গুর্দেব লেখা বন্ধ করে আমার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে বললেন, বসো গাঙ্গুলী। আমি সিভিলিয়ান কায়দায় তার পায়ের ধুলো নিয়ে মিলিটারি কেতায় দাঁড়িয়েই রইলুম।
গুর্দেব অত্যন্ত প্রসন্ন বদনে আমাকে বললেন, যবে থেকে তুমি এখানে এসেছ, বুঝলে গাঙ্গুলী, আমার ঘাড় থেকে অন্তত একটা বোঝা নেমে গেছে, ভিজিটারদের আরাম-আয়েসের জন্যে আমাকে আর মাথা ঘামাতে হয় না। তুমি একাই একশো; সব সামলাতে পার। আমি তো মনস্থির করে বসেছিলুম গান্ধীজিকে এই উত্তরায়ণেই গেস্টরুমে তুলব। কিন্তু আজ এইমাত্র তার কাছ থেকে চিঠি পেলুম, তিনি দুটি দিন এখানে নির্জনে শান্তিতে বাস করতে চান। তুমি তো জানো, আমার এখানে উদয়াস্ত ভিজিটারের ভিড় লেগেই আছে। তাদের আনাগোনা, বারান্দায় চলাফেরা, আঙিনায় হাঁকডাক গাঁধীর শান্তিভঙ্গ করবে। তাই স্থির করেছি, তোমার গেস্ট হাউসের দোতলাই তার জন্য সবচেয়ে ভালো আবাস হবে; আর তুমি যা-তা ভিজিটারকে ঠেকাতে যে কতখানি ওস্তাদ সে আমি ভালো করেই জানি। তোমার হাতে গাধীকে সঁপে দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হলুম।
গাঙ্গুলীমশাই সেই ফাঁসির হুকুমের স্মরণে একটুখানি কেঁপে উঠে কাঁপা গলায় বললেন, বাব্বা! আমি আমার ওই গেস্ট হাউস আস্তাবলে গাঁধীকে রাখব কী করে? একটা শোবার ঘরে আছে দুখানা স্পিঙের খাট। সে এমনই স্প্রিং যে তার উপর রামমূর্তি সার্কাসের ফেদার-ওয়েট বামনাবতার গুলৈও সে-স্প্রিং ক্যাচর-ম্যাচর করে মেঝের সঙ্গে মিশে যায়। আমাদের পাড়াতে এক পাদ্রি সাহেব লেকচার দিতে গিয়ে বলেন, প্রফেট নোআর আমলে সর্ববিশ্বব্যাপী এক বিরাট বন্যা হয়। ঈশ্বরসৃষ্ট তাবৎ প্রাণী, বৃক্ষ, তৈজসপত্রাদি যাতে সেই বন্যায় লোপ না পায় তাই তিনি নোকাকে আদেশ দেন, তিনি যেন একটা বিরাট নৌকা গড়ে তার উপর প্রত্যেক প্রাণী, প্রত্যেক জীব, এমনকি প্রত্যেক আসবাবপত্র জোড়ায় জোড়ায় হেপাজতির সঙ্গে তুলে রাখেন। গুরুগম্ভীর হয়ে এতখানি শাস্ত্রালোচনা করার পর গাঙ্গুলীমশাই ঈষৎ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। জিরিয়ে নিয়ে দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, আমার মনে রত্তিভর সন্দ নেই যে আমার গেষ্ট হাউসের উপরের তলায় যে দুটি খাট আছে সেগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বময় ঘোরাঘুরি করে শেষটায় আশ্রয় পেল দেবেন্দ্রনাথের চরণপ্রান্তে। আফটার অল্ তিনি তো প্রফেট–নোআরই মতন গত শতাব্দীর প্রফেট।
