গাঙ্গুলীমশাই ম্যাট্রিক অবধি উঠতে পেরেছিলেন কি না সেকথা বলতে পারি না। তাই পাঠক পেত্যয় যাবেন না যে এঁর আবাল্য অতিশয় অন্তরঙ্গ সখা ছিলেন বহুভাষাবিদ হরিনাথ দে, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জ্যেষ্ঠা কন্যা হেমলতা দেবীর পুত্র ব্যঙ্গসুনিপুণ অভূতপূর্ব সাহিত্য-সমালোচক সুরেশচন্দ্র সমাজপতি, সম্পাদকমণ্ডলীর মুকুটমণি পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরও অনেক ইনটেলেকচুয়েল বা বুদ্ধিজীবী।
গাঙ্গুলীমশাইয়ের মতো সর্বাঙ্গসুন্দর, নিটোল পারফেক্ট রাকোঁতর স্টোরিটেলার মজলিসতোড় কেচ্ছাবলনেওলা এ পৃথিবীতে আমি দ্বিতীয়টি দেখিনি। রাকোতর হিসেবে ওসকার ওয়াইল্ড ছিলেন এ কলার ম্রাট। সে বাবদে যা কিছু লেখা হয়েছে, বিশেষ করে গীতাঞ্জলির ফরাসি অনুবাদক, ১৯৪৮-এ নোবেল প্রাইজ বিভূষিত আঁদ্রে জিদ (এই হালে, ২২ নভেম্বর ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জন্মশতবার্ষিকী মহাড়ম্বরে ইয়োরোপে উদ্যাপিত হল, কিন্তু হায়, কৌলিক রচনার যে প্রখ্যাত লেখক আপন সৃজনকর্ম স্থগিত রেখে গীতাঞ্জলির অনুবাদ করলেন তিনি অন্য কোনও মহান লেখকের রচনা অনুবাদ করে তাকে এভাবে সম্মানিত করেছেন বলে শুনিনি যে আঁদ্রে জিদ ইয়োরোপে অজ্ঞাত বাঙালি নামক জাতের শ্রেষ্ঠ ধন ইয়োরোপের বিদগ্ধতম জাতের প্যারিস সমাজে প্রচার করলেন, তাঁকে এই উপলক্ষে কোনও বাঙালি স্মরণ করেছে বলে কানে আসেনি। তাঁর অন্তরঙ্গ সখা ওয়াইল্ড সম্বন্ধে যা লিখেছেন সেসব পড়ার পর রাকোতর হিসেবে গাঙ্গুলীমশাইয়ের প্রতি আমার ভক্তি বেড়েছে বই কমেনি। বস্তুত আ লা রিডারস্ ডাইজেন্ট বলতে হলে ইনিই আমার মোট অনফরগেটবল ক্যারেকটার। এঁর কাছ থেকে আমি সবচেয়ে বেশি বাংলা ভাষায় চালু ইডিয়ম, প্রবাদ এবং কলকাতার কনি শব্দ শিখেছি। আমার মতো তার অন্য এক সমঝদার–সাপুড়ে সম্মোহিত সর্পের মতো মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতা ছিলেন আনন্দবাজার গ্রুপের শ্রীযুক্ত কানাইলাল সরকার। আমার কথা পেত্যয় না পেলে ওয়াকে শুধোবেন।
বলা বাহুল্য, বিলকুল বেফায়দা বেকার, আমি গাঙ্গুলীমশাইয়ের সে বয়ানের বন্যা, টৈটম্বুর রসের ছিটেফোঁটাও এই হিম-শীতল, রসকষহীন সিসের ছাপা হরফে প্রকাশ করতে পারব না। একমাত্র লোক যিনি পারতেন তিনি আমার রসের দুনিয়া-আখেরের পিরমুরশিদ পরশুরাম রাজশেখর বসু।
আমি তাকে মায়ের দেওয়া এক বোতল অত্যুকৃষ্ট সিলেটি আনারসের মোরব্বা দিলে পর তিনি আমার ললাটে চুম্বন দিলেন, মস্তকাঘ্রাণ করলেন। বেলা তখন একটা। তিনি আহারাদি সমাপন করে খাটে শুয়ে আলবোলায় ফুরুৎ ফুরুৎ মন্দমধুর টান দিচ্ছিলেন। আমাকে আদর করার পর ফের লম্বা হয়ে শুয়ে নলটি তুলে নিলেন। চোখ দুটি বন্ধ করে, কবির ভাষায় আকাশ পানে হানি যুগল ভুরু বললেন, গেরো হে গেরো। এমন গেরো আমার পঞ্চাশ বছরের আয়ুতে কখনও আসেনি। পুলিশের সঙ্গে মারপিট করে অসহ্য মশার কামড়ের মধ্যিখানে তেরারি হাজতে কাটিয়েছি, চন্নগর মাহেশের ফেস্তাতে যাবার পথে মাঝগঙ্গায় নৌকোডুবিতে হাবুডুবু খেয়েছি জলে পড়লে আমি আবার নিরেট পাথরবাটি-থিয়েডারের এক হাফ-গেরস্ত মাগী আমাকে ব্ল্যাকমেল করতে চেয়েছিল ইত্যাকার বহুবিধ যাবতীয় ফাড়া-মুশকিল গেবো-গর্দিশ বয়ান করার পর বললেন, ওসব লস্যি হে লস্যি। ওহ্! এ গেরো যা গেল।
আমি বললুম, এ আশ্রম তো শান্তির নিকেতন। এখানে আবার গেরো?
