গাঙ্গুলীমশাই ঠোঁটের এককোণ দিয়ে কিস্তিতে কিস্তিতে ধুয়ো ছাড়তে ছাড়তে বললেন, তোমার যেমন আঙ্কেল। যে ভিখিরি কুকুরের সঙ্গে মারামারি করতে করতে ডাস্টবিন থেকে খুঁজে খুঁজে খুঁটে খুঁটে অখাদ্য খায়, তাকে খেতে ডাকলে কী রাস্তা থেকে বাড়িতে একটা ডাস্টবিন তুলে এনে সেই ময়লার ভিতর সেই অখাদ্যই রাখ নাকি, যেটা সে নিত্যি নিত্যি খায়? আর দু-তিনটে যেয়ো কুকুর লড়াই করার জন্য।
আরে বাপু, যার যা বেষ্ট, মেহমানকে সেইটে দিতে হয়। আমি তাই দিন তিনেক উদয়াস্ত খেটে উপরের তলার তিনখানা ঘর সাজালুম। খুব যে মন্দ হল তা বলব না। অবশ্য দুর্গা নাম জপ এক সেকেন্ডের তরেও কামাই দিইনি।
মহারাজ আসবার আগের দিন বেলা প্রায় দশটার সময় গর্মি তখন নিদেন ১১২ ডিগ্রি দেখি, কে যেন মিন-ছাতায় রোদ্দুর ভেঙে ভেঙে আসছে। কে চোখ কচলে দেখি– সর্বনাশ– জাব্বাজোব্বা পরা গুর্দেব। প্রথমটায় ভেবেছিলুম মহর্ষিদেবের ছায়া-শরীর। জানো, বোধহয়, অনেকেই জ্যোৎস্নারাতে দেখেছে, সাদা আলখাল্লা পরা তার ছায়াকায়া মন্দির থেকে বেরিয়ে তার মর্তের বাসভবনে এই গেস্ট হাউসের দিকে আসছেন। এবার বুঝি ঠা ঠা রোদূরে। তবে ভরসা এই, কাছে গেলেই উপে যাবেন।
আমি বললুম, যত সব গাঁজা। মহর্ষিদে এ মন্দির কখনও দেখেননি। শুনেছি, মহর্ষির আদেশে হাভেল সাহেব না কে যেন আর অবন ঠাকুরে মিলে এটার প্ল্যান করেন। এটার প্রতি পরলোকে গিয়েও তার মোহ থাকবে কেন?
গাঙ্গুলীমশাই বললেন, আমি তো পড়িমরি হয়ে ছুটলাম গুদেবের দিকে, রঙচটা বাঁশের ছাতাখানা নিয়ে। তিনি ছাতাখানা উপেক্ষা করে মৃদু হেসে বললেন, দেখি গাঙ্গুলী, অতিথি সল্কারের কী ব্যবস্থা করেছ।
গাঙ্গুলী মহাশয়ের সর্বাঙ্গে সভয় কম্পনের শিহরণ খেলে গেল– গুরুদেবের ওই অত্যন্ত হামলেস ইচ্ছা প্রকাশের স্মরণে। বললেন, সবাই আমাকে ভরসা দিয়েছিল, গাধী কিছুতেই গুর্দেবকে এ বাড়িতে তকলিফ বরদাস্ত করে আসতে দেবেন না। তিনি যাবেন স্বয়ং–যতবার প্রয়োজন হয় উত্তরায়ণে, যাত্রী যেরকম ভক্তিভরে তীর্থস্থলে যায়। কাজেই গুর্দেব আমার জোড়াতালির ঘর-সাজানো দেখতে পাবেন না। এখন উপায়? এক ঝটকায় মা কালীর ঘুষ ডবল করে দিলুম– দুটোর বদলে চারটে মোষ।
হায়, হায়, হায়। গেরো, গেরো, গেরো। গুদে ঘরে ঢুকেই বললেন, এসব করেছ কী হে! সব যে বিলিতি মাল। ব্রাস রড়ওলা শ্রিং খাট! সর্বনাশ। বের কর, বের কর টেনে। এখনি। আর লোক পাঠাও, দেরি কর না– অমুকের বাড়িতে বিয়ের সময়ে সে পেয়েছিল চীনে মিস্ত্রির হাতে খোদাই করা করা একখানা জবরদত্ত কাঠের পালঙ্ক। আনাও সেটা। আর এসব যে একেবারে বিলিতি বেড় শিট, বালিশের ওয়াড়। তুমিই যাও, গাঙ্গুলী, হা তুমিই যাও, বউমার কাছে। তার গুদামঘরে আমার একটা মস্ত বড় সিন্দুক আছে। তার ভিতর খদ্দরের সব জিনিস পাবে। আমি যখন গেলবার আহমদাবাদ গিয়েছিলুম তখন সবাই আমাকে চেপে ধরল খন্দর পরার জন্য। আমি বললুম অত মোটা কাপড় আমার সয় না। তারা যেন চ্যালেন্জটা তুলে নিল। ধুতি, পাঞ্জাবির অতি মিহিন কাপড় থেকে আরম্ভ করে বিছানার চাদর, ওয়াড়–এমনকি খদ্দরের মশারি। না হে না, তুমি ভাবছ ওর ভিতর মানুষ দমবন্ধ হয়ে মারা যাবে। মোটেই না। এমনই মিহিন যেন মলিন। ভিতরে যে ওয়ে আছে। তার দিকে বাইরের থেকে তাকালে মনে হয় মাঝখানে কোনও মশারি নেই।