এস্থলে বলে রাখা প্রয়োজন, গাঙ্গুলীমশাই ছেলেবেলা থেকেই সে যুগের বিলিতি এদেশে একদম বেখাপ্পা– ডবল খাট, ড্রেসিং টেবিল, এসৃক্রিতোয়ার, বিদে, চায়না ইত্যাদিতে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনিই আমাকে একদিন বলেছিলেন যে তার ধনী ঠাকুন্দা তার ভিলাটি সাজিয়েছিলেন নসিকে বিলিতি কায়দায় একমাত্র ডাবল সি টা ছিল ব্যত্যয়, নেটিভ স্টাইলে গোড়ালির উপর বসে কর্মটি সমাধান করতে হত। তা সে যাই হোক, গাঁধীজির অভ্যর্থনার জন্য যেটুকু মিনিমামেস্ট দরকার সে তিনি পাবেন কোথায়, গাঙ্গুলীমশায়ের ভাষায় আফটার অল লোকটা তো বিলেতে ব্যারিস্টারি পাস করেছে।
গাঙ্গুলীমশাই বলে যেতে লাগলেন, গুদে বোধহয় আমার হতভম্ব ভাব দেখে তরসা দেবার জন্য বললেন, তোমার যা যা দরকার আমার এখান থেকে, রথী আর বউমার বাড়ি থেকে নিয়ে যেও। আহ্! কথাটি শুনে পেরানটি জুড়িয়ে গেল। ওঁয়ার আছেটা কী? এরকম কম আসবাবপত্র নিয়ে তার ক্রিচারস কম্ফর্ট পোয় কী করে জানেন ব্রহ্মময়ী।(৯) অবশ্য রথীবাবুর বাড়িতে এটা-সেটা আছে, কিন্তু একটা ভদ্রলোকের বাড়ি তো আর লাজারসের গুদাম নয় যে প্রত্যেক আইটেম দু-তিন দফে করে থাকবে। ও বাড়ি থেকে আমার যা দরকার– খাট সোফা কোচ, নতুন পর্দা, লেখা-পড়ার জন্য উত্তম টেবিল-চেয়ার, একটা পেনট্রির আসবাবপত্র যেখানে খাবার জড় করা হবে, ডাইনিংরুমের জন্য একটা সাইডবর্ড যেখানে পেনট্রি থেকে আসা খাবারের ডিস ডিনার টেবিলে সার্ভ করার পূর্বে রাখা হয়, হল-মার্কওলা উত্তম রুপোর ছুরি-কাঁটা–।
আমি বাধা দিয়ে বললুম, অবাক করলেন, গাঙ্গুলীমশাই! আপনি আমাকে সেই বু সব ইংরেজের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। ফরাসি ভাষা জানে না; প্যারিসের রেস্তোরাঁয় তাই আঙুল দিয়ে মেনুতে দেখিয়ে দিল প্রথম পদ। এল সুপ। এবার অব আঙুল দিল মেনুর মধ্যিখানে। ভাবল, মাছ-মাংস ওই ধরনের কিছু একটা সলিড় সাবসৃটেনশাল আসবে– ফরাসিতে যাকে বলে পিয়েস দ্য রেজিসাস অর্থাৎ যে বস্তু (পিস) আপনার ক্ষুধাকে মোক্ষম রেজিসটেন্স দেবে। ও হরি! ফের এল সুপ। খানাপিনা বাবদে হটেনটট গোত্রের ইংরেজ জানবে কী করে বিদগ্ধ ফরাসি জাত মেনুতে নিদেন ত্রিশ রকমের সুপ রাখে (হটেনটট গোরা বলে, উই ইট টু লিভ, আর বিদগ্ধ ফরাসি বলে, উই লিভ টু ইট)। এদিকে ইংরেজের রেস্ত ফুরিয়ে এসেছে। পুডিং মুডিং-এর আশায় দেখাল সর্বশেষ আইটেম। এল টুথ পেক–খড়কে। বুঝুন ঠ্যালা। তরলতম দু-কিস্তি সুপ খেয়ে, পান করে বললে সঠিকতর হয়, খড়কে দিয়ে দাড়ি খোটা! আপনি যে ইংরেজটাকেও হার মানাতে চললেন। করমচান্দের সুযোগ্য সন্তান মোহনদাস গাঁধী তো শুনি খান বা পান করেন– পাজের শুরুয়া বা সুপ, সে-ও অতি হালকা আর বকরির দুধ। ওই দুই তরল দ্রব্য মুখে পৌঁছে দেবার জন্য আপনি ওঁকে হাতে তুলে দেবেন হামিলটন কোম্পানির হল মার্কওলা রুপোর ছুরি আর কাঁটা! ভাগ্যিস আপনি চীনের ইম্পিরিয়াল পেলেস থেকে হীরে পান্না বসানো চপ ঠিক রেকুইজেশন করেননি।