গাঙ্গুলীমশাই নল ফেলে দিয়ে যুক্তকরে, মহর্ষির উদ্দেশে প্রণাম করে বললেন, তিনি পিরিলি বংশের প্রদীপ, আর সেই পিরিলি বংশের এ অধম পিলসুজ দেলকোর ছায়া। পাপ মুখে কী করে বলি, এখানেও মাঝে মাঝে অশান্তির উপদ্রব দেখা দেয়। কিন্তু বাবা, আমা হেন সামান্য প্রাণীকে বলির পাঁঠার মতো বেছে নেওয়া কেন?
আমি হুঁকোর নলটা তার হাতে তুলে দিয়ে বললুম, কোটা ল্যান, খুলে কন।
গাঙ্গুলীমশাই বললেন, গাঁধী হে, গাধী! তোমরা যাকে মহাত্মা ঠহাত্মা বল। তার পর ফের যুক্তকরে বললেন, তারা ব্রহ্মময়ী মা, বজ্রযোগিনী মা, রক্ষে দাও মা এসব মহাত্মাদের লেক লজর থাকে।
আমি তাজ্জব মেনে বললুম, গান্ধীজি তো অতিশয় নিরীহ, নিরুপদ্রবী, ভালো মানুষ। তিনি আপনার গেরো হতে যাবেন কেন?
গাঙ্গুলীমশাই বললেন, এই বুঝলেই তো পাগল সারে। তোমাকে তা হলে ভালো করে বুঝিয়ে বলি।
জানো তো বাপু, দেশ-বিদেশের হোমরা-চোমরা এখানে এলে আকছারই ওঠেন উত্তরায়ণে; বাস করেন হয় গুদেবের (প্রাচীন-পন্থীরা গুরুদেব না বলে বলতেন গুর্দের্ব) পাশে, নয় রথীবাবুর ওখানে। আমি তো নিশ্চিন্দি মনে দিব্য গায়ে ফুঁ দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি আর উত্তরায়ণের নায়েব গোমস্তা চাকরবাকরদের দেখলেই মনে মনে ফিকফিক করে হেসে ভাবি, সব ব্যাটা বলির পাঠা। গাঁধী মাছ মাংস খান না বটে, কিন্তু মা কালীকেই কী তার উদ্দেশে বলি দেওয়া পাঠা কেউ কখনও খেতে দেখেছ; গাঁধী খাবেন না, সত্যি কথা, কিন্তু তাই বলে চাকর নফরের বলি নির্ঘাত। তখন কেমন জানি, কিংবা জানিনে, একটা অহেতুক অজানা শঙ্কা আমার ব্রেন-বক্সের-ব্ৰহ্মতালুতে ঢুকে সর্বাঙ্গ শিরশিরিয়ে পায়ের চেটো দিয়ে বেরিয়ে গেল তোমারই মুখে শোনা,
পাঁঠার বলি দেখে পাঠী নাচে।
(পাঁঠা বলে) ও পাঠী তোমার লাগি বিবির শিরনি আছে।
আমি তখন পাঠীর মতো আপন মনে ফিকফি হাসছি, বিলকুল খেয়াল নেই যে পির বিবির দর্শাতে পাঠা বলি হয় না, বলি হয় পাঠী, শিরনি চড়াবার জন্যে। সাদামাটা রাঢ়ীতে বলে, ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসে, সবার একদিন আছে শেষে। (৮) উত্তমরূপে প্রবাদটি হৃদয়ঙ্গম করার পূর্বেই দ্যাখ-তো-না-দ্যাখ সঙ্গে সঙ্গে এওলাফরমান উপস্থিত! আমি কি তখন আর জানতুম যে এই ফরমান-পুষ্পগুচ্ছের ভিতর লুকিয়ে আছে গোখরোর বাচ্চা। আমি তো নাপাতে নাপাতে উত্তরায়ণ পৌঁছলুম। পকেট থেকে ডাস্টার বের করে বুটজোড়া পরিষ্কার করে খোলা দরজায় হাফ মিলিটারি মোলায়েম টোকা দিয়ে গুর্দেবের ঘরে ঢুকলুম।
