাসেনকে বাসে না, কও! কিন্তু তার কোনও লক্ষণ আমার পাপ চোখে পড়েনি। তাই আমার মনে হয় গাঁধী যদি তার জন্য সাজানো ঘরটাকে একটু পুজো করতেন। মানে একটু আদর করতেন তা হলে গুর্দেব ভাবতেন, এ লোকটা ভিতরে ভিতরে সুন্দরেরও পূজা করে। আমার বংশের না হোক, আমার গোত্রেরই লোক। তাই হয়তো একটা সমৰাও হয়ে যেত।