হঠাৎ কার্পেটের দিকে নজর যেতে ফের ইকম, ফেলে দাও এটাও। তার পর কী যেন ভাবতে গিয়ে উপরের দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল বিজলিবাতির বাব। চিন্তিতভাবে যেন আপন মনে বললেন, এটাকে নিয়ে কী করা যায়? আমাকে বললেন, যা, বউমার ওখানে যাবার সময় নন্দলাল আর ক্ষিতিমোহনবাবুর স্ত্রীকে এখানে পাঠিয়ে দিও। আমি সব আদেশ তামিল করার সময় ভাবলুম, হনুমানজিকে কে বলে সরল? তিনি তার মুনিটিকে হাড়ে হাড়ে চিনতেন। এখন বলছেন, লে আও বিশল্যকরণী। আনা মাত্রই হয়তো ফের হুকুম-ওই যু-যা। বিবতারিণীর কথা বেবাক ভুলে গিয়েছিলুম। যাও তো বস পবননন্দন হনুমান পবনগতিতে। নিয়ে এস ওই বস্তুটি। তখন ঘষ্টাতে ঘটাতে যাও ফের ওই মোকামে। ক-বার যেতে আসতে হবে সে কি স্বয়ং প্রভু রামচন্দ্রই জানেন? অতএব নিয়ে চল সমুচা গন্ধমাদনটাকে। আর এস্থলে স্মরণ কর, আমাদের ওর্দেবের বাবামশাই কী করতেন? ঘড়ি ঘড়ি মত বদলাতেন বলে তার খাস সহচর দুদিন অন্তর অন্তর বিদেশ থেকে টেলি পাঠাতেন, বাবু চেনজেস হিজ মাইন্ড। পুত্রের যে সেটা অর্সায়নি কী করে জানব? আমি নিয়ে চললুম গন্ধমাদন প্রমাণ সেই বিরাট সিন্দুকটাকে। আমার অবশ্য সুবিধে, আমাকে তো ওটা বইতে হবে না। বইবে ব্যাটা হীতলাল, কালো, ভোলা, বঙ্কা গয়রহ।
গেস্ট হাউসে পৌঁছে দেখি, চীনা পালঙ্ক তখনও আসেনি। খবর পেলুম সক্কলের পয়লা এসে পৌঁছেছেন ঠানদি (ক্ষিতিমোহনবাবুর স্ত্রী)। সেটা অতিশয় স্বাভাবিক। তার নাম কিরণ। তার টাটু ঘোড়ার মতো চলন দেখে ক্ষিতিবাবুই একদিন বলেছিলেন, সার্থক নাম কিরণ! কী run দেখেছ?
উপরে গিয়ে দেখি তুলকালাম কাও। ঠানদি এবং জনা তিন-চার এক্সপার্ট মহিলা লেগে গেছেন ঠিক সেন্ট্রাল বাতিটার নিচে দুনিয়ার যত কঠিন কারুকার্য ভরা বিরাট গোল একটা আল্পনা আঁকতে। শুর্দেব এককোণে চুপ করে বসে বসে সব দেখছেন। এমন সময় নন্দলাল এলেন। গুর্দেব তাঁকে বললেন, এক কাজ কর তো নন্দলাল। ওই বালবটাকে আড়াল করতে হবে। তুমি এটার নিচে একটা পেতলের চেপ্টা ফ্লাওয়ার ভাজ ছাত থেকে সরু সরু চেন দিয়ে বুলিয়ে দাও তো। ঠিক মানানসই সাইজ ও শেপের ও-রকম একটা ভা বউমার আছে। আর ভাজ ভর্তি করে দাও পদ্মফুল দিয়ে, কুঁড়িগুলো যেন গোল হয়ে বাইরের দিকে মাথা ঝুলিয়ে দেয়। বিজলির আলো আসবে পদ্ম পাপড়ির ফাঁকে ফাঁকে। কী বললে? পদ্ম না-ও পাওয়া যেতে পারে! নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। একটু দূরে লোক পাঠালেই হবে। নইলে মানানসই অন্য ফুল? নন্দলাল মাথা নেড়ে জানালেন হয়ে যাবে।
